https://www.prothomalony.com/

15865

north-america

উত্তর আমেরিকা

টুইন সিটিসে তোলপাড়: ২ হাজার ফেডারেল এজেন্টের হানা ও ত্রাসের পরিবেশ

প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারী ২০২৬ ১২:০৯

ডেমোক্র্যাট শাসিত মিনেসোটায় সামাজিক সেবা খাতে বিশাল জালিয়াতি কেলেঙ্কারি ও অবৈধ অভিবাসন দমনে ইতিহাসের অন্যতম বড় অভিযান শুরু করেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। মাত্র এক মাসের এই ‘সার্জ অপারেশন’ এ টুইন সিটিজ এলাকায় প্রায় ২ হাজার ফেডারেল এজেন্ট মোতায়েন করা হয়েছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোনো একটি মার্কিন শহরে ফেডারেল বাহিনীর বিরল ও নজিরবিহীন সমাবেশ। শান্ত টুইন সিটিজ এখন ফেডারেল অভিযানের কারণে উত্তেজনায় কাঁপছে।

একাধিক আইনপ্রয়োগকারী কর্মকর্তা সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন, এই ৩০ দিনের মাসব্যাপী মোতায়েনে মোট ফেডারেল উপস্থিতি আরও বাড়তে পারে। প্রায় ৬০০ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনস এজেন্ট এবং দেড় হাজার পর্যন্ত আইসের এনফোর্সমেন্ট অ্যান্ড রিমুভাল অপারেশনস অফিসার পর্যায়ক্রমে মিনিয়াপোলিসে কাজ করবেন, সঙ্গে স্পেশাল রেসপন্স টিমসহ কৌশলগত ইউনিট। একজন প্রাক্তন কর্মকর্তা বলেছেন, এটি ‘অভূতপূর্ব সম্পদ বিনিয়োগ’ এবং মিনিয়াপোলিসকে ‘নতুন শিকাগো’ বানাচ্ছে।

এই নজিরবিহীন অভিযানের পেছনে প্রশাসন দুটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে: জালিয়াতি রোধ ও ডিপোর্টেশন। তদন্তকারীদের মতে, মিনেসোটার বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি থেকে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার জালিয়াতি করা হয়ে থাকতে পারে। অভিযোগ উঠেছে, ‘ফ্রড ট্যুরিস্ট’ বা ভিন্ন স্টেট থেকে আসা জালিয়াতি চক্রের সদস্যরা এখানে এসে ‘ফিডিং আওয়ার ফিউচার’-এর মতো শিশু পুষ্টি, আবাসন ও মেডিকেড কর্মসূচির অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে।

একই সঙ্গে, এই বিশাল বাহিনীর অন্যতম প্রধান কাজ হলো পূর্বে ‘ডিপোর্টেশন অর্ডার’ পাওয়া অভিবাসীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দেশান্তর নিশ্চিত করা। বিশেষ করে সোমালি-আমেরিকান কমিউনিটিকে এই অভিযানের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত মাসেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সোমালিয়া থেকে আসা ব্যক্তিদের ‘আবর্জনা’ বলে আখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, তারা ‘দেশের উন্নয়নে কোনো অবদান রাখে না।’

জালিয়াতি দমনের দোহাই এবং অভিবাসনবিরোধী এই কঠোর অবস্থান, সব মিলিয়ে টুইন সিটিসে এখন এক চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। ট্রাম্প প্রশাসন মিনেসোটাকে ‘জালিয়াতি ও মানি লন্ডারিংয়ের কেন্দ্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

ডিএইচএসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই অভিযানের অংশ হিসেবে প্রায় ৭০০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইস। ২০২১ সাল থেকে মিনেসোটাভিত্তিক এসব মামলায় ৯০ জনের বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে এবং ৬০টির বেশি মামলায় দণ্ডাদেশ হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, পুষ্টি, আবাসন ও শিশু পরিচর্যা সহায়তাসহ একাধিক ফেডারেল কর্মসূচিতে জালিয়াতি হয়েছে, যার সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। তবে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের অভিযোগ, এই অভিযানে সাধারণ মার্কিন নাগরিকরাও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

এই ক্র্যাকডাউনকে কেন্দ্র করে ফেডারেল সরকার এবং মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালজের মধ্যে দ্বন্দ্ব তুঙ্গে। গভর্নর একে ‘রাজনৈতিক নাটক’ বলে অভিহিত করেছেন।

সমালোচকেরা তাকে বছরের পর বছর ধরে দুর্নীতি ও জালিয়াতি ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য দায়ী করলেও, ওয়ালজ নিজেকে রক্ষা করে বলেছেন, তারা অডিট, সংস্কার ও নতুন ফ্রড প্রিভেনশন কাউন্সিল গঠনসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছেন; আর ট্রাম্প প্রশাসন এই সংকটকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।

ইতিমধ্যে গভর্নর ঘোষণা করেছেন, তিনি আর তৃতীয় মেয়াদে (২০২৪ সালের ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী) লড়বেন না। অন্যদিকে, মিনিয়াপোলিসের মেয়র জ্যাকব ফ্রে স্পষ্ট জানিয়েছেন, স্থানীয় পুলিশ এই অভিযানে ফেডারেল এজেন্টদের সহযোগিতা করছে না।

ফেডারেল এজেন্টদের সাঁড়াশি অভিযানের মাঝেই মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের জন্য আরও বড় ধাক্কা এসেছে ওয়াশিংটন থেকে। জালিয়াতি ও দুর্নীতির আশঙ্কায় মিনেসোটার শিশু যত্ন খাতের জন্য বরাদ্দ ১৮৫ মিলিয়ন ডলার (১৮.৫ কোটি ডলার) ফেডারেল পেমেন্ট স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগ।

মিনিয়াপোলিসের বড় সোমালি-আমেরিকান কমিউনিটির মধ্যে এই অভিযানের কারণে গ্রেপ্তার ও ডিপোর্টেশনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন অভিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় ইতিমধ্যে বিক্ষোভ, মুখোমুখি অবস্থান ও উত্তেজনার খবর মিলছে। অভিবাসী এলাকাগুলোতে মানুষ ভয়ে কাজে যেতে বা বাজার করতেও বের হতে পারছেন না। একদিকে জালিয়াতি দমনের নামে সরকারি স্বচ্ছতা আনার দাবি, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা; সব মিলিয়ে মিনিয়াপোলিস এখন এক উত্তাল সময় পার করছে।

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন