https://www.prothomalony.com/
17878
north-america
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ ০২:৪১
চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা, পেশাগত উৎকর্ষ, মানবিক সেবা ও পারস্পরিক সহযোগিতার বার্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির আটলান্টিক সিটিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে সেন্ট্রাল বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন অব নর্থ আমেরিকা (সেন্ট্রাল বিএমএএনএ)-এর বার্ষিক সম্মেলন ২০২৬।
৩০ জুলাই থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত ট্রপিকানা রিসোর্টে অনুষ্ঠিত চার দিনব্যাপী এই সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাঁচ শতাধিক চিকিৎসক, তাঁদের পরিবার, শিক্ষাবিদ, কমিউনিটি নেতা এবং অতিথিরা অংশ নেন। সম্মেলনের মূল আলোচনায় উঠে আসে—উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশি চিকিৎসকদের অর্জিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে কীভাবে বাংলাদেশসহ বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা ও মানবিক কল্যাণে কাজে লাগানো যায়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও উত্তর আমেরিকার চিকিৎসক সমাজের মধ্যে শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি ও পেশাগত সহযোগিতা আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সম্মেলনের সার্বিক কার্যক্রমে সভাপতিত্ব করেন সেন্ট্রাল বিএমএএনএ-এর সভাপতি ডা. ফজলুল ইউসুফ। সম্মেলনের আহ্বায়ক ছিলেন ডা. মুজিবুর রহমান মজুমদার এবং প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন ডা. জামালউদ্দিন। বিভিন্ন কমিটির সমন্বিত প্রচেষ্টায় এবং সাধারণ সম্পাদক ডা. খন্দকার মাসুদুর রহমানের পরিচালনায় সফলভাবে সম্মেলনের আয়োজন সম্পন্ন হয়।
সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন নিউজার্সির লেফটেন্যান্ট গভর্নর ড. ডেল জি. ক্যাল্ডওয়েল। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আটলান্টিক সিটির মেয়র মার্টি স্মল সিনিয়র, চিকিৎসা শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. কর্নাড ফিশার, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সদস্য ডা. মাহবুবুর রহমান লিটন এবং নাগরিক সংগঠন ‘সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।

ভিডিও বার্তার মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানান নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ, গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা এবং বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী ও বিশিষ্ট হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জোবায়দা রহমান এবং বিশিষ্ট হৃদরোগ সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর কবির।
চিকিৎসা, জনস্বাস্থ্য, মানবিক নেতৃত্ব, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মেলনে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রদান করা হয় “সেন্ট্রাল বিএমএএনএ আজীবন বৈশ্বিক মানবিক নেতৃত্ব সম্মাননা”।

চিকিৎসাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ডা. জাহাঙ্গীর কবিরকে প্রদান করা হয় “সেন্ট্রাল বিএমএএনএ চিকিৎসা উৎকর্ষ পদক”। চিকিৎসা শিক্ষা ও মানবিক কর্মকাণ্ডে অবদানের জন্য অধ্যাপক ড. কর্নাড ফিশার, চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যে আজীবন অবদানের জন্য অধ্যাপক ডা. এম. এ. ফয়েজ এবং চিকিৎসা ও সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য ডা. হিউবার্ট ডি’ক্রুজকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়।
সম্মেলনে বাংলাদেশ থেকে আগত বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট চিকিৎসক ও অতিথি অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের পরিচালক ডা. কাজী সাইফুদ্দিন বেন্নুর, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আব্দুস শাকুর খান, বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক আলী হোসেন, অধ্যাপক রহমানউল্লাহ বারী, গ্রামীণ হেলথটেক লিমিটেডের ড. আরমান সিদ্দিকী এবং গ্রামীণ কল্যাণের মঈনুদ্দিন চৌধুরী। বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে আগত চিকিৎসক, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও কমিউনিটি নেতাদের অংশগ্রহণ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করে।
সম্মেলনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম। সম্মেলন উপলক্ষে প্রকাশিত মেডিকেল জার্নাল ও কনভেনশন স্মরণিকায় চিকিৎসাবিষয়ক প্রবন্ধের পাশাপাশি সেন্ট্রাল বিএমএএনএ-এর কার্যক্রম, সংগঠনের ইতিহাস, সদস্যদের সাফল্য এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অবদান তুলে ধরা হয়। জার্নাল ও স্মরণিকা সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন ডা. জাহিদ দেওয়ান শামীম ও ডা. আশরাফুল হক।
বৈজ্ঞানিক অধিবেশনে চিকিৎসকদের জন্য ধারাবাহিক চিকিৎসা শিক্ষা (সিএমই) কার্যক্রমের আয়োজন করা হয়। এতে ১০ ঘণ্টার সিএমই ক্রেডিট অর্জনের সুযোগ ছিল। ফুসফুস ও নিবিড় পরিচর্যা চিকিৎসা, ঘুমজনিত রোগ, সংক্রামক রোগ, জরুরি চিকিৎসা, জনস্বাস্থ্য, হৃদরোগ এবং সমসাময়িক চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
সিএমই কার্যক্রমের দায়িত্বে ছিলেন ডা. কানিজ বানু হিমি ও ডা. রিয়াজ ফেরদৌস শিবলী। তাঁদের পরিকল্পনা ও সমন্বয়ে বৈজ্ঞানিক অধিবেশনগুলোতে চিকিৎসকদের পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতা উন্নয়নের বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পায়। অসিএমই অধিবেশনে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা, পেশাগত নেতৃত্ব, প্রযুক্তির ব্যবহার, সামাজিক দায়বদ্ধতা, সুস্থ জীবনযাপন এবং বাংলাদেশ ও উত্তর আমেরিকার চিকিৎসকদের সম্ভাব্য যৌথ উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়।
তরুণ চিকিৎসকদের জন্য বিশেষ ক্যারিয়ার ও নেতৃত্ববিষয়ক কর্মশালা পরিচালনা করেন ডা. মোহাম্মদ হোসাইন মিন্টু। কর্মশালায় রেসিডেন্সি, ফেলোশিপ, উচ্চতর প্রশিক্ষণ, গবেষণা, পেশাগত যোগাযোগ এবং নেতৃত্ব বিকাশের বিভিন্ন সুযোগ নিয়ে আলোচনা করা হয়। আয়োজকদের মতে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বাংলাদেশি চিকিৎসকদের পেশাগত অগ্রযাত্রায় এ ধরনের প্ল্যাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সম্মেলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল পরিবারকেন্দ্রিক কর্মসূচি। চিকিৎসকদের জীবনসঙ্গী, নারী সদস্য এবং শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিশেষ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। ডা. জারিন আল-তারিক ও ডা. রুমানা সাবুরের নেতৃত্বে ‘উইমেন্স অ্যালায়েন্স’ এবং শিশু-কিশোর কর্মসূচিতে নারীস্বাস্থ্য, পরিবার, নেতৃত্ব, সামাজিক অংশগ্রহণ, সংস্কৃতি ও ব্যক্তিগত বিকাশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
শিশু-কিশোরদের জন্য ছিল শিক্ষামূলক কার্যক্রম, প্রতিযোগিতা, বিনোদন ও সাংস্কৃতিক আয়োজন। সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের দায়িত্বে ছিলেন ডা. কাজী রহমান সজল ও ডা. বর্ণালী হাসান। গালা নাইটের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হয় বিশিষ্ট আবৃত্তিশিল্পী ডা. ফারুক আজমের আবৃত্তির মাধ্যমে। এরপর জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী কণা ও ইমরান সংগীত পরিবেশন করেন।
সম্মেলনের অন্যান্য আয়োজনের মধ্যে ছিল সমুদ্র ভ্রমণ, পারিবারিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নেটওয়ার্কিং কার্যক্রম এবং পারিবারিক পিকনিক। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক সহিংসতা ও স্কুলে গুলিবর্ষণের নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরা অস্কারজয়ী স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্র ‘অল দ্য এম্পটি রুমস’ প্রদর্শিত হয়। চলচ্চিত্রটি প্রাণহানির বেদনা এবং একটি নিরাপদ সমাজ গড়ার জরুরি বার্তা তুলে ধরে।
বৃহৎ এই সম্মেলন সফল করতে বিভিন্ন কমিটি ও বিভাগের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছিল উল্লেখযোগ্য। স্থান ব্যবস্থাপনা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, অতিথি আপ্যায়ন, নিবন্ধন, যোগাযোগ, সময়সূচি এবং বিভাগীয় সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ডা. মোস্তফা হাসান শামীম, ডা. মোস্তাফিজুর রহমান টিংকু, ডা. শাহ আলম রনি, ডা. আতাউল চৌধুরী তুষার এবং ডা. নাফিজুর রহমান। আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন ডা. শাহ আলম রনি, ডা. মোস্তাফিজুর রহমান টিংকু এবং ডা. আতাউল চৌধুরী তুষার। সম্মেলনের বিভিন্ন পর্যায়ে উপদেষ্টা হিসেবে দিকনির্দেশনা দেন ডা. কাজী আল-তারিক, ডা. এ. বি. সিদ্দিকী এবং ডা. আতাউল ওসমানী।
অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক গণমাধ্যম সহযোগী ছিল টাইম টিভি। সম্মেলনের বৈজ্ঞানিক অধিবেশন, অতিথিদের বক্তব্য, সম্মাননা প্রদান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গালা ডিনার এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ধারণ করে সরাসরি সম্প্রচার করে টাইম টিভি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার, ইউটিউব প্রচার এবং বিশেষ সংবাদ প্রতিবেদনের মাধ্যমে সম্মেলনের কার্যক্রম বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। এর ফলে প্রবাসী বাংলাদেশি চিকিৎসকদের পেশাগত অর্জন ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড বৃহত্তর দর্শকের সামনে তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ডা. কাজী আল-তারিক সেন্ট্রাল বিএমএএনএ-এর নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটি ঘোষণা করেন।
নতুন কমিটির সদস্যরা হলেন— সভাপতি: ডা. মুজিবুর রহমান মজুমদার, সহসভাপতি: ডা. আতাউল ওসমানী,
সাধারণ সম্পাদক: ডা. খন্দকার মাসুদুর রহমান, কোষাধ্যক্ষ: ডা. জাহিদ দেওয়ান শামীম, সাংগঠনিক সম্পাদক: ডা. রুমানা সাবুর, বৈজ্ঞানিক সম্পাদক: ডা. রিয়াজ ফেরদৌস শিবলী, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সম্পাদক: ডা. কাজী রহমান সজল, তরুণ চিকিৎসকবিষয়ক সম্পাদক: ডা. মোহাম্মদ হোসাইন মিন্টু, সদস্য (মেম্বার-অ্যাট-লার্জ): ডা. বেলায়েত হোসাইন, ডা. আমিরুল ইসলাম এবং ডা. কানিজ বানু হিমি।
নবনির্বাচিত কমিটি সংগঠনের সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করা, চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণায় নতুন উদ্যোগ গ্রহণ, তরুণ চিকিৎসকদের পেশাগত বিকাশে সহযোগিতা, জনস্বাস্থ্য ও মানবিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশ ও উত্তর আমেরিকার চিকিৎসকদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রত্যয় ব্যক্ত করে।
আটলান্টিক সিটির এই সম্মেলন পেশাগত উৎকর্ষ, জ্ঞান বিনিময়, মানবিক দায়বদ্ধতা এবং নেতৃত্ব বিকাশের একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সামনে এসেছে। প্রবাসে বাংলাদেশি চিকিৎসকদের অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে বৃহত্তর মানবকল্যাণে কাজে লাগানো এবং বাংলাদেশ ও উত্তর আমেরিকার চিকিৎসক সমাজের মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধন গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে শেষ হয় সেন্ট্রাল বিএমএএনএ বার্ষিক সম্মেলন ২০২৬।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন