https://www.prothomalony.com/

17258

north-america

উত্তর আমেরিকা

যুদ্ধবিরতি চুক্তির দোরগোড়ায় মার্কিন-ইরান: হরমুজ খুলবে ৬০ দিনের জন্য, তবে ট্রাম্পের সই এখনও বাকি

প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৬ ০৩:০৪

তিন মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অস্থায়ী চুক্তির রূপরেখা তৈরি হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। মার্কিন সূত্রের বরাতে জানা গেছে, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতিকে ৬০ দিন বাড়ানো, হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং তেহরানের পারমাণবিক কার্যক্রম নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার কাঠামো তৈরি করার বিষয়ে একটি সাময়িক সমঝোতায় পৌঁছানো হয়েছে। তবে চুক্তির চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য এখনও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের স্বাক্ষর বাকি, এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় মিডিয়া বলছে তাদের দিক থেকেও এখনও চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি।

পারস্য উপসাগরে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই এই চুক্তির খবর সামনে এসেছে। বৃহস্পতিবার মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের জানান, সব কিছু নির্ভর করছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কী চান তার উপর। "প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমেরিকার জনগণের জন্য কোনো খারাপ চুক্তি করবেন না," বলেন তিনি। বেসেন্ট স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ইরানকে হরমুজ প্রণালী খুলতে হবে, অতি-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করতে হবে এবং পারমাণবিক কর্মসূচি না রাখার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে — এর আগে কোনো নিষেধাজ্ঞা শিথিলের প্রশ্নই উঠবে না।

প্রস্তাবিত সমঝোতা অনুযায়ী হরমুজ প্রণালীতে "অবাধ" জাহাজ চলাচল পুনরুদ্ধার হবে। ইরান জাহাজগুলোর উপর কোনো টোল আরোপ করতে পারবে না এবং ৩০ দিনের মধ্যে প্রণালী থেকে সমস্ত মাইন সরিয়ে নিতে বাধ্য থাকবে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে তার নৌ-অবরোধ তুলে নেবে এবং ইরানকে তেল রফতানির সুযোগ দিতে নিষেধাজ্ঞার ছাড় দেবে। ট্রাম্প বুধবারের মন্ত্রিসভা বৈঠকে বলেছিলেন, "প্রণালী সবার জন্য খোলা থাকতে হবে, এটা আন্তর্জাতিক জলসীমা। আমরা নজর রাখব, কিন্তু কেউ এটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।"

চুক্তির সবচেয়ে জটিল প্রশ্নটি হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। চুক্তিতে ইরানের পক্ষ থেকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি থাকবে এবং ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির মধ্যে এই বিষয়ে নতুন আলোচনা শুরু হবে। তবে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি ছেড়ে দিতে রাজি নয় বলে বারবার জানিয়ে আসছে, যা তেহরানের কাছে "লাল রেখা"।

চুক্তির সম্ভাবনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই বৈশ্বিক তেলবাজারে স্বস্তির হাওয়া বইতে শুরু করেছে। বেসেন্ট জানান, মে মাসে তেলের দাম ইতিমধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে এবং একবার প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল শুরু হলে বাজারে সরবরাহ "খুব ভালোভাবে" পূরণ হবে বলে তিনি আশাবাদী। বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুড ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৪ ডলারে নেমেছে।

ক্যাপিটল হিলে এই চুক্তির বিষয়ে প্রতিক্রিয়া মিশ্র। কট্টরপন্থী রিপাবলিকানরা সংশয় প্রকাশ করেছেন — তারা মনে করছেন যে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে অক্ষুণ্ণ রেখে কোনো চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না। সিনেটর টেড ক্রুজ বলেছেন, ফেব্রুয়ারিতে ইরানে হামলার সিদ্ধান্তটি ছিল ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের "সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ" পদক্ষেপ এবং অর্জিত সুবিধা নষ্ট করা উচিত হবে না। অন্যদিকে সিনেটর র‍্যান্ড পল বলেছেন, "যুদ্ধ প্রায় সবসময়ই আলোচনার মাধ্যমে শেষ হয়। সমালোচকদের উচিত ট্রাম্পকে 'আমেরিকা ফার্স্ট' সমাধান খোঁজার সুযোগ দেওয়া।" সিনেটর লিন্ডসি গ্রাহাম চাইছেন যেকোনো শান্তি চুক্তি কংগ্রেসে ভোটের মাধ্যমে অনুমোদন করা হোক।

ইরানপন্থী তাসনিম সংবাদ সংস্থার বরাতে জানা গেছে, চুক্তি হলে ইরান পাকিস্তানের মাধ্যমে তা ঘোষণা করবে, যে দেশ এই আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, সর্বোচ্চ নেতা মোজতাবা খামেনির অনুমোদন ছাড়া কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না, যিনি যুদ্ধের প্রথম দিনের হামলায় আহত হওয়ার পর থেকে প্রকাশ্যে আসেননি।

সব মিলিয়ে চুক্তির সম্ভাবনা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে উজ্জ্বল, কিন্তু পারস্য উপসাগরে এখনও উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং সামরিক সংঘর্ষ থামেনি। ট্রাম্পের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের উপরেই নির্ভর করছে ত্রিশ লক্ষ টন তেল প্রতিদিন যে পথে বিশ্বের বুকে প্রবাহিত হতো — সেই হরমুজ কখন ফের প্রাণ ফিরে পাবে।

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন