https://www.prothomalony.com/
15579
north-america
আজ সারাদিন বিদ্যুৎ কখনো আছে, কখনো নেই। মনে হচ্ছে গতকালের ভারী বৃষ্টিতে কিছু ক্ষতি হয়েছে। জানুয়ারি আর মার্চ ২০২৪–এর শুরুতে আরও ঘন ঘন অন্ধকারে ডুবে যেতাম—তখন চারপাশে ছিল অবিরাম গুলির শব্দ আর আকাশ থেকে নামা বোমা। এখন ড্রোনের সেই অশুভ ভোঁ ভোঁ শব্দের মাঝখানে যে সামান্য নীরবতা আসে, সেটাও ভয় জাগায়। শত্রুতামূলক তৎপরতা কিছুটা কমেছে—এই অনুভূতিটাই অদ্ভুত; যেন পুরোপুরি নিশ্বাস ফেলা যায় না। নিঃশ্বাস ছাড়তে ছাড়তেই হঠাৎ শ্বাস আটকে যায়, আবার বাতাস টানতে হয়। শ্বাসের পর শ্বাস বুকে জমতে থাকে, বেরোনোর পথ নেই—এক ধরনের চাপ তৈরি হয়, মনে হয় যেকোনো মুহূর্তে ফুসফুস ফেটে যাবে (আমি কথাটা রূপক অর্থেই বলছি; আমি ফুসফুসের ডাক্তার, তাই উপমায় অ্যানাটমি ঢুকে পড়ে)। এটাই এখানে প্রতিদিনের জীবনে ভাসমান ভয়—যা সবাই বহন করে—তার খুব ছোট্ট এক ঝলক।
আইসিইউ–এর ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিস্ট ডা. সামাহের চোখে জল নিয়ে আমার কাছে এসে বলেন, “ইনশাল্লাহ আবার দেখা হবে, আপনি আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছেন।” আমি বলি, “আমিও আশা করি আবার দেখা হবে।” তিনি একটু থামেন। সেই নীরবতায় আমি টের পাই—আমার কথায় ‘ইনশাল্লাহ’ না থাকায় তিনি যেন মনে করছেন, সেই সম্ভাবনাটাই আমরা বন্ধ করে দিলাম। তিনি বলেন, “যদি আমরা বেঁচে থাকি—ইনশাল্লাহ।” এমন কথাই দেখিয়ে দেয়, হাসিমুখের আড়ালে কত গভীর আর স্থায়ী ভয় লুকিয়ে আছে।
আজ ইসরায়েল ঘোষণা করেছে ‘ইয়েলো লাইন’ই হবে ইসরায়েলের নতুন সীমান্ত। এখানে কারও কাছেই এটা আশ্চর্য নয়। তারা খোলাখুলিভাবে স্বীকার করছে—সীমান্তচিহ্ন ধীরে ধীরে এগিয়ে দিচ্ছে, ইয়েলো লাইন প্রসারিত করছে। এর অর্থ, ফিলিস্তিনিদের সেই সব জায়গা থেকেও উৎখাত করা হচ্ছে যেগুলোকে তারা নিরাপদ ভেবেছিল, আবারও জোর করে আগুনের লাইনে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। দুআ আর তার পরিবার ইয়েলো লাইনের কাছেই থাকে। আরও বিস্ফোরণের আশঙ্কায় তারা বাড়ি ফিরতে ভয় পাচ্ছে। মানুষকে আর কতবার তাদের পুরো জীবন গুছিয়ে অনিশ্চিত জায়গায় সরতে বলা যায়—যে জায়গাকে ‘নিরাপদ’ বলা হয়, তারপর সেটাকেই আবার বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া হয়?
দুআ আর তার মা আমাকে তাদের ৯ সদস্যের পরিবারের কথা বলেন—তার ৬ ভাইবোন। তার মা জানান, গত দুই বছরে তাদের এক ছেলেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তারা এটাও বলেন, তাদের কাছে মাংস বা সবজি কেনার মতো টাকাও নেই। যারা যুদ্ধবিরতির চুক্তি কাছ থেকে অনুসরণ করছেন, তারা জানেন—চুক্তির প্রতিটি ধাপেই সেনা পিছু হটানোর কথা ছিল। এখন যদি ইসরায়েল সত্যিই ইয়েলো লাইনকে তাদের সীমান্ত বলে দাবি করে, তবে তা হবে যুদ্ধবিরতির এক মারাত্মক লঙ্ঘন (যেন শিশুদের বোমা মারা আর গুলি করা কম অপরাধ!)। এখানকার মানুষ খবর খুব বেশি দেখতে চান না। খবর যে কী পরিমাণ মানসিক চাপ টেনে আনে, আমি তাদের দোষ দিই না। শেষ পর্যন্ত তাদের অনুভব—যা ঘটবে, তার ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, কোনো পছন্দও নেই। এই পরিস্থিতির নিষ্ঠুরতা আমি কোনো দিনই পুরোপুরি বুঝতে পারব না।
দিনের পরে ডা. সামাহের আবার আইসিইউ–তে ফিরে আসেন—খাবারের উপহার নিয়ে। গতকাল ভালো একটা সময় ধরে তিনি চালভরা আঙুরপাতা রোল করেছেন। ফলাফল নিয়ে তিনি অসম্ভব গর্বিত, আর তার চেয়েও বেশি গর্ব—তিনি সেটা ভাগ করে দিতে পেরেছেন। আমাদের খাওয়ানোর এই উদ্যোগ আসলে গাজাবাসীর স্বাভাবিকতায় ফেরার এক চেষ্টা—এখানকার আতিথেয়তা আর উদারতার সংস্কৃতির তুলনা নেই।
দীর্ঘ এক দিনের ক্লিনিক্যাল ও শিক্ষামূলক কাজ শেষে আমি নিজের ঘরে ফিরি। আজ প্রায় ১০ ঘণ্টা বেডসাইড টিচিং করেছি—ভীষণ ক্লান্তিকর, কিন্তু তৃপ্তিদায়ক। মনে হচ্ছে পরিষেবার মানে কিছু ছোট ছোট উন্নতি হয়েছে, ক্লিনিক্যাল ডকুমেন্টেশন আর সিদ্ধান্ত গ্রহণে রেসিডেন্টদের কাজ আমরা একটু ভালো করতে পেরেছি। এখন আমরা হ্যান্ডওভার ডকুমেন্ট তৈরি করছি, যাতে পরের টিম এসে এই কাজগুলো এগিয়ে নিতে পারে।
রাতটা শেষ হয় নিউইয়র্ক টাইমস–এর সাংবাদিক রনি রাবিনের সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টার ফোনকলে। তিনি জানতে চান সরবরাহ সংকট কীভাবে চিকিৎসা প্রদানে প্রভাব ফেলছে। আমি তাকে দুআর কথা বলি, ইআর–এ সেই হাঁপানি রোগীর কথা বলি—নেবুলাইজার না পেয়ে যিনি কাতরাচ্ছিলেন। বলি, গত ২৪ ঘণ্টায় আসা তিনজন রোগীর কথা—যারা নিয়মিত ওষুধ আর ফলো–আপ না পেয়ে শেষ পর্যন্ত কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে চলে গেছেন। সবারই ছিল নিয়ন্ত্রণহীন, তীব্রভাবে বেড়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগ। এই মৃত্যুগুলো ঠেকানো যেত।
ইন্টারভিউ শেষে আমি ভীষণ ক্লান্ত। এমনভাবে নিজের পর্যবেক্ষণগুলো গুছিয়ে বলা—যাতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোয় আসে—এতে অসম্ভব পরিমাণ শক্তি খরচ হয়। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে, মস্তিষ্ক যেন ডাম্বেলের মতো ওগুলো তুলতে চেষ্টা করছে। শেষে হৃদয়ই রেফারি হয়ে মস্তিষ্ককে বলে—চুপ করো, ঘুমাতে দাও।
আগামীকাল শিফায় শেষ দিন…
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন