https://www.prothomalony.com/
17594
north-america
প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ ০১:০৪
বর্ণাঢ্য আয়োজন, নতুন ও প্রবীণ শিল্পীদের মনকাড়া পরিবেশনা এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির মেলবন্ধনে নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল আর্টল্যাব মিডিয়া প্রোডাকশনের ১০ বছর পূর্তি মিউজিক ফেস্ট। গত ২৮ জুন, রোববার নিউ জার্সির সমারসেট টাউনের আনন্দ মন্দিরের ঐতিহ্যবাহী টেগোর হল (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল) অডিটোরিয়ামে এই সুরের মহোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। বিগত বছরগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এবারের কনসার্টটিও সাজানো হয়েছিল এমন কিছু কালজয়ী ও জটিল গানের লাইভ পরিবেশনা দিয়ে, যা সাধারণত মঞ্চে সচরাচর দেখা যায় না।

অনুষ্ঠানটির মূল সঞ্চালনায় (মাস্টার অব সেরিমনি) ছিলেন অজন্তা সিদ্দিকী। তাঁর প্রাণবন্ত ও হৃদয়ছোঁয়া উপস্থাপনা পুরো আসরকে মুখর করে রাখে। সঞ্চালনায় আরও যুক্ত ছিলেন জাভেদ মাহমুদ শিপলু, অরুন্ধতী ও শাহনাজ। প্রতিভাবান নতুন ও তরুণ শিল্পীদের বড় মঞ্চে তুলে আনার যে প্রতিশ্রুতি আর্টল্যাব দিয়েছিল, এই আয়োজনে তার সফল বাস্তবায়ন দেখা গেছে।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় বাঙালি ও অ-বাঙালি শিশুদের সম্মিলিত কণ্ঠে ‘ধনধান্যে পুষ্পে ভরা’ কোরাস পরিবেশনার মধ্য দিয়ে। বাংলা মাতৃভাষা না হওয়া সত্ত্বেও বিদেশি শিশুদের মুখে চমৎকার বাংলা উচ্চারণে গানটি উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করে এবং মনে করিয়ে দেয়— সুরের কোনো সীমানা নেই।
এরপর একে একে মঞ্চে আসেন অনিন্দ্য, অনিন্দিতা ও মালিনী। তাঁরা পরিবেশন করেন শ্যামল মিত্রের জনপ্রিয় গান ‘জীবন খাতা’ এবং রবীন্দ্রসংগীতের মনোমুগ্ধকর ম্যাশআপ— ‘সখী ভাবনা কাহারে বলে’, ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা’ ও ‘ওলো সই’। এরপর শিল্পী শামীম গেয়ে শোনান নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর বিখ্যাত গান ‘আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে’।
সুরের ধারা বজায় রেখে জয়ী, নুপুর, জয়শ্রী, গায়ত্রী ও রাজিব সরকার একে একে পরিবেশন করেন ‘নিয়াতে শ’ক’, ‘ফিরে লে আয়া দিল’, ‘ইয়ে সামা’, ‘ইকতারা’, ‘জাত গেল’, ‘তু মিলে’ এবং ‘আওয়ারা আংগারা’র মতো শ্রোতাপ্রিয় গান।

অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘এস অ্যান্ড আর ফ্রেন্ডস’ ব্যান্ডের পরিবেশনা। তারা মঞ্চে পরিবেশন করে ‘স্বার্থপর’ (ট্র্যাপ), ফিডব্যাকের ‘মৌসুমী’ এবং সোলসের ‘এরই মাঝে’। এরপর ‘ডাক দিয়েছেন দয়াল আমারে’ এবং কিংবদন্তি ব্যান্ড কুইনের ‘We Will Rock You’ গানের এক অনন্য ফিউশন ও ম্যাশআপ পরিবেশিত হয়।
সোলসের ‘নিঃসঙ্গতা’ গানের সঙ্গে কিশোর শিল্পী সাফওয়াতের স্যাক্সোফোনের যুগলবন্দি দর্শকদের কাছ থেকে বিপুল করতালি কুড়ায়। এছাড়া মাইলস ব্যান্ডের ‘এই মন তো আর মানে না’ গানটির রক অ্যান্ড রোল ঘরানার পরিবেশনায় ব্যান্ড সদস্যদের বাদ্যযন্ত্রের নিখুঁত সমন্বয় ছিল প্রশংসনীয়।
নতুন প্রজন্মের উদীয়মান প্রতিভাদের পর্বে তরুণ পিয়ানোবাদক আলমীর পিয়ানোতে নিজের কম্পোজিশন ‘Waltz of the Violets’ এবং সি. রোলিনের ‘Good Vibes’ পরিবেশন করেন। এরপর রেশমি গেয়ে শোনান আর. ডি. বর্মনের ‘তুমি কত যে দূরে’। নাহিদ, ঋতিকা ও ঋতাজা পরিবেশন করেন ‘কতবার বোঝাবো’, ‘রোজা’ ও ‘জানাম জানাম’। এই পর্বের সমাপ্তি ঘটে টিউলিপের কণ্ঠে ‘খামোশিয়া’ গানের মধ্য দিয়ে।
অনুষ্ঠানের আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ ছিল ভয়েস কোচ ইলডিকো রজ (Ildiko Rozs)-এর কয়ার দলের কিশোর-কিশোরীদের পরিবেশনায় বিশ্বখ্যাত ‘We Are the World’। এতে স্যাক্সোফোনে সংগত করেন কিশোর শিল্পী জাওয়াদ।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমারসেটের কাউন্সিলম্যান-অ্যাট-লার্জ শিবরামান আনবার্সন। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, “গানের কোনো নিজস্ব ভাষা নেই।” বিভিন্ন দেশের ও সংস্কৃতির শিল্পীদের এক মঞ্চে এনে সুরের মালায় গেঁথে দেওয়ার জন্য তিনি আর্টল্যাবের ভূয়সী প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে গত দীপাবলিতে হাজারো মানুষের সামনে আর্টল্যাবের পরিবেশনার স্মৃতিচারণ করেন। এপার বাংলা-ওপার বাংলা, আসাম, নেপাল, তামিল, তেলেগু, স্থানীয় মার্কিন এবং বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের এই মিলনমেলাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে তিনি গ্র্যান্ড স্পন্সর ইটিটি (ETT)-এর পরিচালক আসিফ মতিনের হাতে সম্মানসূচক ক্রেস্ট তুলে দেন।
পরবর্তী পর্বে রকস্ট্রাটা ব্যান্ডের ভোকাল শোয়েব মঞ্চে এসে জেমসের জনপ্রিয় গান ‘পাগলা হাওয়া’ পরিবেশন করেন। এরপর শিশু শিল্পী ও গত বছরের ট্যালেন্ট হান্ট বিজয়ী কান্তি বুলুসুকে সঙ্গে নিয়ে পরিবেশিত হয় আর্টল্যাবের মৌলিক গান ‘One Big World’।
শিশুদের আর্ট প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের নাম ঘোষণার পর দর্শকদের বিশেষ অনুরোধে তৈরি হয় আবেগঘন এক মুহূর্ত। প্রয়াত জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী কে. কে. (KK)-এর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মঞ্চে উপস্থিত সব শিল্পী একসঙ্গে তাঁর কালজয়ী গান ‘পাল’ পরিবেশন করেন। এর মধ্য দিয়েই শেষ হয় মনোমুগ্ধকর এই সুরের সন্ধ্যা।
অনুষ্ঠান শেষে পেনসিলভানিয়া থেকে আগত দর্শক হাসান বলেন, “এমন অনুষ্ঠান দেখে মন ভরে যায়। মনে হচ্ছিল দেশের কোনো কনসার্টে বসে আছি।”
নিউ জার্সির বাসিন্দা তাহসিন রউফ বলেন, “লাইভ কনসার্ট হিসেবে এই কমিউনিটিতে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে এটিই সেরা।” ভারতীয় দর্শক নীলেশ বলেন, “মনে হচ্ছিল কোনো বলিউডের লাইভ প্রোডাকশন উপভোগ করছি।” চেরি হিল থেকে আসা অপু মন্তব্য করেন, “আর্টল্যাবের অনুষ্ঠান দিন দিন মানুষের কাছে আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এবং প্রতিবারই নতুন মাত্রা যোগ করছে।”
টিকিট বিক্রয় ও মিডিয়া পার্টনার DesiEventsGo.com-এর কর্ণধার ইউসুফ খান রাসেল বলেন, “এই অনুষ্ঠানে এমন কিছু গান লাইভ পরিবেশন করা হয়েছে, যা অত্যন্ত জটিল এবং সাধারণত শিল্পীরা মঞ্চে পরিবেশন করতে চান না। আর্টল্যাব ও এস অ্যান্ড আর ফ্রেন্ডস সেগুলো চমৎকার সব টুইস্ট ও সারপ্রাইজসহ পরিবেশন করেছে, যা সত্যিই মোহনীয় ছিল।”
পুরো কনসার্টের স্টেজ পরিকল্পনা ও প্রোডাকশনের দায়িত্বে ছিল ‘এস অ্যান্ড আর ফ্রেন্ডস’। বাদ্যযন্ত্রে লিড গিটারে ছিলেন শোভন রহমান ও সাকিব হাসান, কিবোর্ডে রাজিব রাসেল ও আব্দুল্লাহ আল আমিন পিয়াল, বেস গিটারে নাঈম, পারকাশনে রাকেশ ব্যানার্জি এবং ড্রামসে ড্যানি উইলিয়াম।
শিশুদের আর্ট প্রতিযোগিতা আয়োজনের দায়িত্বে ছিলেন বাংলা কেয়ার ফাউন্ডেশনের শাহনাজ। এছাড়া শব্দ প্রকৌশলে ছিলেন বিডি সাউন্ডের নিবিড়, আলোকসজ্জায় নাদিম, স্টেজ ব্যবস্থাপনায় রায়ান, ব্র্যান্ডিং ও ডেকোরেশনে আশরাফুল হক শামীম এবং আলোকচিত্রে ছিলেন হেলাল।
সামগ্রিক আয়োজনে ছিল আর্টল্যাব, আর বিশেষ স্পন্সর হিসেবে সহযোগিতা করেছে নিউ ইয়র্ক লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির শিল্পা গান্ধী।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন