https://www.prothomalony.com/
15571
north-america
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনপিআর আমাকে কয়েকটি ভয়েস নোট তৈরি করতে অনুরোধ করেছে, যা ডিসেম্বরের পনেরো তারিখের সপ্তাহে প্রকাশিত হবে। পরে হয়তো আরও দীর্ঘ একটি ধারাবাহিকও হতে পারে। সবশেষে সেগুলো একসঙ্গে করে এখানে শেয়ার করব।
আজ রাতের ভারী বৃষ্টির শব্দ। ভাবছি, যাদের তাঁবু মাটির উঁচুতে নয় বা ঠিকভাবে বাঁধা নয়, তাদের কী হবে।
কে কে কাল ভেজা শরীর নিয়ে, কিংবা ঠান্ডা আর জ্বরে আক্রান্ত হয়ে কাজে আসবে—যারা পুরো রাত কাটিয়েছে শীতের মধ্যে; তাপমাত্রা আজ অনেক নেমে গেছে।
ত্রাণ আর সহায়তা কোথায়?
এখানে নীরবতার শব্দ কেন সব বোমার আওয়াজের চেয়েও বেশি কানে বাজে?
ভোরে জরুরি বিভাগে রাউন্ডে যাওয়ার সময় দেখি কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্স আর কমলা রঙের জ্যাকেট পরা কর্মীরা অস্থায়ী কবরস্থানে মাটি খুঁড়ছে। কয়েক ঘণ্টা পর জরুরি বিভাগ থেকে ফেরার পথে দেখি মাটির ওপর সারি সারি লাশের ব্যাগ। কিছু দেহ খণ্ডিত—ছোট ছোট ব্যাগে রাখা। আর তুলনামূলকভাবে অক্ষত দেহগুলো সেই পরিচিত সাদা ব্যাগে, যেগুলো আমরা প্রতিদিন খবরের পর্দায় দেখি।
একজন বাবা আর তার মেয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে—ওদের ভালোবাসার কেউ কি এই সাদা ব্যাগের ভিড়ে আছে?
একজন নারী ফাঁকা কবরে কাঁদছে—কোন স্মৃতি সে বারবার মনে করছে, ভাবতে থাকি।
এখানে মানুষের সহ্য করা এই ট্রমার কি কোনো শেষ নেই?
দিনগুলো একই সঙ্গে খুব দীর্ঘ আবার খুব ছোট মনে হয়। ভাবতেই অবাক লাগে—প্রায় আড়াই সপ্তাহ কেটে গেছে। আর হাতে আছে মাত্র কয়েকটা দিন, তারপর আমাদের ফিরে যেতে হবে। আমি মরিয়া হয়ে থাকতে চাই। আমরা মাত্র শুরুটা ছুঁয়ে দেখেছি—এখানে কীভাবে সক্ষমতা গড়ে তোলা যায়।
আজ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে বৈঠক হলো। যুদ্ধবিরতির সময় তাদের অগ্রাধিকার—চিকিৎসা শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা। কাজগুলো ভয়াবহ বড় মনে হলেও আমরা ধাপে ধাপে আলোচনা করি—কে কোন জায়গায় কী করতে পারবে। শিফা হাসপাতাল সম্প্রতি আবার চালু হওয়ায় যোগাযোগ ও ব্যবস্থাপনা গুছিয়ে নিতে এখনো অনেক কিছু বাকি।
এরপর আইসিইউতে ফিরে রোগীদের খোঁজ নিই। রেসিডেন্টরা ধীরে ধীরে আমাদের ওপর আস্থা রাখছে। তারা এখন চিকিৎসা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আমাদের সামনে ভাবনাগুলো খুলে বলে—যা আমরা শুরু থেকেই চাইছিলাম। রোগীর গল্প বুঝে, তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তকে যুক্তিসঙ্গত করার এই অভ্যাসটাই সবচেয়ে জরুরি।
তারপর জরুরি বিভাগে গিয়ে রেসিডেন্টদের ভেন্টিলেটর ব্যবস্থাপনা শেখাই। হঠাৎ আরেকটি কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট। বিশ মিনিট কোড ব্লু চালাই। বিশৃঙ্খলার মধ্যেও রেসিডেন্টদের দক্ষতা আগের চেয়ে অনেক ভালো। তবুও রোগী বাঁচেনি।
আমরা সবাই একটু থেমে দাঁড়াই। কেউ একজন আরবি বাক্যটি বলে—“আমরা আল্লাহর এবং আল্লাহর কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে।” এই কথাটি এখানে মানুষের মনে শান্তি আনে। কিন্তু আমার কাছে এটি যেন অন্য বাস্তবতার চিহ্ন—সময়ের আগেই রোগীদের ছেড়ে দিতে হওয়া, শুধুই ভেঙে পড়া একটি ব্যবস্থার কারণে। মানুষের হাতে তৈরি এক ভাঙা ব্যবস্থা।
আজ আবার দুয়াকে দেখতে যাই। তার মন খারাপ আর বিরক্ত। দৌড়ে নিজের ঘর থেকে তাস আর একটি নোটবুক এনে দিই—লেখা বা আঁকার জন্য। সে আবার হাসে। আমার মন হালকা হয়। সে জানে না, প্রতিদিন তার একটু একটু ভালো হওয়াই আমার মানসিক শক্তির উৎস।
কিছু রোগী থাকে, যাদের আমরা কোনোদিন ভুলতে পারি না। তারা আমাদের ভেতরের আগুনটাকে আবার জ্বালিয়ে দেয়—কেন আমরা এই পেশায় এসেছিলাম। একের পর এক শিশু হারানো, আর এমন রোগী হারানো যাদের আমরা বাঁচাতে পারতাম যদি সামর্থ্য থাকত—এটা আমাদের সবাইকে ভেতর থেকে ক্ষয়ে দেয়। তাই কাউকে সুস্থ হতে দেখা মানে সবকিছু।
দিনের কাজ শেষে ডরমিটরিতে ফিরি। আগামী দিনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। তখন আইসিইউতে দায়িত্বে থাকা এক রেসিডেন্টের মেসেজ আসে। সব বড় হাতের অক্ষরে লেখা—আমি ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়ি। স্ক্রাব ক্যাপ পরে দৌড়ে আইসিইউতে যাই। গ্লাভস পরে চারদিকে তাকাই। রিমকে খুঁজি। সে হাসছে। আমার হাত ধরে বলে—সব ঠিক আছে, শুধু আপনাদের সঙ্গে মিষ্টি ভাগ করে নিতে চেয়েছি।
এগুলো ছিল তার আর তার পরিবারের হাতে বানানো ঘরোয়া মিষ্টি। চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। তারা আমাদের আতিথেয়তা দিতে পেরে যে আনন্দ অনুভব করছে—তা ভাষায় বোঝানো যায় না। এই উষ্ণতা অসাধারণ। তারা আমাদের পরিবার হিসেবে গ্রহণ করেছে। আর এই ছোট ছোট মুহূর্তই প্রতিদিনের ভয়াবহতার মধ্যে এক টুকরো স্বাভাবিক জীবনের অনুভূতি এনে দেয়।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন