https://www.prothomalony.com/
17810
north-america
অণু আমেরিকায় একজন ইমিগ্রান্ট। খুব গৌরবের গল্প নয় তার জীবন। কলেজ শেষ করে এখানে আসা নয়, স্কলারশিপ পাওয়া নয়—অণু এসেছে ডাইফরসিফিকেশন ভিসা বা যাকে বলে ডিভি ভিসায়। হাতে ছিল দুটো সুটকেস আর মাথার ভেতর একরাশ অনিশ্চয়তা। প্রথম কয়েক বছর সে ডেলিভারি দিয়েছে, রাতে গ্যাস স্টেশনে কাজ করেছে, ট্যাক্সি চালিয়েছে। গোড়াতেই সে বুঝে গিয়েছিল, দেশের যত বড় ডিগ্রীই থাক এখানে পড়াশুনা ছাড়া কিছুই হবে না। তাই কাজের সাথে পড়াশুনা চালিয়েছে। ধীরে ধীরে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। এখন সে একটা কর্পোরেট অফিসে কাজ করে। খুব বড় পদ নয়, কিন্তু সম্মানজনক।
অণু মেয়েকে খুব ভালোবাসে—এই কথাটা শুধু মুখের কথা নয়। তার ভালোবাসা একটা অভ্যাসের মতো, একটা নিয়মের মতো। প্রতিদিন সকালে মেয়ে ঘুম থেকে উঠলে অণু জানে সে কীভাবে খাবে, কীভাবে কথা বলবে, কীভাবে দিনটা শুরু করবে। অণু জানে, মেয়ে আজ হাসবে না বিষণ্ণ থাকবে; কফি চাইবে, না গরম দুধ। অণু জানে মেয়ে কোন বইটা অর্ধেক রেখে দিয়েছে, কোন চরিত্রটা তার সবচেয়ে প্রিয়। সেসব নিয়ে দুজনের মধ্য কথোপকথনও হয়, তর্কও হয়।– রিয়া যখন খুব ছোট তখন তাকে হাত ধরে লাইব্রেরিতে নিয়ে গেছে। নিজে বেছে বেছে বই নিয়েছে। এভাবেই তার পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠেছে।
অণু জানে পশ্চিমে একটা মেয়ে মানুষ করা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। যে কোন সময় পা পিছলে যেতে পারে।
অণু মেয়েকে অন্য দশটা মেয়ের মতো করে মানুষ করেনি। সে কোনো “মেয়েমানুষি” শিখিয়ে দেয়নি, ভয় দেখিয়ে মানুষ করেনি, আবার অন্ধ স্বাধীনতার নামেও ছেড়ে দেয়নি। অণু চেয়েছে, মেয়ে নিজের মতো মানুষ হোক—কিন্তু নিজের ভেতর থেকে; বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো “সংস্কার” বা “নিয়ম” দিয়ে নয়। পশ্চিমা সংস্কৃতির মধ্যে থেকেও অণু খুব সচেতনভাবে মেয়েকে খোলামেলা মেলা-মেশার সীমারেখাটা বোঝাতে চেয়েছে।
ওদের বাসা নিউ ইয়র্কে—চারপাশে অন্য রকম জীবন। স্কুলের বন্ধুরা উইক-এন্ডে পার্টিতে যায়, কনসার্ট দেখে, কখনও বার, কখনও ক্লাব। কেউ কেউ ভ্যাপ টানে, কেউ কেউ খুব ছোট বয়সেই ডেটিং-এর নামে মন ভাঙার পাঠ শুরু করে। অণু এসবকে চোখ বুজে “খারাপ” বলে উড়িয়ে দেয়নি, আবার উৎসাহও দেয়নি। সে শুধু মেয়েকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছে—“এই কাজটা করলে আমি কে হয়ে উঠবো? আমার শরীর, মন, ভবিষ্যৎ—এগুলোর সঙ্গে এটা ঠিক যায় কি?”
উঠতি বয়সের মেয়েদের যা হয়—মেয়েও মাঝে মাঝে বন্ধুদের সঙ্গে পার্টিতে যেতে চায়, নতুন কোনো শো দেখতে চায়, কোনো মিউজিক ফেস্টিভ্যালে যেতে চায়। অণু কখনও এক কথায় “না” বলে দেয়নি। সে বলেছে, “হ্যাঁ, কিন্তু শর্ত আছে। আমি ড্রাইভ করে দিয়ে আসব, নিয়ে আসব। তুমি কোথায় আছ, জানাবে।” মেয়ের বন্ধুরা কেউ কেউ হেসেছে—“তোমার বাবা তো খুব কেয়ারিং!” আবার কেউ চোখ টিপে বলেছে—“এটা তো কন্ট্রোল।”
অণু এসব কথায় কান দেয়নি। সে জানে, কেয়ার আর কন্ট্রোলের মধ্যে পার্থক্যটা সূক্ষ্ম—কিন্তু তার উদ্দেশ্য পরিষ্কার। সে চায় মেয়ে নিজে বুঝে নিক কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ; কিন্তু সেই বুঝে নেওয়ার পথে যেন দুর্ঘটনার গর্ত না থাকে।
অণুর স্ত্রী মেখলা একেবারে অন্য রকম মানুষ। মেখলা অণুর মতো সাহসী নয়, বেশি আশঙ্কাপ্রবণ। ইমিগ্রান্ট জীবনের অনিশ্চয়তা তাকে সবসময় ভয় দেখায়। মেখলা ভাবে—এই দেশটা সুযোগের, কিন্তু বিপদেরও। সে রিয়াকে ভালোবাসে ঠিকই, কিন্তু তার ভালোবাসা ভয় থেকে আসে।
সেই দিনটা ছিল এক শুক্রবার রাতে।
মেয়ে বলল, “বাবা আজকে একটা পার্টি আছে। সবাই যাচ্ছে। আমি গেলে সমস্যা হবে?”
অণু বলল, “কোথায়?”
“ম্যানহাটনে। বন্ধুর জন্মদিন।”
“কতক্ষণ?”
“ঠিক বলতে পারছি না। পার্টি তো… শেষ হবে কখন কে জানে।”
অণু একটু ভেবে বলল, “ঠিক আছে। কিন্তু তুমি যদি সাবওয়েতে ফেরো, আমাকে টেক্সট করবে। আর যদি খুব রাত হয়, আমি নিতে চলে আসব।”
মেয়ে মুখটা একটু বেঁকিয়ে বলল, “বাবা, তুমি আসবে না। আমি বড় হয়েছি।”
মেয়ে বেরিয়ে গেল। অণু মনের ভিতর একটা অজানা অস্বস্তি, কিছু বলল না। তার বিশ্বাস ছিল—মেয়ের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে।
রাত বাড়তে লাগল। দশটা, এগারোটা, বারোটা—সময় এগোতে থাকে। অণু একবার মেসেজ পাঠাল, “সব ঠিক?” মেয়ে রিপ্লাই দিল, “হ্যাঁ বাবা।”
অণু স্বস্তি পেল। কিন্তু স্বস্তি বেশিক্ষণ টিকল না। রাত প্রায় দুইটার দিকে মেয়ে টেক্সট করল—
“আমি সাবওয়েতে উঠেছি। ১৬৯ স্ট্রিটে পৌঁছাতে ৪৫ মিনিট লাগবে।”
অণুর বুকের ভেতর কেমন করে উঠল। এত রাত! মেয়ে বলেছে—সাবওয়েতে আছে। অণু চুপ করে বসে থাকতে পারল না। সে জ্যাকেট পরল, চাবি নিলো, বেরিয়ে পড়ল।
১৬৯ স্ট্রিট সাবওয়ে স্টেশনে গিয়ে দাঁড়াল। বাতাস ঠাণ্ডা। স্টেশনের আলো কাঁপা কাঁপা। কিছু মানুষ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে—কেউ দ্রুত হাঁটছে, কেউ ফোনে কথা বলছে, কেউ একা বসে আছে। অণু দাঁড়িয়ে থাকে, বারবার ঘড়ি দেখে।
৪৫ মিনিট কেটে যায়। ট্রেন আসার শব্দ শোনা যায়। মানুষ নেমে আসে। অণুর চোখ খুঁজতে থাকে—মেয়ে কোথায়?
হঠাৎ মেয়েটাকে দেখা গেল। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে। কিন্তু অণু প্রথম দেখাতেই বুঝতে পারল—কিছু একটা ঠিক নেই। মেয়ের হাঁটার গতি এলোমেলো, চোখ অদ্ভুতভাবে ভারী, মুখের হাসি অনিচ্ছাকৃত। অণু এগিয়ে গেল।
“তুমি ঠিক আছ?” অণু জিজ্ঞেস করল।
মেয়ে যেন তাকে দেখে একটু লজ্জা পেল, একটু বিরক্তও হল। “হ্যাঁ… ঠিক আছি, ঠিক আছি” সে বলল। কিন্তু কথার ভেতরে ঝাঁঝালো গন্ধ—অ্যালকোহলের। সেই মুহূর্তে অণু বুঝল—মেয়ে ড্রাঙ্ক।
অণু আর কিছু বলল না। শুধু মেয়ের হাতটা ধরে নিলো, যেন সে পড়ে না যায়। মেয়েও কোনো প্রতিবাদ করল না।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে মেয়ের মাথা দুলছিল। অণু খুব ধীরে গাড়ি চালাল, যেন ঝাঁকুনি না লাগে। গাড়ির ভেতর একটা চাপা নীরবতা। অণু রাগ করছিল না—কিন্তু তার বুকের ভেতর একটা ভারী ভাঙন হচ্ছিল। “আমি কি কোথাও ভুল করেছি? আমি কি বেশি স্বাধীনতা দিয়েছি?”
বাড়িতে ঢুকতেই মেয়ে সোজা বাথরুমে ছুটল। দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর বমির শব্দ। একবার, দুবার, তিনবার। অণু বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। মেখলা ঘুম থেকে উঠে এসে ব্যাপারটা বুঝতে পারল।
সে ফুঁসে উঠল, “এই হলো ফল! এত স্বাধীনতা দিয়েছ, এই ফল! তুমি কি মনে করো, কন্ট্রোল না করলে মেয়ে ঠিক থাকে? নিউ ইয়র্কে? এসব শহরে?”
অণু শান্ত গলায় বলল, “এখন ঝগড়ার সময় নয়। আগে মেয়েকে দেখি।”
বাথরুমের দরজা খুলল। মেয়ের মুখ ফ্যাকাসে, চোখ লাল। অণু তাকে ধরে ঘরে নিয়ে এসে শুইয়ে দিল। মেয়েটা কিছু বলতে চাইছিল—তার ঠোঁট কাঁপছিল। কিন্তু অণু বলল, “এখন না। সকালে কথা বলব। এখন ঘুমাও।”
সেই রাতে অণুর আর ঘুম এলো না। সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকাল। নিউ ইয়র্ক রাতেও জেগে থাকে—দূরে গাড়ির আলো, কোনো সাইরেন, কোথাও হাসির শব্দ। অণুর মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরতে থাকে—স্বাধীনতা মানে কি স্বেচ্ছাচারিতা?
অণু জানে, মেয়েটা নাবালিকা নয়। সে নিজেই পার্টিতে গেছে। সেখানে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা তার নিজেরও। কিন্তু অণু এটাও জানে—এই বয়সে মানুষ অনেক সময় নিজের সীমা ঠিক করে বুঝে উঠতে পারে না। বন্ধুদের চাপ, “পিয়ার প্রসার”—এসব মানুষকে এমন জায়গায় নিয়ে যায়, যেখান থেকে ফেরাটা কঠিন হতে পারে।
ভোরের দিকে অণু কিছুটা ঘুমাল। সকালে আলো উঠতেই ঘরের ভেতর নীরবতা বদলে গেল। মেয়ে ঘুম থেকে উঠে বসেছে। মাথা ব্যথা। চোখ ফুলে আছে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে অণুর ঘরের দরজায় দাঁড়াল।
অণু তাকিয়ে বলল, “এসো।”
মেয়ে ধীরে ধীরে এসে দাঁড়াল। তারপর খুব নিচু গলায় বলল, “বাবা…”
অণু অপেক্ষা করল।
মেয়ে মাথা নিচু করে বলল, “বাবা, আমি কি খুব খারাপ হয়ে গেছি?”
এই প্রশ্নটা অণুকে থামিয়ে দিল। রাগ করার জায়গাটা যেন মুহূর্তে সরে গেল। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই মেয়েটা—যাকে সে বই পড়ে শোনায়, আর্ট গ্যালারিতে নিয়ে যায়—সে এখন ভেঙে পড়েছে।
অণু মেয়ের কাছে এগিয়ে গেল। তাকে জড়িয়ে ধরল। খুব শক্ত করে নয়—আশ্রয়ের মতো। তারপর বলল,
“খারাপ ভালো—এটা এক মুহূর্তের বিচার নয়। মানুষ ভুল করে। কিন্তু মানুষ তখনই মানুষ হয়, যখন সে বুঝতে পারে—এটা ভুল ছিল।”
মেয়ের চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে। সে কাঁদে। অণুর শার্ট ভিজে যায়।
অণু খুব ধীরে বলে, “আমি তোকে নিষেধ করিনি, কারণ আমি চেয়েছি তুই বুঝে শিখিস। জীবন বইয়ের মতো নয়, সব পাতায় আগে থেকে লেখা থাকে না। কিন্তু শুনে রাখ—ভুল করলে লুকবি না। আমার কাছে আসবি। আমি বিচারক না—আমি তোর বাবা।”
মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে, “আমি কাল… আমি বন্ধুদের সঙ্গে… আমি না চাইতেও…” তার কথা আটকে যায়।
অণু খুব শান্ত গলায় বলে, “এখন সব কথা বলতে হবে না। আগে নিজেকে ঠিক কর। কিন্তু একটাই কথা মনে রাখ—তুই একা না। কারও যদি ভুল হয়, সেটারও একটা সমাধান থাকে। আর যদি কারও অপরাধ হয়, সেটারও বিচার হয়। আমরা যা দরকার করব।”
মেয়ে একটু মাথা তোলে। চোখে ভয়, আবার আশাও। সে বলে, “তুমি রাগ করনি?”
অণু হেসে ওঠে না। শুধু বলল, “রাগ করলে তোকে হারিয়ে ফেলব। আমি চাই না তুই আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাস। আমার রাগ থাকলেও, আমি আগে তোর পাশে থাকব।”
এই কথাটা মেয়ের ভেতরে যেন আলো জ্বালিয়ে দেয়। সে অণুর হাত ধরে বলে, “বাবা, আমি চেষ্টা করব।”
এই সকালটা অণুর জীবনের একটা নতুন সকাল। সে বুঝতে পারে, ভাঙনের পরেই সৃষ্টি হয়—এটা শুধু কবিতার কথা নয়, জীবনেরও কথা। মেয়ের ভেতরে যে ভাঙন এসেছে, সেটা হয়তো তাকে আরও সচেতন করবে। অণুর ভেতরেও একটা ভাঙন এসেছে—সে বুঝেছে, শুধুই ভালোবাসা যথেষ্ট নয়; ভালোবাসাকে সাহসী হতে হয়, সাপোর্টিভ হতে হয়, প্রোটেকশন দিতে হতে হয়—আর কখনও কখনও, কঠিন সিদ্ধান্তও নিতে হয়।
মেখলা এসে দাঁড়ায় দরজার কাছে। তার চোখেও দুশ্চিন্তা। সে ধীরে বলে, “আমি রেগে গিয়েছিলাম… ভয় পেয়ে।”
সেদিন দুপুরে অণু মেয়েকে বলল, “চলো, একটু হাঁটতে যাই।”
মেয়ে অবাক হয়ে বলল, “এখন?”
অণু বলল, “হ্যাঁ। হাঁটলে মাথা পরিষ্কার হয়। তারপর বাসায় এসে আমরা একটা মুভি দেখবো—আমাদের সেই প্রিয় মুভি ‘অপরাজিতা’।”
মেয়ে চুপ করে থাকে। তারপর খুব ছোট করে বলে, “ঠিক আছে বাবা।”
ওরা বাইরে বেরোয়। শীতের বাতাসে অণুর মনে হয়, জীবনটা মাঝে মাঝে ঝড়ে ভেঙে যায়, সুনামিতে ডুবে যায়—কিন্তু সেই ঝড়ের পরই মানুষ নিজের শিকড় খুঁজে পায়।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন