https://www.prothomalony.com/
17735
north-america
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ ০২:৫৩
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের পরিসংখ্যান দপ্তর সম্প্রতি ২০২৫ অর্থবছরের গ্রিন কার্ড-সংক্রান্ত যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো নামগুলোর একটি বাংলাদেশ। যে দেশগুলোতে গ্রিন কার্ডপ্রাপ্তদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, তার তালিকায় ফিলিপাইনের পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নাইজেরিয়া, ইথিওপিয়া, গুয়াতেমালা, সিরিয়া এবং ইয়েমেন।
অভিবাসনের কড়াকড়ির এই সময়ে, যখন ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিতে একের পর এক দরজা বন্ধ হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের নাম এই "বৃদ্ধির তালিকায়" থাকাটা একধরনের প্রতীকী স্বস্তির খবর, যদিও পুরো ছবিটা এতটা সরল নয়। আমরা জানি, সাময়িক নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে ইমিগ্র্যান্ট ভিসা প্রদান গত জানুয়ারি থেকে স্থগিত রয়েছে। এ পরিস্থিতির অবসান কবে হবে, কেউ বলতে পারছেন না। ২০২৬ সালের পরিসংখ্যান যখন প্রকাশ হবে, তখন সংখ্যাগুলো অনেকটাই পাল্টে যেতে পারে।
২০২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে মোট ১৩ লাখ ২০ হাজার ৮০ জন গ্রিন কার্ড পেয়েছেন। আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩৭ হাজার কম, শতাংশের হিসেবে যা আড়াই শতাংশের মতো পতন। এর মধ্যে ৭ লাখ ৪৬ হাজার ৮৩০ জন আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে থেকে স্ট্যাটাস পরিবর্তন করেছেন। বাকি ৫ লাখ ৭৩ হাজার ২৬০ জন নতুন করে দেশটিতে পা রেখেছেন। কিন্তু এই সামগ্রিক পতনের আড়ালে যে আঞ্চলিক পুনর্বিন্যাস ঘটেছে, সেটিই আসল গল্প।
উত্তর আমেরিকা থেকে আসা গ্রিন কার্ডধারীর সংখ্যা ৫ লাখ ৮৪ হাজার থেকে কমে ৪ লাখ ৯৩ হাজারে নেমেছে। এশিয়া থেকে আসা সংখ্যা ৪ লাখ ৩১ হাজার থেকে বেড়ে ৪ লাখ ৬০ হাজারে পৌঁছেছে। আফ্রিকা থেকে আসা সংখ্যাও ১ লাখ ১৭ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ ৪২ হাজার হয়েছে। অর্থাৎ কিউবার মতো দেশ থেকে আসা মানুষের সংখ্যা যেভাবে অর্ধেকেরও নিচে নেমে গেছে—১ লাখ ৭৮ হাজার থেকে ৮৪ হাজার ৮২০-এ—সেই শূন্যস্থান অনেকটাই পূরণ করেছে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলো, যার মধ্যে বাংলাদেশও একটি উল্লেখযোগ্য অংশীদার।
এই পরিসংখ্যানের পেছনের মানবিক গল্পটাই আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। বাংলাদেশ থেকে যারা গ্রিন কার্ড পাচ্ছেন, তাদের সিংহভাগই পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতে—মার্কিন নাগরিকের সরাসরি স্বজন বা পারিবারিক অগ্রাধিকার ভিসার মাধ্যমে। জাতীয় পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, মার্কিন নাগরিকদের নিকটাত্মীয় ক্যাটাগরিতে গ্রিন কার্ডপ্রাপ্তদের সংখ্যা ৬ লাখ ৬৯ হাজার থেকে বেড়ে ৬ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০-তে পৌঁছেছে। পারিবারিক অগ্রাধিকার ক্যাটাগরিতেও বৃদ্ধি পেয়ে সংখ্যা ১ লাখ ৮৪ হাজার থেকে ১ লাখ ৯৬ হাজার হয়েছে।
বাংলাদেশি অভিবাসনের ইতিহাস মূলত এই পারিবারিক শিকল বেয়েই এগিয়েছে। একজন এসে থিতু হন, তারপর ভাই-বোন, বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী—একে একে যুক্ত হন। জ্যাকসন হাইটস কিংবা পার্কচেস্টারের মতো নিউইয়র্কের পাড়াগুলোতে যে বাংলাদেশি পরিবারগুলো নতুন করে দোকান খুলছে, সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করাচ্ছে, তাদের বড় অংশই এই পারিবারিক ধারার ফসল।
তবে এই "প্রবৃদ্ধি"র গল্পটিকে নিরঙ্কুশ সুখবর বলে ধরে নেওয়ারও উপায় নেই। ট্রাম্প প্রশাসন একই সময়ে অভিবাসনের দরজা যেভাবে সংকুচিত করছে, তার প্রভাব বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের ওপরও পড়তে বাধ্য। মে মাসে ইউএসসিআইএস কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছে, স্ট্যাটাস অ্যাডজাস্টমেন্টের আবেদন যেন আরও কঠোর বিবেচনাবোধ দিয়ে যাচাই করা হয়। কারণ এই সুবিধাকে এখন আর "অধিকার" নয়, বরং "বিবেচনাধীন সুবিধা" হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জুনের ৫ তারিখে রোড আইল্যান্ডের একজন ফেডারেল বিচারক অবশ্য ৩৯টি দেশের আবেদনকারীদের গ্রিন কার্ড ও অন্যান্য অভিবাসন সুবিধার সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখার প্রশাসনিক নীতি আটকে দিয়েছেন। রায়ে তিনি বলেছেন, ইউএসসিআইএস তাদের আইনি এখতিয়ার ছাড়িয়ে গেছে। পাশাপাশি "পাবলিক চার্জ" নিয়মের অধীনে আর্থিক যোগ্যতা যাচাই আরও কঠোর হয়েছে। আর সাম্প্রতিক এক সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ফলে বিদেশ থেকে ফেরা স্থায়ী বাসিন্দাদের ক্ষেত্রেও অভিবাসন কর্মকর্তাদের হাতে বাড়তি ক্ষমতা এসেছে।
সব মিলিয়ে যে চিত্রটি দাঁড়ায়, তা একধরনের দ্বৈত বাস্তবতা। একদিকে সংখ্যার হিসেবে ২০২৫ সালে বাংলাদেশিদের গ্রিন কার্ডপ্রাপ্তি বেড়েছে, যা প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজের জন্য স্বস্তির খবর হয়ে আসতেই পারে। অন্যদিকে, সেই একই সময়ে গোটা ব্যবস্থাটিই এমনভাবে পুনর্গঠিত হচ্ছে যে ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
শরণার্থীভিত্তিক গ্রিন কার্ডপ্রাপ্তির সংখ্যাও এক-তৃতীয়াংশের বেশি কমে গেছে—১ লাখ ৭৮ হাজার ২০০ থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার ৪৭০-এ।
যারা বছরের পর বছর ইন্টারভিউয়ের তারিখের অপেক্ষায় আছেন, যাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো একটি সরকারি সিলমোহরের ওপর ঝুলে আছে, বাংলাদেশের বহু পরিবার পারিবারিক অভিবাসনের জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। আইন মেনে, বিধি-বিধান মেনে, নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে অপেক্ষা করছেন। কারও কারও ইন্টারভিউও হয়ে গেছে, কিন্তু ভিসা ইস্যু হচ্ছে না।
এসব বিবেচনা করলে এই পরিসংখ্যানকে নিছক সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। এটি বহু পরিবারের পুনর্মিলনের গল্প, বহু জীবনের নতুন করে শুরুর গল্প। কাগজে-কলমে যা "উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি", বাস্তবে তা হাজারো বাংলাদেশি পরিবারের বহু বছরের অপেক্ষা, উৎকণ্ঠা এবং প্রার্থনার সমষ্টি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ছবিঃ এ আই এজেন্ট
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন