https://www.prothomalony.com/

15596

north-america

উত্তর আমেরিকা

গাজার চিঠিঃ গভীর দুশ্চিন্তা নিয়ে গাজা ছাড়ছি

প্রকাশ: ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৪:০০

গাজার ৭০ শতাংশ ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে। মানুষ তাদের নিজের জমিতে বাঁচতে চায়, তাই বাড়ি ধ্বংস হলেও তারা অনেক সময় সেই ভাঙা ঘরের কাছেই একটি ছোট তাঁবু খাটিয়ে থাকে।

আজ সকালে যখন আমরা খানইউনিস ছেড়ে বের হলাম, আকাশ ছিল ধূসর আর বৃষ্টি ঝরছিল। সমাবেশস্থলে পৌঁছাতে স্বাভাবিক সময়ের দ্বিগুণ লেগেছে। বাস যখন তাঁবুর সারির পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, আমরা দেখেছি সেসব তাঁবু বৃষ্টির পানিতে ভিজে ডুবে গেছে, মানুষ ভিজে স্যাঁতসেঁতে অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। গত রাতে আমরা একটি ভবনের ভেতর ঘুমিয়েছি, কিন্তু এত ঠান্ডা ছিল যে যতই জামা পরে থাকি, গা গরম হচ্ছিল না। জানালার বাইরে হাসপাতালের সামনে থাকা তাঁবুগুলো দেখেই কেঁদে ফেলেছিলাম—আমি যে ঠান্ডা সহ্য করেছি তার তুলনায় তাঁরা নিশ্চয়ই আরও ভয়াবহ অবস্থায় আছে।
এখন ডব্লিউএইচও শিশু ও নবজাতকদের কীভাবে গরম রাখা যায় এবং হাইপোথারমিয়ার লক্ষণ কী—এসব নিয়ে লিফলেট বিতরণ করছে। দূষিত পানি থেকে ডায়রিয়াজনিত অসুখ এবং শ্বাসতন্ত্রের রোগ ছড়িয়ে পড়ায় আবারও সবচেয়ে দুর্বলদেরই বেশি কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে। শিশুরা পাতলা জামা আর স্যান্ডেলে ঠান্ডায় হাঁটছে। গত কয়েক দিনের আবহাওয়ার নাটকীয় পরিবর্তনের সঙ্গে শীত নেমে আসতেই গভীর দুশ্চিন্তা নিয়ে আমি গাজা ছাড়ছি।

গাজার ভেতর দিয়ে বাসযাত্রা ছিল সম্পূর্ণ নীরব—৫০ জনে ভরা একটি বাস, কিন্তু একটি কথাও নয়। সবাই একই ভার অনুভব করছিল। এই সম্মিলিত দুঃখ আর বেদনার ভাগাভাগিতে এক ধরনের নীরব সান্ত্বনা ছিল।

 সীমান্ত পারাপার আগের মতোই নিষ্ঠুর ছিল। বাস আমাদের সীমান্ত থেকে প্রায় অর্ধ মাইল দূরে নামিয়ে দেয়, আর বৃষ্টির মধ্যে হেঁটে যেতে হয়—যেমনটা আসার সময়ও হয়েছিল। আমাদের ব্যাগগুলো ছিঁড়ে খুলে রাখা হয়, আবার সেগুলো গুছিয়ে নিতে হয়েছে। মানুষকে সাহায্য করতে চাওয়ার অপরাধে যে অমানবিক আচরণের মুখোমুখি হয়েছি, তার রাগ নীরবে চেপে ধরে আমরা এগিয়ে চলেছি।

আম্মানের কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আমার মনে গরম পানি দিয়ে গোসল আর একবেলার গরম খাবারের কথা ভেসে উঠছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে যেগুলোর দেখা পাইনি। আবার সঙ্গেসঙ্গে অপরাধবোধেও ভুগছি—এমন আরামের কথা ভাবতে পারার জন্যই। গাজা থেকে বের হওয়ার প্রক্রিয়া সবসময় কঠিন। টানটান স্নায়ুচাপ ধীরে ধীরে ঢিলে হতে হতে পিঠ আর ঘাড়ে ব্যথা নামছে। ড্রোন, গুলির শব্দ অথবা হঠাৎ বিমান হামলার অস্থিরতা থেকে বেরিয়ে এসে স্নায়ুতন্ত্র একটু একটু করে শান্ত হচ্ছে। আর বাতাসের গন্ধ—যা এতদিন ধুলো, ধোঁয়া আর পোড়ার গন্ধে ভরা ছিল—এখন আবার স্বাভাবিক লাগছে।

আমার সাথে থাকার জন্য আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ। আগের সফরের মতোই এবারও এই লেখাগুলো আসলে আমার নিজের জন্য—মনের ভেতরের ভাবনা-অনুভূতিগুলোকে কাগজে নামানোর চেষ্টা। তবুও এটা জানা ছিল যে আপনারা সবাই প্রতিটি মুহূর্তে আমার সাথে ছিলেন—এটাই আমাকে শক্তি দিয়েছে।
শিগগিরই দেখা হবে।

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন