https://www.prothomalony.com/

17365

north-america

উত্তর আমেরিকা

যুদ্ধ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় অনিশ্চিত বিশ্ব

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬ ০৪:২৪

বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ, অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। একদিকে ইউরোপে যুদ্ধের উত্তাপ, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, আফ্রিকায় গৃহযুদ্ধ ও সামরিক শাসনের বিস্তার এবং এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিশ্বব্যবস্থাকে নতুন এক সংকটময় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের তুলনায় বর্তমান বিশ্ব অন্যতম অস্থির সময় অতিক্রম করছে।

ইউরোপে চলমান ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো বৈশ্বিক নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা এই সংঘাত শুধু ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়েছে পুরো ইউরোপের অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সামরিক কৌশলের ওপর। যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা জোট ও রাশিয়ার মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে এবং নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে পরিস্থিতি আরও জটিল। গাজাকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাত ও মানবিক সংকট বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। একই সঙ্গে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই উত্তেজনা বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিলে এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে পড়তে পারে।

আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও অস্থিরতা উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। সুদানে চলমান গৃহযুদ্ধকে বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মানবিক বিপর্যয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। দেশটিতে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং খাদ্য সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। একই সঙ্গে মালি, নাইজার ও বুরকিনা ফাসোর মতো দেশগুলোতে সামরিক শাসন ও নিরাপত্তা সংকট রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে দিয়েছে। কঙ্গোতেও সশস্ত্র সংঘাত ও সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে।

এশিয়ায় মিয়ানমার সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের মধ্যে রয়েছে। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক বাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ অব্যাহত থাকায় সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। একই সময়ে দক্ষিণ চীন সাগর ও তাইওয়ান ইস্যুকে কেন্দ্র করে চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্রদের মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। যদিও এখনো সরাসরি সংঘাত শুরু হয়নি, তবুও আন্তর্জাতিক মহল এই অঞ্চলকে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংকটকেন্দ্র হিসেবে দেখছে।

লাতিন আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশেও রাজনৈতিক মেরুকরণ ও অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। জনঅসন্তোষ, দুর্বল অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে অনেক দেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নির্বাচিত সরকারের মধ্যেও কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ অনেক দেশে বৃদ্ধি পেয়েছে। কোথাও সামরিক শাসন, কোথাও রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, আবার কোথাও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষমতার লড়াই গণতান্ত্রিক পরিবেশকে দুর্বল করে তুলছে।

রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপও বিশ্ব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা অনেক দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটকে তীব্র করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও নতুন করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে, যা অনেক অঞ্চলে অস্থিতিশীলতার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্ব একাধিক সংকটের যুগে প্রবেশ করেছে, যেখানে যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা একে অপরকে প্রভাবিত করছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার না হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তবে সংলাপ, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রচেষ্টা জোরদার করা গেলে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার সুযোগ এখনো রয়েছে। বর্তমান বাস্তবতা হলো, বিশ্বের বহু দেশ আজ অনিশ্চয়তা, সংঘাত এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বের এক নতুন অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে।
 

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন