https://www.prothomalony.com/
17970
bangladesh
একটি পরিবার। একই পরিবারের তিন প্রজন্মের ১১ জন মানুষ। কারও বয়স সত্তর পেরিয়েছে, আবার কারও বয়স মাত্র চার বছর। আশ্চর্যের বিষয়; জন্ম থেকেই তারা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। পৃথিবীর আলো, রং, মানুষের মুখ কিংবা প্রিয়জনের হাসি, এসবই তাদের কাছে এতদিন ছিল কেবল অন্যের বর্ণনায় শোনা এক অচেনা জগত। অথচ সেই অন্ধকার জীবনে এখন জেগে উঠেছে নতুন আশার আলো। মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নের প্রায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ইসলামপুর গ্রামের এই পরিবারের গল্পটি নিছক একটি চিকিৎসার গল্প নয়; এটি মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও সম্মিলিত উদ্যোগে অসম্ভবকে সম্ভব করার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
কিছুদিন আগে একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটার, সম্ভবত তিনি সাংবাদিকতাও করেন; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিবারের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওটি তৎক্ষণাৎ আমার নজরে আসে। আমি মৌলভীবাজার বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক। তৎক্ষণাৎ মোবাইলে হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা (পিআরও) দেওয়ান রুহুল আমিনকে এই পরিবারের সাথে যোগাযোগ করতে বলি। কিন্তু পিআরও যোগাযোগ শুরু করার আগেই বিষয়টি মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক ও হাসপাতালের সভাপতি জনাব তৌহিদুজ্জামান পাভেলের দৃষ্টিগোচর হয়। তিনি দ্রুত উদ্যোগ নেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের হাসপাতালে এনে চক্ষু পরীক্ষা করানোর ব্যবস্থা করার জন্য আমাদেরকে গাড়ি পাঠাতে বলেন। সাধারণ সম্পাদক ছাদিক আহমদ দ্রুত গাড়ি পাঠান। যথারীতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে তাদেরকে মৌলভীবাজার বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালে আনা হয়।
হাসপাতালে তাদের চোখ পরীক্ষার পর চিফ কনসালটেন্ট ডা. শাহ আমিনুল ইসলাম জানান, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কয়েকজনের চোখে অস্ত্রোপচার করলে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের দৃষ্টিহীনতা, ভয় ও অনিশ্চয়তার কারণে পরিবারের সদস্যরা প্রথমে অস্ত্রোপচার করাতে রাজি হচ্ছিলেন না। তাদের একটি বড় আশঙ্কা ছিল দৃষ্টি ফিরে পেলে এতদিন যারা সহানুভূতি ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, তারা কি আর পাশে থাকবেন?
এই দ্বিধা কাটাতে চিকিৎসক, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা ভাবে তাদের বোঝানো হয়। অবশেষে প্রথম ধাপে ২০ জুলাই ২০২৬ পরিবারের তিন সদস্যের চোখে অস্ত্রোপচার করা হয়। সফল অস্ত্রোপচারের পর তারা একটি করে চোখে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান। প্রথম ধাপে সম্পন্ন হওয়া তিনজন ২৯ জুলাই হাসপাতালে এসে ফলো-আপ পরীক্ষা করান। দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার আনন্দে তাদের মুখের হাসি ও উচ্ছ্বাস চিকিৎসকসহ পুরো মেডিকেল টিমকে আবেগাপ্লুত করে। এতদিন যে পৃথিবী ছিল অন্ধকার, সেই পৃথিবীর আলো তারা নতুন করে দেখতে শুরু করেন। এখানে উল্লেখ্য যে, মৌলভীবাজার-৩ সংসদীয় আসনের সম্মানিত সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান প্রথম তিনজনের চোখে অস্ত্রোপচার করার সময়ে দেশের বাইরে ছিলেন। তিনি দেশে ফিরেই এই পরিবারের কাছে ছুটে গেছেন। তাদেরকে সহায়তা করেছেন। ভরসা দিয়েছেন সুস্থ হওয়ার পর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবেন বলে।
এরই ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় ধাপে আরও তিনজনের চোখে গত ১৫ আগস্ট ২০২৬ অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসকরা আশাবাদী, তারাও একটি করে চোখে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবেন। নতুন করে আলো দেখার অপেক্ষায় থাকা এই তিনজনের শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসার অগ্রগতি জানতে জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল নিজে হাসপাতালে গিয়ে তাদের খোঁজখবর নেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিপুল সিকদার, বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালের সাধারণ সম্পাদক জনাব ছাদিক আহমদসহ হাসপাতালের কর্মকর্তারা।
এখন পরিবারের বাকি পাঁচজনের পালা। চিকিৎসকদের মতে, তাদের চোখেও অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু বয়স ও দীর্ঘদিনের দৃষ্টিহীনতার কারণে বয়স্ক সদস্যদের কেউ কেউ এখনও অস্ত্রোপচার করাতে অনিচ্ছুক। তাদের ভয় ও সংশয় দূর করতে হাসপাতালের পক্ষ থেকে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
এখানে চিকিৎসার পাশাপাশি পুনর্বাসনের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতদিন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় বিভিন্ন মানুষ তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। সেই সহযোগিতার ওপর নির্ভর করেই পরিবারটির জীবিকা চলত। ফলে দৃষ্টি ফিরে পেলে সেই সহায়তা বন্ধ হয়ে যেতে পারে; এমন আশঙ্কা তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে। জেলা প্রশাসক তাদের আশ্বস্ত করেছেন, দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার পর তাদের অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হবে না। প্রয়োজনীয় সহায়তার মাধ্যমে তাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এমনকি পরিবারের জন্য দুটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।
এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু ছয়জন মানুষের চোখে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হওয়া নয়; বরং তাদের মনে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন জাগানো। প্রথম তিনজন যখন অপারেশনের পর নিজেদের চারপাশের পৃথিবী দেখতে শুরু করেছেন, তখন হয়তো পরিবারের অন্য সদস্যদের মনেও ধীরে ধীরে সাহস তৈরি হবে। একদিন তারাও হয়তো বলবেন, 'আমরাও দেখতে চাই।' মৌলভীবাজার বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালের পক্ষ থেকে সাধারণ সম্পাদক ছাদিক আহমদ জানিয়েছেন, পরিবারের ১১ সদস্যের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বিনামূল্যে করার জন্য তারা অঙ্গীকারবদ্ধ। লক্ষ্য একটাই, এই পরিবারের প্রতিটি সম্ভাবনাময় চোখে আলো ফিরিয়ে দেওয়া।
একটি পরিবারের তিন প্রজন্মের দৃষ্টিহীনতার অবসান ঘটানোর এই প্রচেষ্টা তাই শুধু একটি চিকিৎসা কার্যক্রম নয়। এটি প্রমাণ করে, প্রশাসন, চিকিৎসক, হাসপাতাল ও সমাজের মানুষ একসঙ্গে এগিয়ে এলে অন্ধকারের দীর্ঘ ইতিহাসও বদলে দেওয়া সম্ভব।
হয়তো সেই দিন আর খুব দূরে নয়, যেদিন ইসলামপুরের এই পরিবারের ১১ জোড়া চোখের সামনে পৃথিবীটা আর অন্ধকার থাকবে না। তারা দেখবে আকাশ, সবুজ, মানুষের মুখ, প্রিয়জনের হাসি। আর সেই দৃশ্যের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হবে; আলো ফিরে পাওয়ার আনন্দ। মৌলভীবাজার বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালের এই মানবিক উদ্যোগের সার্থকতা সেদিনই পূর্ণ হবে, যেদিন পরিবারের প্রতিটি সম্ভব চোখে ফিরে আসবে দৃষ্টির আলো।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, মৌলভীবাজার বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল।
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন