https://www.prothomalony.com/
15562
north-america
প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৩:০৮
১৪ বছর বয়সী মিষ্টি দুয়া। গ্রিন জোনে হওয়া একটি বিমান হামলায় ছিটকে আসা শ্রাপনেলের আঘাতে তাকে জরুরি বিভাগে আনা হয়। ধাতব টুকরাটি তার পেট চিরে ঢুকে একটি রক্তনালি ও তার প্লীহায় আঘাত করে। তাকে আট ইউনিট রক্ত দিতে হয়। তার অন্ত্রে হওয়া ছিদ্র সেলাই করা হয়, প্লীহা অপসারণ করতে হয় এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে শ্রাপনেলের আরও আঘাত ছিল।
তাকে শ্বাসপ্রশ্বাসের যন্ত্রে রেখে আইসিইউতে পাঠানো হয়। এক দিনের মধ্যেই সে ভেন্টিলেটর থেকে বের হয়ে আসে। তবে তার হৃদস্পন্দন দ্রুত ছিল, অক্সিজেন লাগত এবং সে তীব্র যন্ত্রণায় ভুগছিল। কখনো ব্যথায় চিৎকার করত, কখনো একা পড়ে যাওয়ার ভয়ে কাঁদত, আবার কখনো প্রচণ্ড তৃষ্ণায় পানি চাইত।

প্রতিদিন আমি তার কাছে যেতাম, তার হাত ধরে বসতাম। গুগল ট্রান্সলেট ব্যবহার করে তাকে বোঝাতাম—তার শরীরে কী ঘটছে, বলতাম আমি বিশ্বাস করি সে ঠিক হয়ে উঠবে, যদিও সময় লাগবে। বলতাম—তার সঙ্গে এমন হওয়ায় আমি দুঃখিত। সে কখনো প্রশ্ন করেনি—কেন তার সঙ্গে এমন হলো। তার ভেতরে কোনো রাগ দেখিনি, অথচ তার রাগান্বিত হওয়ার সম্পূর্ণ অধিকার ছিল।
প্রতিদিন সে একটু একটু করে ভালো হতে লাগল। আলট্রাসাউন্ড দিয়ে তার ফুসফুস ও হৃদ্যন্ত্র পরীক্ষা করা হতো, ধীরে ধীরে অগ্রগতি হতো। তার সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল পুষ্টি। আগেই সে অপুষ্টিতে ভুগছিল। ক্ষত না শুকানো এবং পেশি দুর্বল হয়ে পড়া—এই ছিল সবচেয়ে বড় বাধা।
একদিন সে আমাকে অনুরোধ করল—চকলেট দুধ খেতে চায়। দিতে পারিনি। হতাশ হলেও সে হাসল। সেই হাসিতে এমন এক আশার রিজার্ভ দেখলাম, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
একদিন সে আইসিইউ ছাড়ার মতো সুস্থ হলো। আমাকে জিজ্ঞেস করল—আমি কি প্রতিদিন এখানে আসি, এবং সে যখন সার্জিক্যাল ওয়ার্ডে যাবে, তখনও কি আমি তাকে দেখতে আসব। তার এই অনুরোধে আমি গভীরভাবে নাড়া খেলাম। তার অস্ত্রোপচারের সময় যে অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট ছিলেন, তিনি জানালেন—এক্স-রে করার সময় দুয়া বিশেষভাবে আমার কথা বলেছিল এবং বলেছিল যেন তিনি নিশ্চিত করেন আমি তাকে দেখতে যাই।
আজ আমি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাকে সার্জিক্যাল ওয়ার্ডে দেখতে গেছি। সে আমাকে দেখে হাসল। আমরা একসঙ্গে একটি ছবি তুললাম। তার মিষ্টি মায়ের সঙ্গেও দেখা হলো। দুয়া আবার আদেশের সুরে বলল—আগামীকালও যেন আমি আসি। প্রিয় দুয়া, আমি শিফা ছাড়ার আগ পর্যন্ত তোমাকে দেখতে আসব। এরপরও তুমি আমার স্মৃতি আর হৃদয়ে থাকবে।
গাজার সত্যটা হলো—এখানকার কেউই এই জীবন পাওয়ার যোগ্য নয়। এই ক্ষতি, এই ধ্বংসস্তূপ, শীতের মধ্যে ঠান্ডায় কাঁপতে থাকা, আকাশ থেকে আবার কখন ভয় নেমে আসবে সেই অনিশ্চয়তা—কেউই এর যোগ্য নয়। তারা এমন ঘরে থাকার যোগ্য, যেখানে উষ্ণতা ও নিরাপত্তা আছে, যেটা তারা প্রতিদিন একে অন্যকে দিতে চায়।
আজ আইসিইউ রাউন্ডের সময় কেউ একজন তাজা ফালাফেলের একটি ব্যাগ হাতে নিয়ে পাশ দিয়ে হেঁটে গেল। পুরো আইসিইউ দল আমার গভীর নিঃশ্বাস নেওয়ার শব্দ শুনল। এক ঘণ্টার মধ্যেই আইসিইউতে সবার জন্য চলে এলো ফালাফেল, তাজা রুটি, আচার আর কাঁচামরিচ। আইসিইউর অ্যাটেন্ডিং চিকিৎসক ডা. কামাল বললেন—ফালাফেলের গন্ধে আমি কতটা আনন্দ পেয়েছি, সেটা তিনি দেখেছিলেন। শুধু আমাকে খাওয়ানো অভদ্রতা হবে বলে তিনি সবার জন্য কিনে এনেছেন। এটাই গাজা। এটি আর বসবাসযোগ্য কোনো স্থান নয়, কিন্তু এটি একটি সংস্কৃতি—মানুষের উদারতা, হৃদয়ের সম্প্রদায়, যা সংক্রামকের মতো ছড়িয়ে পড়ে। গাজায় আমি জীবনের সবচেয়ে বড় হৃদয়ের মানুষদের দেখেছি।
আজ আরেকটি অ্যাডভান্সড কার্ডিয়াক লাইফ সাপোর্ট প্রশিক্ষণ হলো। আনন্দের সঙ্গে জানালাম—যে রোগীটি গতকাল জরুরি বিভাগে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে পড়েছিল, আজ সে ভালো আছে এবং বড় কোনো জটিলতা ছাড়াই সুস্থ হবে। যে চিকিৎসকেরা তার জীবন বাঁচিয়েছিলেন, তারা কয়েক দিন আগেই এই প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছিলেন।
ধীরে ধীরে… আমরা টিকে থাকি।
আজ মেডগ্লোবালের এক সাবেক সহকর্মী আমাকে দেখতে এসেছিলেন। তিনি একটি ছবি দেখালেন। সামনে একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদ। তার পেছনে উত্তর গাজার চূর্ণ-বিচূর্ণ ধ্বংসস্তূপ। আর আরও দূরে, বাম পাশে, ইসরায়েলের আশদোদের শিল্প এলাকা ও হোটেল। এই ছবির বিকট বাস্তবতা—এই পৃথিবীতে যা কিছু ভুল, তার সবকিছুরই ব্যাখ্যা হয়ে দাঁড়ায়।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন