https://www.prothomalony.com/
16961
north-america
প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ ০১:০৬
প্রবাসে বাংলা নববর্ষ উদযাপন শুধু একটি উৎসব নয়; এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে পুনঃসংযোগের এক শক্তিশালী মাধ্যম। কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের নানা দেশে এই উৎসবের বিস্তার প্রমাণ করে—নতুন প্রজন্মকে বাঙালি ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত রাখতে এর গুরুত্ব কতটা অপরিসীম। একইসঙ্গে এটি বাংলাদেশ-ভারতের সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে এবং উত্তর আমেরিকায় বাংলা সংস্কৃতির উপস্থিতিকে সমৃদ্ধ করে।
তবে চৈত্র সংক্রান্তির মতো কিছু আচারকে সর্বজনীন বাঙালি সংস্কৃতি হিসেবে উপস্থাপন নিয়ে মাঝে মাঝে আলোচনা-সমালোচনাও দেখা যায়। বাস্তবতায় সংস্কৃতি ধর্ম ও যাপিত জীবনের প্রতিফলন হলেও, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পহেলা বৈশাখই একমাত্র সুপ্রতিষ্ঠিত সর্বজনীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উৎসব হিসেবে বিবেচিত।
পহেলা বৈশাখ এমন একটি দিন, যেখানে ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, লিঙ্গ বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সবাই অংশগ্রহণ করতে পারে। এর মূল বার্তা হলো পারস্পরিক সম্মান, বৈচিত্র্যের উদযাপন এবং সামাজিক সম্প্রীতি গড়ে তোলা। এই উৎসবে সবার জন্য উন্মুক্ত অংশগ্রহণ, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি এবং সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।

বিশ্বের বহুসাংস্কৃতিক সমাজেও এমন অন্তর্ভুক্তিমূলক উৎসবের দৃষ্টান্ত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস এখন জাতীয় পরিচয়ের পাশাপাশি সর্বজনীন আনন্দোৎসবে পরিণত হয়েছে। থ্যাংকসগিভিং ধর্মীয় সীমা ছাড়িয়ে পারিবারিক ও সামাজিক মিলনের প্রতীক। কানাডায় কানাডা ডে বহুসাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে উদযাপিত হয়, আর কারিবানা ও টরন্টো প্রাইড ফেস্টিভ্যাল বৈচিত্র্য ও সমতার বার্তা বহন করে। উইন্টারলিউড উৎসবও শীতকালীন আনন্দকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে একত্র করে।
বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ দীর্ঘদিন ধরেই অসাম্প্রদায়িক ও সর্বজনীন উৎসব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। মুঘল সম্রাট আকবরের প্রবর্তিত বঙ্গাব্দের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে শুরু করে আজকের রমনা বটমূলে ছায়ানটের সংগীতানুষ্ঠান, মঙ্গল শোভাযাত্রা, বৈশাখী মেলা ও লোকজ আয়োজন—সব মিলিয়ে এটি জাতীয় ঐক্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরাতেও পহেলা বৈশাখ সমান উৎসাহে পালিত হয়। নতুন পোশাক, হালখাতা, মন্দিরে প্রার্থনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি সেখানে এক আনন্দঘন সামাজিক উৎসবে রূপ নেয়, যেখানে সব সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়।
সম্প্রতি কানাডার আলবার্টা ও যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের ম্যাকন শহরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আয়োজনে বাংলা নববর্ষ উদযাপন নতুন মাত্রা পেয়েছে। শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ, লোকজ সংস্কৃতি, খাবার ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা প্রবাসে এক টুকরো বাংলাদেশকে জীবন্ত করে তুলেছে।
তবে প্রবাসে বাংলা নববর্ষকে সত্যিকারের সর্বজনীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উৎসবে রূপ দিতে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সাম্প্রদায়িকতা ও ভুল ধারণা মোকাবিলায় সচেতনতা বৃদ্ধি, সংলাপ এবং অংশগ্রহণমূলক উদ্যোগ জরুরি। কমিউনিটি সংগঠনগুলোর মাধ্যমে নিরাপদ ও উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম তৈরি, তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করা এবং গণমাধ্যমে ইতিবাচক প্রচারণা এই সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রবাসে বাংলা নববর্ষকে একটি সত্যিকারের সম্প্রীতির উৎসবে রূপ দেওয়া সম্ভব।
লেখক
দেলোয়ার
জাহিদ,
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মুক্তিযোদ্ধা,
সভাপতি, বাংলাদেশ নর্থ আমেরিকান জার্নালিস্ট নেটওয়ার্ক, এডমন্টন, আলবার্টা, কানাডা
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন