https://www.prothomalony.com/
16411
north-america
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার জের ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যে বিস্তৃত সংঘাতের সূচনা হয়েছে, তা কেবল একটি আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনা নয়। এটি এমন এক সংকট, যার প্রতিধ্বনি বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। ইতিহাস আমাদের শেখায়—বড় যুদ্ধের পর বিশ্ব আর আগের মতো থাকে না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মানচিত্র বদলেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে উঠেছে নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানে আবারও বদলেছে শক্তির ভারসাম্য। তাহলে এবারের ইরান যুদ্ধ কি তেমন কোনো মোড় পরিবর্তনের সূচনা?
প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি নতুন করে বিন্যস্ত হতে পারে। ইরান দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনে তার প্রভাব সুস্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা যদি ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে দুর্বল করে, তাহলে সেই প্রভাববলয়েও পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে ইরান যদি পাল্টা জবাব দিয়ে সংঘাত দীর্ঘায়িত করে, তবে পুরো অঞ্চল জুড়ে প্রক্সি যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়বে। উপসাগরীয় দেশগুলোও তখন নতুন নিরাপত্তা সমীকরণে নিজেদের অবস্থান পুনর্নির্ধারণে বাধ্য হবে।
দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে প্রধান নিরাপত্তা শক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন ও রাশিয়ার উপস্থিতি বেড়েছে। ইরান যদি আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও বেশি সমর্থন খোঁজে, তাহলে এই সংঘাত বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতাকে তীব্র করতে পারে। ফলে আঞ্চলিক যুদ্ধ ধীরে ধীরে বৃহত্তর কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে উঠতে পারে।
তৃতীয়ত, জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়া দিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য এখনো বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে তেলের দাম বাড়বে, সরবরাহ ব্যাহত হবে, মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাবে। উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। খাদ্য ও জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এটি নতুন অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোও এর বাইরে নয়।
চতুর্থত, আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। যদি আলোচনার পথ বন্ধ হয়ে সামরিক সমাধানই প্রধান উপায় হয়ে দাঁড়ায়, তবে জাতিসংঘভিত্তিক বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় বাড়বে। পারমাণবিক ইস্যুতে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ভেঙে গেলে ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশও শক্তি প্রদর্শনের পথে হাঁটতে পারে। এতে বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিবেশ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে।
পঞ্চমত, প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা সামনে আসছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নজরদারি, ড্রোন ও স্যাটেলাইটভিত্তিক হামলা এখন যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু। ইরান সংঘাতে যদি এসব প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার ঘটে, তবে তা ভবিষ্যৎ যুদ্ধের ধরন নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে থাকবে। যুদ্ধক্ষেত্র আর শুধু সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তথ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ—সবই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
তবে প্রশ্ন হলো—এই যুদ্ধ কি সত্যিই বিশ্বব্যবস্থাকে মৌলিকভাবে পাল্টে দেবে? ইতিহাস বলে, সব যুদ্ধ সমান প্রভাব ফেলে না। কিছু সংঘাত আঞ্চলিক সীমারেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। আবার কিছু সংঘাত বৃহত্তর পরিবর্তনের জন্ম দেয়। এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা কঠিন, ইরান যুদ্ধ কোন পথে যাবে। এটি নির্ভর করছে সংঘাতের স্থায়িত্ব, জড়িত শক্তিগুলোর ভূমিকা এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সাফল্যের ওপর।
একটি বিষয় স্পষ্ট—যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তত বেশি দেশ এতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়বে। মানবিক সংকটও বাড়বে। শরণার্থী স্রোত, অবকাঠামো ধ্বংস, সামাজিক অস্থিরতা—এসবই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে। যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন প্রক্রিয়াও সহজ হবে না।
বিশ্ব বাস্তবতা পাল্টাবে কি না, তার উত্তর সময় দেবে। কিন্তু এই সংঘাত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা এখন নতুন স্বাভাবিক। শক্তির রাজনীতি আবারও সামনে এসেছে। কূটনীতির জায়গা সংকুচিত হলে বিশ্ব আরও বিভক্ত হবে। আর বিভক্ত বিশ্বে শান্তি টেকসই হয় না।
অতএব, এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো উত্তেজনা কমানো, সংলাপ পুনরায় শুরু করা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে আস্থা পুনর্গঠন। অন্যথায়, এই যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, সমগ্র বিশ্বের ভবিষ্যৎকেই নতুন এক অনিশ্চিত অধ্যায়ে ঠেলে দিতে পারে।
ইরান যুদ্ধ হয়তো আগামী দিনের বিশ্বরাজনীতির মোড় ঘোরানোর সূচনা। আবার এটিও হতে পারে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক সংকট, যার প্রভাব ধীরে ধীরে ছড়াবে। তবে একটি সত্য অস্বীকার করা যায় না—যুদ্ধের পর বিশ্ব আর আগের মতো থাকে না। প্রশ্ন শুধু, পরিবর্তনটি কত গভীর এবং কত স্থায়ী হবে।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন