https://www.prothomalony.com/

17389

north-america

উত্তর আমেরিকা

হাজার হাজার আমেরিকান কেন ছেড়ে দিচ্ছেন মার্কিন নাগরিকত্ব?

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬ ০০:০২

একসময় মার্কিন নাগরিকত্ব ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিচয়গুলোর একটি। সেই নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য মানুষ বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছেন, অসংখ্য বাধা পেরিয়েছেন, আদালতে লড়েছেন, জীবনের পরিকল্পনা বদলেছেন। কিন্তু সময় বদলাচ্ছে। এখন উল্টো চিত্রও দেখা যাচ্ছে। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছায় মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ করছেন।

শুধু রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়, এর পেছনে রয়েছে করব্যবস্থা, আর্থিক জটিলতা, বিদেশে বসবাসের বাস্তবতা এবং নতুন পরিচয়ের আকাঙ্ক্ষা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারনাল রেভিনিউ সার্ভিস (আইআরএস)-এর প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোট ৪ হাজার ৮৮৯ জন মার্কিন নাগরিক আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন। এটি গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যা। অভিবাসন ও কর বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০২৬ সালে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের হিসাবে, বর্তমানে ৪০ হাজারেরও বেশি প্রবাসী আমেরিকান নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে রয়েছেন।

নিউজিল্যান্ডে বসবাসকারী ৩৪ বছর বয়সী ইরিন ক্লাট তাদেরই একজন। ২০১৬ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে নিউজিল্যান্ডে স্থায়ী হন। এক দশক পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন।

তার ভাষায়, "আমি কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খুব গভীরভাবে নিজেকে যুক্ত অনুভব করিনি। রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিদেশে থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের করব্যবস্থার আওতায় থাকার বিষয়টি আমাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। এখন আমার কোনো অনুশোচনা নেই।"

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য আলোচনায় এলেও অধিকাংশ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় কারণ অর্থনৈতিক।

যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের খুব অল্প কয়েকটি দেশের একটি, যারা নাগরিকত্বের ভিত্তিতে কর আরোপ করে। অর্থাৎ একজন মার্কিন নাগরিক পৃথিবীর যে দেশেই বসবাস করুন না কেন, নির্দিষ্ট শর্তে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে কর-সংক্রান্ত তথ্য জমা দিতে হয়। ফরেন অ্যাকাউন্ট ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স অ্যাক্ট (FATCA) কার্যকর হওয়ার পর এই বাধ্যবাধকতা আরও কঠোর হয়েছে।

এর প্রভাব পড়েছে বিদেশে বসবাসকারী লাখো আমেরিকানের ওপর। ইউরোপের অনেক ব্যাংক জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিক—যাদের অনেকেই কখনো যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসও করেননি—তাদের অ্যাকাউন্ট খুলতে বা আর্থিক সেবা দিতে অনাগ্রহী। অনেকের জন্য গৃহঋণ নেওয়া, অবসরকালীন সঞ্চয় গঠন কিংবা বিনিয়োগ করাও জটিল হয়ে উঠেছে।

এদিকে নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়াও কিছুটা সহজ হয়েছে। চলতি বছর মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন ফি ২ হাজার ৩৫০ ডলার থেকে কমিয়ে ৪৫০ ডলারে নামিয়ে এনেছে। প্রায় ৮০ শতাংশ ফি কমানোর পর আবেদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

তবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া মোটেও সহজ নয়। মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হলে আগে অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব অর্জন করতে হয়। এরপর পাঁচ বছরের কর-সংক্রান্ত নথিপত্র জমা দিতে হয়, মার্কিন দূতাবাস বা কনস্যুলেটে সশরীরে উপস্থিত হয়ে শপথ করতে হয় এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। যাদের সম্পদের পরিমাণ ২০ লাখ ডলারের বেশি, তাদের জন্য অতিরিক্ত কর-সংক্রান্ত বিধানও প্রযোজ্য হতে পারে।

আইনজীবীরা সতর্ক করে বলছেন, এটি একবারের এবং স্থায়ী সিদ্ধান্ত। নাগরিকত্ব ত্যাগের পর ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য ভিসা লাগবে এবং সেই ভিসা পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই সাময়িক রাজনৈতিক ক্ষোভ বা স্বল্পমেয়াদি আর্থিক সুবিধার কথা ভেবে এমন সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

অন্যদিকে প্রবাসী আমেরিকানদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন Americans Overseas এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ড্যান ডারলাখার মনে করেন, নাগরিকত্ব ত্যাগের আগে মানুষকে আরেকবার ভাবা উচিত।

তার কথায়, "আপনি যদি মার্কিন নাগরিক হন, তাহলে এখনও আপনার ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার ব্যবহার করে পরিবর্তনের চেষ্টা করা যেতে পারে।"

মার্কিন নাগরিকত্ব আজও বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান পরিচয়। কিন্তু বৈশ্বিক জীবনযাত্রা, করনীতি এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে সেই পরিচয় ধরে রাখার মূল্যও আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। আর সেই কারণেই, একসময় যে নাগরিকত্ব অর্জন ছিল স্বপ্ন, এখন সেটি ত্যাগ করাও অনেকের কাছে কঠিন কিন্তু বাস্তব একটি সিদ্ধান্ত হয়ে উঠছে।
 

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন