https://www.prothomalony.com/
15515
north-america
প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৬:৩৩
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এবং একজন শীর্ষ সামরিক কমান্ডারের বিরুদ্ধে একটি গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগটি হলো: গত ২ সেপ্টেম্বর মার্কিন সামরিক বাহিনী ক্যারিবিয়ান সাগরে একটি সন্দেহভাজন মাদকবাহী নৌকায় সামরিক হামলা চালায়।
বিতর্কের কারণ, প্রথম হামলায় নৌকাটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর তাতে বেঁচে থাকা লোকজনকে হত্যা করার জন্য দ্বিতীয়বার হামলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। যুদ্ধ আইন অনুযায়ী, কোনো সংঘাতে আহত বা লড়াই করার ক্ষমতা হারানো বেঁচে থাকা লোকজনকে উদ্ধার করতে হবে এবং তাদের যত্ন নিতে হবে। দ্বিতীয় হামলার নির্দেশ এই আন্তর্জাতিক যুদ্ধ আইন লঙ্ঘন করেছে। হোয়াইট হাউস যদিও দ্বিতীয় হামলার নির্দেশ দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে। যার ফলে প্রাথমিক হামলায় বেঁচে থাকা ব্যক্তিরা নিহত হন, তবে প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এই অভিযানকে বৈধ বলে দাবি করেছেন এবং তিনি এর পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন।
ডেমোক্র্যাটরা মনে করছেন, এই ঘটনা যুদ্ধাপরাধের ইঙ্গিত দিতে পারে, এবং সেনেটের একটি কমিটি এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে। অন্যদিকে রিপাবলিকান চেয়ারম্যান সেনেটর রজার উইকার সাংবাদিকদের বলেছেন, “সেনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটি তদন্ত পরিচালনা করবে এবং প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করবে।”
এই আইন লঙ্ঘনজনিত হত্যা নিয়ে আইনপ্রণেতাদের কাছে একটি বড় প্রশ্ন হলো, হেগসেথের প্রাথমিক “এক্সিকিউট অর্ডার” ঠিক কী নির্দেশ ছিল এবং সেটি যুক্তিসঙ্গত করতে কোন গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করা হয়েছিল।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের সূত্র অনুযায়ী, হেগসেথ সামরিক বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন নৌকার ১১ জন যাত্রীর কাউকেই জীবিত থাকতে দেওয়া না হয়। প্রাথমিক হামলার পর যখন দুজন লোক ধ্বংসাবশেষ আঁকড়ে বেঁচে ছিলেন, তখন জয়েন্ট স্পেশাল অপারেশনস কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাডলি হেগসেথের প্রাথমিক নির্দেশ (“সবাইকে হত্যা”) পালন করতে দ্বিতীয় হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন।
তবে হেগসেথ এবং তার প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল এই রিপোর্টকে মিথ্যা ও “ফেক নিউজ ন্যারেটিভ” বলে অভিহিত করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে তিনি “সব জীবিতকে হত্যা করো”—এ ধরনের কোনো নির্দেশ দেননি।
অন্যদিকে পেন্টাগন হেগসেথের প্রাথমিক নির্দেশে কী ছিল, তা বলতে অস্বীকার করেছে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট দ্বিতীয় হামলাটি ঘটার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও জীবিতদের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে, তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে অ্যাডমিরাল ব্র্যাডলি এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন।
দ্বিতীয় প্রশ্নটি আসে অ্যাডমিরাল ব্র্যাডলিকে নিয়ে, যিনি একজন সাবেক নেভি সিল, অভিজ্ঞ এবং জয়েন্ট স্পেশাল অপারেশনস কমান্ডের প্রধান—সাধারণত আইন লঙ্ঘন না করার জন্য পরিচিত—তিনি কেন বেঁচে যাওয়া লোকদের দেখার পরও উদ্ধার না করে হামলার নির্দেশ দিলেন?
সূত্র অনুযায়ী, অ্যাডমিরাল ব্র্যাডলির সিদ্ধান্ত পিট হেগসেথের প্রাথমিক নির্দেশের ওপর নির্ভর করেছিল। দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের সূত্র দাবি করে যে হেগসেথ নির্দেশ দিয়েছিলেন নৌকার কোনো যাত্রীকে জীবিত থাকতে দেওয়া হবে না, এবং ব্র্যাডলি সেই নির্দেশ পালন করতেই পরবর্তী হামলার সিদ্ধান্ত নেন।
এরিক ওহলারিখ, এবিসি নিউজের একজন বিশ্লেষক এবং সাবেক নেভি সিল, যিনি সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের সময় ব্র্যাডলির অধীনে কাজ করেছিলেন, বলেছেন যে তিনি কখনো ব্র্যাডলিকে আইন লঙ্ঘন করতে দেখেননি। ওহলারিখ বলেন, “যদি হোয়াইট হাউসের বক্তব্য অনুযায়ী ২ সেপ্টেম্বর ব্র্যাডলি পরবর্তী হামলার নির্দেশ দিয়ে থাকেন, তবে সেই সিদ্ধান্তটি হেগসেথের প্রাথমিক নির্দেশ এবং নৌকায় থাকা অভিযুক্ত চোরাকারবারিরা কেন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি—সে বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করেই নেওয়া হয়ে থাকবে।”
ওহলারিখের মতে, কর্তৃত্বপূর্ণ পদে থাকা কমান্ডাররা সর্বদা তাদের কাছাকাছি একজন সামরিক আইনজীবীর পরামর্শ নেন। সুতরাং, ব্র্যাডলি হামলার আগে অবশ্যই একজন সামরিক আইনজীবীর পরামর্শ চেয়েছিলেন বলে ধরে নেওয়া যায়।
তবে হেগসেথ নিজেই বলেছিলেন যে তিনি পুরো অপারেশনটি “লাইভ” দেখছিলেন, যা নির্দেশ করে যে এই হামলায় উচ্চ পর্যায়ের নজরদারি এবং পরোক্ষ অনুমোদন ছিল। তবে হেগসেথ পরে সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেন যে এটি ব্র্যাডলির নিজস্ব “কমব্যাট ডিসিশন” (যুদ্ধকালীন সিদ্ধান্ত) ছিল। ব্র্যাডলি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, তবে ধারণা করা হচ্ছে তিনি এই সপ্তাহের শেষের দিকে আইনপ্রণেতাদের ব্রিফ করবেন।
তৃতীয় প্রশ্নটি আসে, কে নিহত হয়েছিল? আর তারা কি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি ছিল? মারা যাওয়া ব্যক্তিরা আসলে কারা ছিলেন এবং তারা ঠিক কী ধরনের হুমকি সৃষ্টি করেছিলেন—সে সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য এখনও প্রকাশ করা হয়নি, এবং এটিই বর্তমানে তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দু। নিহত ব্যক্তিরা ছিলেন সামরিক হামলায় আঘাতপ্রাপ্ত সন্দেহভাজন মাদকবাহী নৌকার বেঁচে থাকা যাত্রীরা।
সমালোচকরা বলছেন, এই মূল্যায়নটি গোয়েন্দা সংস্থার দ্বারা করা উচিত ছিল এবং প্রতিরক্ষা সচিব হেগসেথের দ্বারা অনুমোদিত হওয়া উচিত ছিল।
প্রতিরক্ষা সচিব হেগসেথের মাদক চোরাকারবারীদের হত্যার ন্যায্যতা অনেকটা ৯/১১–এর পর ব্যবহৃত যুক্তির মতো বলে মনে হচ্ছে। ৯/১১–এর পরে কংগ্রেস আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্ত লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে সামরিক বল প্রয়োগের অনুমোদন দিয়েছিল। সেই কর্তৃপক্ষকে ব্যবহার করে ইরাক ও সিরিয়ার মতো স্থানে কমান্ডাররা তাৎক্ষণিক হুমকি হিসেবে বিবেচিত লোকদের (যারা ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস পরিবহন করছিল) হত্যা করতেন, কারণ এগুলো ওই অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের জন্য সরাসরি বিপদ ছিল।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে যুক্তি দিয়েছিলেন যে অবৈধ মাদক পাচারকারীরা আল-কায়েদা সন্ত্রাসীদের মতোই আমেরিকানদের জন্য বিপজ্জনক। তিনি বেশ কয়েকটি মাদক কার্টেলকে “বিদেশি সন্ত্রাসী সংস্থা” হিসেবে চিহ্নিত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু আইন বিশেষজ্ঞরা ড্রাগ পাচারকারীদের সঙ্গে আল-কায়েদা বা আইএসআইএস যোদ্ধাদের তুলনার বিরোধিতা করেছেন। তারা উল্লেখ করেছেন, কংগ্রেস আসলে সামরিক শক্তি ব্যবহারের জন্য এ ধরনের কোনো নতুন বা নির্দিষ্ট অনুমোদন দেয়নি।
হাউস ইন্টেলিজেন্স কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জিম হিমস জানিয়েছেন, এই হামলায় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা এবং এর কৌশলগত প্রভাব সম্পর্কিত তথ্যের জন্য তিনি এখনও অপেক্ষা করছেন।
রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস কঠোর ভাষায় বলেছেন, যদি হত্যার নির্দেশটি প্রমাণিত হয়, তবে যিনি নির্দেশ দিয়েছেন তাকে তাৎক্ষণিকভাবে ওয়াশিংটন ছেড়ে যেতে হবে। অন্যদিকে, যদি অভিযোগটি মিথ্যা হয়, তবে যারা এই “বিভ্রান্তিকর ক্ষোভ” সৃষ্টি করেছে তাদের বরখাস্ত করা উচিত।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন