https://www.prothomalony.com/
17059
north-america
প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ ০৮:০৪
বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের ইতিহাসে কেবল কয়েকজন ব্যক্তিত্ব আছেন যাঁরা কেবল একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেননি, বরং গোটা শিল্পের চিন্তার ধারাই পাল্টে দিয়েছেন। টেড টার্নার সেই বিরল প্রতিভাদের একজন। তাঁর হাত ধরেই সংবাদ জগতে এসেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন—চব্বিশ ঘণ্টার সংবাদপ্রবাহ। আজকের দর্শকের কাছে যা স্বাভাবিক ও নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা, একসময় তা ছিল প্রায় অকল্পনীয়, প্রায় বৈপ্লবিক।
টেড টার্নারের কৃতিত্ব সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই আমলে, যখন সংবাদ ছিল নির্দিষ্ট সময়ের বন্দী। সন্ধ্যার নির্দিষ্ট বুলেটিনে মানুষ অপেক্ষা করত খবরের জন্য। তথ্য ছিল নিয়ন্ত্রিত, সময়সাপেক্ষ, এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই একমুখী। সেই প্রচলিত কাঠামোকে প্রথম চ্যালেঞ্জ করেছিলেন টার্নার। তাঁর প্রশ্ন ছিল সরল কিন্তু গভীর—সংবাদ কেন কেবল নির্দিষ্ট মুহূর্তেই সীমাবদ্ধ থাকবে? কেন মানুষ যেকোনো সময় জানতে পারবে না বিশ্বে কী ঘটছে?
এই একটি প্রশ্নের উত্তরই হয়ে উঠেছে সিএনএন—বিশ্বের প্রথম ২৪ ঘণ্টার সংবাদ চ্যানেল। ১৯৮০ সালের ১ জুন যাত্রা শুরু করেছিল এই নেটওয়ার্ক। সেদিন টেড টার্নার শুধু একটি টেলিভিশন চ্যানেল চালু করেননি; তিনি সংবাদকে একধরনের ‘সময়ের গণ্ডি’ থেকে চিরতরে মুক্ত করেছিলেন। সংবাদ এখন আর অতীতের প্রতিবেদন নয়—এটি বর্তমানের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।
সিএনএনের প্রকান্তি বিশ্ব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করে ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়। প্রথমবারের মতো বিশ্ব দেখল—যুদ্ধক্ষেত্রের সরাসরি সম্প্রচার। সাধারণ মানুষ বসে বসে প্রত্যক্ষ করল ইতিহাসের নির্মম মুহূর্তগুলো, ঘটনার মধ্যেই। এটি ছিল শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়; এর চেয়েও বড় বিষয় ছিল মানসিকতার আমূল বিপর্যয়। সংবাদ এখন আর ‘গতকালের খবর’ নয়—এটি ‘এখনই ঘটছে’।
এখানেই টেড টার্নারের প্রকৃত কৃতিত্ব নিহিত। তিনি সংবাদকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, অজ্ঞতা মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় শত্রু। আর তথ্যের অবাধ, নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহই পারে সেই অজ্ঞতা দূর করতে। এই দর্শন আজকের তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। আমরা যত বেশি সংযুক্ত, তত বেশি তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। সেই নির্ভরতার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন টেড টার্নার।
তাঁর জীবন ছিল নাটকীয়, দোলাচলে ভরা, কখনো বিতর্কিত, কখনো অনুপ্রেরণামূলক। একটি বিলবোর্ড ব্যবসা থেকে শুরু করে বৈশ্বিক মিডিয়া সাম্রাজ্য গড়ে তোলার এই অভিযান নিঃসন্দেহে ব্যবসায়িক সাফল্যের গল্প। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা—এটি দৃষ্টিভঙ্গির জয়। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, প্রচলিত চিন্তার বাইরে গিয়ে সাহস করে এগোলে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়া সম্ভব।
তবে টার্নারের উত্তরাধিকার কেবল সিএনএন বা টেলিভিশন নেটওয়ার্কের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়। তিনি সংবাদমাধ্যমকে একটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাঁর মতে, সংবাদ কেবল ব্যবসা নয়—এটি জনসচেতনতা সৃষ্টির শক্তিশালী হাতিয়ার, একটি অপরিহার্য সামাজিক দায়িত্ব।
আজকের পৃথিবী জটিল এক বাস্তবতার মুখোমুখি। ‘ফেক নিউজ’, গুজব, বিভ্রান্তি ও তথ্যের অপব্যবহার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে গণমাধ্যমের সামনে। এই প্রেক্ষাপটে টেড টার্নারের দর্শন নতুন করে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। চব্বিশ ঘণ্টার সংবাদপ্রবাহ যেমন তথ্যের প্রবেশাধিকার বাড়িয়েছে, তেমনি এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দায়িত্বের কঠিন প্রশ্ন। তথ্যের গতির সঙ্গে নৈতিকতার ভারসাম্য রক্ষা করাই আজকের সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
টেড টার্নার আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন—গণমাধ্যম যত শক্তিশালী হবে, তার দায়িত্ব তত বেশি হবে। তাঁর দেখানো পথ ধরে আজ অসংখ্য সংবাদমাত্রা এগোচ্ছে। কিন্তু সেই পথের মূল ভিত্তি—নিষ্ঠা, সত্যনিষ্ঠা ও দায়বদ্ধতা—অটুট রাখা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে যেমন ছিল সাফল্যের উচ্ছ্বাস, তেমনি ছিল পতনের গ্লানি। সম্পর্ক হারিয়েছেন, সম্পদ হারিয়েছেন, একসময় ব্যবসার নিয়ন্ত্রণও হারিয়েছেন। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন রয়ে গেছে অম্লান—সংবাদমাধ্যমে এক চিরস্থায়ী বিপ্লব।
ইতিহাস টেড টার্নারকে শুধু একজন উদ্যোক্তা বা ধনী ব্যবসায়ী হিসেবে স্মরণ করবে না। তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হবে একজন পথপ্রদর্শক, একজন দূরদর্শী বিপ্লবী হিসেবে—যিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন, অবাধ তথ্যপ্রবাহ সত্যিই পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে। সংবাদমাধ্যমের গবেষক, শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের জন্য তাঁর জীবন ও কর্ম এক অনিবার্য, চিরপ্রাসঙ্গিক অধ্যায় হয়ে থাকবে।
আজ যদি তাঁর প্রয়াণের খবর সত্যি হয়—তবে তা শুধু একজন মানুষের বিদায় নয়; এটি একটি সমৃদ্ধিশালী যুগের অবসানের প্রতীক। আর যদি সেই খবর ভুলও হয়, তবুও সত্যি এই যে, তাঁর অবদান ইতিমধ্যেই ইতিহাসের অমর হয়ে গেছে।
টেড টার্নার এখন হয়তো আমাদের মাঝে নেই—থাকুন বা না থাকুন, তাঁর প্রভাব অটুট রয়ে গেছে। প্রতিটি ব্রেকিং নিউজের ঝলকানি, প্রতিটি লাইভ সম্প্রচারের উত্তেজনা, প্রতিটি ২৪ ঘণ্টার সংবাদচক্রের পুনরাবৃত্তিতে—সবকিছুর গভীরে বয়ে যায় তাঁর স্বপ্নের প্রতিধ্বনি।
সংবাদমাধ্যমের ইতিহাস যতদিন লেখা হবে, ততদিন টেড টার্নারের নাম স্বর্ণাক্ষরে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। কারণ তিনি শুধু সংবাদ প্রচারের কৌশল বদলাননি; তিনি বদলে দিয়েছিলেন সংবাদ বোঝার উপায়টিকেই। এবং সেই পরিবর্তন চিরস্থায়ী।
তাঁর বিদায়ে আমরা যেমন শ্রদ্ধা জানাই, তেমনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই—তথ্যের অধিকার ও দায়িত্বের এই সেতু আমরা যেন আরও সুদৃঢ় করে তুলি। কারণ টেড টার্নার যা শুরু করেছিলেন, তা শেষ হয়নি; বরং প্রতিনিয়ত নতুন রূপ নিচ্ছে। এবং সেই পথ চলায় তাঁর দর্শন আমাদের চিরপথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন