https://www.prothomalony.com/
17153
north-america
ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতি ও গণ-ডিপোর্টেশন (গণ-বহিষ্কার) অভিযানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, গণ-ডিপোর্টেশনের ফলে পরিবারগুলো যেমন বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, তেমনি স্থানীয় অর্থনীতিতে দেখা দিচ্ছে তীব্র শ্রমিক সংকট। এতে মার্কিন নাগরিকদের জীবনযাত্রাও সংকটে পড়ছে।
ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো বোল্ডারের এক সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
‘লেবার মার্কেট ইমপ্যাক্টস অব আইস অ্যাক্টিভিটি ইন ট্রাম্প ২.০’ শীর্ষক এই ওয়ার্কিং পেপারটি মে মাসের শুরুতে যৌথভাবে প্রকাশ করেন অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক ক্লোই ইস্ট এবং ইনস্টিটিউট ফর বিহেভিওরাল সায়েন্সের গবেষণা সহকারী এলিজাবেথ কক্স।
গবেষণাপত্রটিতে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর মাসের মধ্যবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলের শ্রমবাজারের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষক ক্লোই ইস্ট এবং এলিজাবেথ কক্স মূলত সেই সব অঞ্চলকে বেছে নিয়েছেন, যেখানে এই ১০ মাসে হঠাৎ করে আইসের (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) অভিযান ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছিল। এরপর তারা সেই অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে এমন কিছু অঞ্চলের তুলনা করেছেন, যেখানে এই ধরনের কোনো আকস্মিক অভিযান হয়নি।
গবেষকেরা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় জরিপগুলোর কোনোটিতেই নাগরিকদের ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাস বা অভিবাসন পদমর্যাদা জানতে চাওয়া হয় না। এই কারণে অর্থনীতিবিদেরা অনথিভুক্ত বা অবৈধ অভিবাসীদের জনসংখ্যা নির্ধারণ করতে একটি বিশেষ অনুমিত ‘প্রক্সি মডেল’ ব্যবহার করেছেন।
এই মডেলটি ব্যবহার করে গবেষক ইস্ট এবং কক্স দেখতে পান, যেসব অঞ্চলে আইসের অভিযান তীব্র ছিল, সেখানে বসবাসরত এবং গ্রেপ্তার এড়াতে সক্ষম হওয়া সম্ভাব্য অনথিভুক্ত অভিবাসীদের মধ্যে কাজ করার হার গড়ে ৪ শতাংশ কমে গেছে। অর্থাৎ, অভিযানের আতঙ্কে অনেকেই কর্মক্ষেত্রে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন।
অনেকে মনে করেন, অভিবাসী শ্রমিক চলে গেলে মালিকপক্ষ বেশি বেতনে স্থানীয়দের চাকরি দেবে; কিন্তু গবেষণায় এর উল্টো চিত্র পাওয়া গেছে। গবেষকেরা দেখেছেন, আইস অভিযানের পর অভিবাসীদের ফেলে যাওয়া শূন্যস্থান পূরণে নিয়োগকর্তারা স্থানীয় মার্কিন কর্মীদের আকর্ষণ করতে মজুরি বাড়িয়েছেন, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একইভাবে, এই কঠোর অভিযানের পর যুক্তরাষ্ট্রের জন্মসূত্রে নাগরিক বা বৈধ কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বেড়েছে—এমন কোনো লক্ষণও দেখা যায়নি। উল্টো চিত্র হিসেবে দেখা গেছে, আইসের জোরালো অভিযান হওয়া এলাকাগুলোতে হাইস্কুল বা তার কম শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন স্থানীয় মার্কিন পুরুষদের কর্মসংস্থান গড়ে ১.৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এই অভিযানের নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে কৃষি, উৎপাদন (ম্যানুফ্যাকচারিং) এবং নির্মাণ (কনস্ট্রাকশন) শিল্পে।
গবেষক ক্লোই ইস্ট বলেন, ‘সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা রয়েছে যে গণ-ডিপোর্টেশন দিলে স্থানীয়দের জন্য চাকরির সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু আমাদের গবেষণাসহ অসংখ্য সমীক্ষায় দেখা গেছে এটি সম্পূর্ণ ভুল। একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান যদি প্রয়োজনীয় শ্রমিক না পায়, তবে তারা নতুন কাজ নেওয়া কমিয়ে দেবে। ফলে সামগ্রিকভাবে সবার জন্যই কর্মসংস্থান কমে যায়।’
নিউইয়র্কের সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো জে. কেভিন অ্যাপলবি বলেন, ‘অনথিভুক্ত অভিবাসীরা নির্দিষ্ট কিছু শিল্পে কাজ করে অর্থনীতিকে গতিশীল রাখেন, যা পরোক্ষভাবে অন্যান্য খাতেও নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করে। তা ছাড়া, বেশিরভাগ মার্কিন নাগরিকই অভিবাসীদের করা কঠোর পরিশ্রমের কাজগুলো করতে চান না। ফলে এই গণ-ডিপোর্টেশন শ্রমবাজার সংকুচিত করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।’
ক্যাথলিক লেবার নেটওয়ার্কের শ্রম উপদেষ্টা ক্লেটন সিনিয়াই এই পদক্ষেপকে ‘নিষ্ঠুর’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘এটি স্থানীয় কর্মীদের সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। এই কারণেই চার্চ এবং মার্কিন শ্রমিক ইউনিয়ন মনে করে, অভিবাসন সমস্যার একমাত্র সমাধান হলো আইন মেনে চলা অনথিভুক্ত শ্রমিকদের নাগরিকত্বের সুযোগ দেওয়া।’
সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক এইমি শেলিড মেয়ার বলেন, ‘ক্যাথলিক সামাজিক শিক্ষা অনুযায়ী, প্রত্যেক শ্রমিকই একজন মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ; রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ছুড়ে ফেলার কোনো বস্তু নন।’ তিনি আরও জানান, গণ-ডিপোর্টেশন নীতি কর্মজীবী পরিবারগুলোকে শক্তিশালী করার বদলে স্থানীয় অর্থনীতিকে ধ্বংস করছে।
বিশেষজ্ঞ কেভিন অ্যাপলবি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘নৈতিক সংকটটি হলো— আমরা অর্থনৈতিকভাবে অভিবাসীদের সাহায্য নিচ্ছি, তাদের সস্তা শ্রমের সুবিধা ভোগ করছি, অথচ রাজনৈতিক স্বার্থে তাদেরই বলির পাঁঠা বানাচ্ছি এবং তাদের পরিবারকে বিচ্ছিন্ন করছি। একটি জাতি হিসেবে আমাদের এই দ্বিমুখী নীতি বন্ধ করে তাদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া উচিত।’
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন