https://www.prothomalony.com/

15485

north-america

উত্তর আমেরিকা

অ্যাসাইলাম প্রক্রিয়া স্থগিত ও অনিশ্চয়তার দ্বারপ্রান্তে আশ্রয়প্রার্থীরা

প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৩:১৭

ওয়াশিংটন ডিসিতে গুলিবর্ষণে দুই ন্যাশনাল গার্ড সদস্য আহত হওয়ার ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়–আবেদন প্রক্রিয়া কার্যত থমকে গেছে। মার্কিন সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিস ঘোষণা করেছে, জমে থাকা পুরোনো ফাইল এবং সাম্প্রতিক সহজ যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রবেশ করা ব্যক্তিদের নিয়ে সর্বোচ্চ মানের নিরাপত্তা মূল্যায়ন শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো নতুন আবেদন গ্রহণ বা সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। এই অবস্থান ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির ধারাবাহিকতা, যার লক্ষ্য জাতীয় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।

যুক্তরাষ্ট্রে ইমিগ্রেশন প্রশ্নে তীব্র রাজনীতি চলছে অনেক দিন ধরেই। সামান্য আইন ফাঁকফোকর দিয়ে কেউ প্রবেশ করে পরে কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়লেই সমগ্র ব্যবস্থাকে দায়ী করা হয়। আর এই ক্ষোভের ঢেউ গিয়ে আঘাত হানে প্রকৃত বিপন্ন মানুষের ওপর—যারা সত্যিই জীবন বাঁচাতে পালিয়ে এসেছে। তাদের প্রতিটি আশ্রয় আবেদন হয়ে দাঁড়ায় সন্দেহের চোখে দেখা একটি ফাইল, আর তাদের ভবিষ্যৎ আটকে যায় রাজনৈতিক তর্কের ঘূর্ণিতে।

হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোয়েম জানিয়েছেন, নতুন মানদণ্ডে ব্যাকলগ নিষ্পত্তি হলেই অ্যাসাইলাম আবার শুরু হবে। তিনি আরও বলেন, ন্যাশনাল গার্ডে গুলিবর্ষণের সন্দেহভাজন আফগান নাগরিক লাখানওয়াল যুক্তরাষ্ট্রে আসার পরই উগ্রপন্থার প্রভাবে পড়েছেন, এমনটাই তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা। এনবিসি নিউজ জানিয়েছে, তিনি বাইডেন প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকেন, পরে ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে তার আশ্রয় অনুমোদিত হয়। আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর হয়ে কাজ করার কারণে তিনি আগেই বিস্তৃত যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন, এই তথ্যও প্রতিবেদনে এসেছে। এখন তাকে প্রথম ডিগ্রি হত্যার অভিযোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

যদিও নোয়েম অভিযোগ করছেন যে বাইডেন প্রশাসন প্রবেশ–যাচাই দুর্বল করে রেখেছিল, তবে এখন পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসন এই দাবির পক্ষে কোনো স্পষ্ট প্রমাণ হাজির করতে পারেনি। কিন্তু এমন রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেই আটকে আছেন হাজার হাজার আশ্রয়প্রার্থী, যাদের কেউ যুদ্ধের আগুন, কেউ ধর্মীয় নিপীড়ন, কেউ বা রাজনৈতিক অত্যাচার থেকে বাঁচতে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছেন। তাদের জন্য স্থগিতাদেশ শুধু সময়ক্ষেপণ নয়—এটি জড়িয়ে আছে ভয়, অনিশ্চয়তা এবং প্রত্যাখ্যানের সম্ভাবনা।

এখন যুক্তরাষ্ট্র এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে নিরাপত্তা এবং মানবাধিকার—দুটিকে সমান গুরুত্ব দিয়ে এগোনোর পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা; কিন্তু যারা আশ্রয় চাইছে, তাদেরও তো জীবনের অধিকার, মর্যাদার অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকা উচিত। কঠোরতা যদি অত্যাবশ্যক হয়, তবে তার মধ্যেও মানবিকতার জানালা বন্ধ হয়ে যাওয়া কি গ্রহণযোগ্য?

বাংলাদেশসহ বহু দেশ থেকে যারা প্রাণের ভয়ে ঘরবাড়ি ছেড়েছেন, তারা এখন দোলাচলে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের কাছে একটি আশার নাম ছিল। আজ সেই আশাই স্থগিতাদেশের ছায়ায় ঢেকে গেছে। তাদের অস্থির অপেক্ষা প্রতিদিন বাড়াচ্ছে আতঙ্ক—কোথায় তাদের জায়গা, কোথায় তাদের নিরাপত্তা?

ট্রাম্প প্রশাসন শুরু থেকেই সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের ওপর কঠোর পদক্ষেপ করেছে। তার জেরে অ্যাসাইলাম আবেদনের যে প্রবাহ আগের প্রশাসনের সময়ে ছিল, তা এখন নেই। অ্যাসাইলাম বা রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা বিপন্ন মানুষজনের ভবিষ্যৎ, অধিকার এবং অস্তিত্বের প্রশ্ন। সবকিছু বিবেচনা করেই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় সতর্কতা, রাজনৈতিক সংযম এবং আন্তর্জাতিক দায়িত্ববোধ।

সময় এসেছে দায়বদ্ধতার প্রকৃত প্রয়োগের। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি—কিন্তু সেই নিরাপত্তা যেন মানবাধিকারের ওপর ছায়া না ফেলে। না হলে রাষ্ট্রের শক্তি নয়, মানবতার দুর্বলতাই প্রকাশ পায়।
 

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন