https://www.prothomalony.com/

15588

north-america

উত্তর আমেরিকা

গাজার চিঠিঃ অভিজ্ঞতা আমার সত্তাকে বদলে দিয়েছে

প্রকাশ: ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ ০১:০৮

সকালজুড়ে শুনেছি মানুষের তাঁবুতে পানি ঢোকার গল্প। আজ ছাত্রাবাস থেকে নিবিড় পরিচর্যা ও জরুরি বিভাগ পর্যন্ত হাঁটার পথজুড়ে নর্দমার তীব্র গন্ধ। বৃষ্টির পানি রাস্তায় জমে আছে, নোংরা পানি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে—নিশ্চয়ই এই পানি তাঁবুগুলোর ভেতরেও ঢুকে পড়ে। ডা. সামাহের জানালেন, যেই ভাঙাচোরা বাড়িতে তিনি থাকেন, সেখানে সারারাত ছাদ দিয়ে পানি পড়েছে। তিনি আর তাঁর সন্তানরা রাতভর নানা জায়গায় পাত্র রেখে পানি ধরে, আর মেঝেতে পড়া পানি কাপড় দিয়ে মুছে সামলেছেন।

আব্দুলকরিম, যে সংস্থার সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছেন, হাসতে হাসতে বললেন—তাঁর পরিবার নাকি যেন টাইটানিকের ভিতর ঘুম থেকে উঠেছে… আর তিনি নিজে নাকি পুরোপুরি পানিতে ভিজে যাওয়া টেরই পাননি, ঘুমিয়েই কাটিয়েছেন!

শিফায় আবারও কবর উন্মোচন চলছে—স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, এগুলো গণকবর; একেকটি গর্তে একাধিক দেহ। উঠোন জুড়ে সারি সারি দেহব্যাগ, আর শীতল বাতাসে মৃত্যুর গন্ধ। মানুষ জড়ো হচ্ছে দোয়া পড়তে—যাদের তুলে আনা হয়েছে তাদের কাউকে চিনুক বা না-চিনুক। আমিও যোগ দিলাম, আর কিছু করার ছিল না, শুধু মনে হলো অন্তত শ্রদ্ধা জানাতে চাই।

দু’আর আজ জ্বর। আনুষ্ঠানিকভাবে আমি আর তার চিকিৎসক নই, কিন্তু তবু মনে এক ধরনের দায়বদ্ধতা। তার পেট ব্যথা, কয়েকদিন ধরে বমি করছে। সার্জারি দলের লোকজনকে খুঁজে বের করলাম, সিটি স্ক্যান করতে এবং ওকে একটু বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে বললাম। সবাই ক্লান্ত, অবসাদগ্রস্ত। আর অসুস্থ রোগী সামলাতে কারও মন চায় না; তারা বাঁচতে চায়, জীবনের স্বাদ পেতে চায়। সেটা আমি বুঝতে পারি। কিন্তু আমরা এখানে নতুন, তাই চেষ্টা করি আলতোভাবে নজরদারি আর সহায়তা দিতে। দু’আর ক্ষুদ্রান্ত্রে বাধা ধরা পড়েছে, নতুনভাবে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। অপুষ্ট শরীরটি এসব সইবে কি না ভেবে বুক ভেঙে যায়। বিদায় নিতে গিয়ে দু’আ যেভাবে আমাকে জড়িয়ে ধরল, মনে হলো সে-ও বুঝতে পারছে সংকটটা—যে অনুভূতি তার কখনোই অনুভব করার কথা নয়।

দুপুরের দিকে শিফা ছেড়ে বেরোলাম। আগের মতোই অপরাধবোধ, তারপর দীর্ঘশ্বাস—আরও কিছু করতে পারলাম না, কখনোই পারি না, সময় সবসময়ই কম।

ডা. সামাহের অনুরোধ করেন, তার সন্তানদের যেন আমেরিকায় মেডিকেল প্রশিক্ষণে পাঠানোর উপায় খুঁজে দিই। দু’আ আর তার পরিবার জানায়, বাড়ি ফেরার ভয়, বাজার করার টাকাও নেই। কেউ দোয়া চায়, কেউ বাঁচার পথ চায়, কেউ সাহায্য চায় দেশ ছাড়তে। প্রতিটি মুখ, প্রতিটি কণ্ঠ, প্রতিটি আবেগ ভিতরটা দগদগে করে তোলে। ছোট ছোট সমাধান খুঁজি—যেমন ক্রেডিট কার্ড দিয়ে মুদি সামগ্রীর ভাউচার কেনা যায়, এক মাসের ভাউচার কিনে দিলাম দু’আর পরিবারকে। এতে তারা নিজেরাই পছন্দ করে কিনতে পারে—যা ত্রাণসামগ্রীর তুলনায় অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ। যাদের সঙ্গে কাজ করেছি, সেই ছাত্র বা চিকিৎসকদের জন্য সুপারিশপত্র প্রস্তুত করলাম, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর ইমেইল তৈরি করলাম—যদিও জানি হয়তো ফল নাও হতে পারে। তবু সবার জন্য চেষ্টা করে যাব। চিকিৎসা সরিয়ে নেবার আবেদন জানাতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিচিতদের কাছে যোগাযোগ করলাম। প্রতিটি নতুন নেটওয়ার্ক আমাকে আরও কিছুটা সমর্থন জোগাতে সাহায্য করে।

যুক্তরাজ্য মেড ফিল্ড হাসপাতালেও ঢুঁ দিলাম। বহু পরিচিত মুখ—এক বছর পরেও তারা আমাকে মনে রেখেছে, কথায় কথায় বুঝলাম আমাকে নাকি খুব মিস করে। মাহমুদ, একজন দোভাষী, বলল—ওদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে এখনকার নেতৃত্ব নাকি খুব একটা মনোযোগ দেয় না, আর তারা নাকি খুব মিস করে আমার সকালে পাঁচ সেকেন্ডের শ্বাস-প্রশ্বাস অনুশীলনগুলো। ভেবেছিলাম সবাই মজা করে, কেউ গুরুত্ব দেয় না। অথচ সেটাই নাকি ছিল সবচেয়ে কার্যকর আর স্মরণীয় ব্যাপার। এসব কথাই আমাকে নতুন শক্তি দিল—বুঝলাম, হয়তো সত্যিই কিছুটা হলেও আমরা পার্থক্য তৈরি করতে পেরেছি।

ভারী বৃষ্টি নামতে থাকে আবার, আমরা খান ইউনিসে নাসের হাসপাতালে রাত কাটাতে থামলাম। দেখলাম দক্ষিণে তুলনামূলক বেশি সরঞ্জাম ও কাঠামো, আর গাজা নগর এগোতে পারছে না—এটা ভাবতেই ঠিক সেই মুহূর্তে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে সারাদেশে ফুরিয়ে যাওয়া দ্রব্যের তালিকা আসে। গজ-পট্টির মজুদ প্রায় শেষ।

এখনো সন্ধ্যা খানিক বাকি, কিন্তু মাথা আর মন আজ ভারী হয়ে আছে। সতেরো দিনের টানা কাজ আর প্রশিক্ষণের ক্লান্তি শরীরে জমেছে। ভাবছি, এবার ফিরে গেলে মানসিকভাবে কেমন লাগবে।

প্রতিবারই এখানে এলে নিজের এক টুকরো এ জায়গায় থেকে যায়, আর গাজার এক টুকরো নিয়ে ফিরি। গত দুই বছরের অভিজ্ঞতা আমার সত্তাকে বদলে দিয়েছে—এবার কেমন হয়ে ফিরব, কে জানে। রাতের হাওয়া শীতল, আর বৃষ্টি আজ যেন দিনভর ঝরা কান্নার মতোই অবিরাম পড়ছে, আগামীকালের বিদায়ের প্রস্তুতিতে।

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন