https://www.prothomalony.com/

15483

north-america

উত্তর আমেরিকা

উত্তরের স্বাস্থ‍্য-সচেতনতা

প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০২৫ ০৩:৪৫

১.নিয়মিত ব্যায়ামে ডিমেনশিয়া ঝুঁকি কমবে প্রায় অর্ধেক

 

অনেকেই নিয়মিত ব্যায়াম করেন সুঠাম দেহ ও শারীরিক সুস্থতার জন্য। আমরা জানি নিয়মিত ব‍্যায়াম শারীরিক কার্যকলাপের উপকারিতা দেয়-যেমন, নিয়মিত ব্যায়াম হৃদপিণ্ডকে শক্তিশালী করে, রক্ত সঞ্চালন উন্নত করে এবং হাড়-পেশী মজবুত রাখে, যা অস্টিওপরোসিস প্রতিরোধ করে। এছাড়া, ব‍্যায়াম ওজন নিয়ন্ত্রণ করে, ক্যালোরি পোড়ায় এবং শারীরিক শক্তি বাড়ায়।  কিন্তু মস্তিষ্ক? বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে জানিয়েছেন, জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে নিয়মিত ব্যায়াম ভবিষ্যতের মস্তিষ্কের অবক্ষয় ঠেকাতে সাহায্য করে। তবে, নতুন গবেষণা এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে: কারণ এটি বলছে, এমনকি ৪৫ বছর বয়সের পরেও যদি কেউ ব্যায়াম শুরু করেন, তাহলেও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উপকার মিলতে পারে। বোস্টন ইউনিভার্সিটির স্কুল অব পাবলিক হেলথের এপিডেমিওলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. ফিলিপ হুয়াং বলেছেন, শারীরিক কার্যকলাপ মস্তিষ্কের কাঠামো ও কার্যকারিতা উন্নত করে, প্রদাহ কমিয়ে এবং মস্তিষ্কে বিটা-অ্যামাইলয়েড প্রোটিনের জমা হওয়াকে ধীর করে-যা অ্যালঝাইমার রোগের একটি প্রধান লক্ষণ-ফলে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমতে পারে।

 

যদিও প্রাপ্তবয়সের প্রাথমিক সময়ে শারীরিক কার্যকলাপের মাত্রা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকির সাথে ইতিবাচক বা নেতিবাচক কোনোভাবেই সম্পর্কিত নয়, তবে 

গবেষকরা আবিস্কার করেছেন যে আলঝেইমার রোগের সবচেয়ে শক্তিশালী জেনেটিক ঝুঁকির কারণ 'APOE ε4' জিন-যুক্ত বয়স্ক প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে, উচ্চ শারীরিক কার্যকলাপ ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি ৬৬ শতাংশ কম হওয়ার সাথে যুক্ত।

সিএনএন তথ‍্যসূত্র ‌অনুযায়ী, ১৯ নভেম্বর 'জামা নেটওয়ার্ক অপেন' জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মধ্যবয়সে (৪৫–৬৪ বছর) এবং বার্ধক্যে (৬৫–৮৮ বছর) যারা সবচেয়ে বেশি শারীরিকভাবে সক্রিয় ছিলেন, তাদের ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি যথাক্রমে ৪১ শতাংশ এবং ৪৫ শতাংশ কম ছিল। ২০২২ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দিনে মাত্র ৩,৮০০ পদক্ষেপ হাঁটতেন, তারা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি ২৫ শতাংশ কমিয়েছেন।সাধারণভাবে, অংশগ্রহণকারীরা যত বেশি হাঁটতেন, ততই তাদের উপকারিতা বাড়ত। গাড়ি, বাস বা ট্রেনের পরিবর্তে যাতায়াতে সাইকেল ব্যবহার করাও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি ১৯ শতাংশ এবং অ্যালঝাইমার রোগের ঝুঁকি ২২ শতাংশ কমানোর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে পাওয়া গেছে। 

 

‌অনেকেই মনে করেন একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর ব‍্যায়াম তেমন কোন উপকারীতা আসেনা। কিন্তু ব্যাপ্টিস্ট হেলথ সাউথ ফ্লোরিডার মার্কাস নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটের নিউরোসাইকোলজিস্ট ড. রাফায়েল ওয়াল্ড বলেছেন, ব্যায়াম ভাস্কুলার স্বাস্থ্য বজায় রাখতে একটি প্রধান ভূমিকা পালন করে, যেখানে সবচেয়ে সাধারণ ভাস্কুলার ঝুঁকির কারণগুলি-উচ্চ রক্তচাপ, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, থাইরয়েড রোগ এবং উচ্চ কোলেস্টেরল-মধ্যজীবন এবং পরবর্তী প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে দেখা দিতে শুরু করে। এই সময়কালে ব্যায়াম ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে। 

 

তাই, প্রতিদিন সক্রিয় থাকার জন্য কিছু নিয়মিত অভ্যাস গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ, যেমন কাজের আগে ২০ মিনিট হাঁটা, বা দুপুরে অল্প সময়ের নড়াচড়ার বিরতি নেওয়া। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুসারে, প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে ১৫০ থেকে ৩০০ মিনিট মাঝারি মানের অ্যারোবিক কার্যকলাপ অথবা ৭৫ থেকে ১৫০ মিনিট জোরদার অ্যারোবিক ব্যায়াম করা প্রয়োজন। এই ব্যায়াম উদাহরণস্বরূপ হতে পারে-১৫০ মিনিট দ্রুত হাঁটা, ৭৫ মিনিট জোরে দৌড়ানো বা সাইকেল চালানো, এবং সপ্তাহে দু'বার শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করা। 

ড. রাফায়েল ওয়াল্ড পরামর্শ দেন, যদি আপনি ব্যায়ামে নতুন হন, তাহলে প্রথমে ধীর বা স্বল্প সময়ের ব্যায়াম দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে তীব্রতা বাড়াবেন। শুরুতেই খুব আক্রমণাত্মকভাবে শুরু করলে অর্থোপেডিক আঘাত হতে পারে, যা পরে আপনার ব্যায়াম করার ক্ষমতাকে সীমিত করে দিতে পারে।

 

তবে গবেষণায় সীমাবদ্ধতা নিয়ে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের নিউরোলজি ইনস্ট্রাক্টর ডা. সঞ্জুলা সিংহ বলছেন, যারা বেশি সক্রিয় তারা অন্যান্য স্বাস্থ্যকর আচরণেও যুক্ত থাকতে পারেন, এবং গবেষকরা সবগুলি ভালোভাবে পরিমাপ করতে পারেননি। এছাড়াও, অংশগ্রহণকারীরা তাদের কার্যকলাপের মাত্রা ভুলভাবে পরিমাপ করতে পারে; তাই ট্র্যাকার পরিধানযোগ্য ডিভাইস সহ অধ্যয়ন আরও বস্তুনিষ্ঠ উপায় হবে।

কাজেই আপনি যদি আপনার ফিটনেস অভ্যাস এবং ডিমেনশিয়ার জন্য অন্যান্য ঝুঁকির কারণগুলি পুনর্বিবেচনা করেন, তবে মনে রাখবেন যে ভারসাম্য বজায় রাখা এবং জড়িত সমস্ত কারণ সম্পর্কে আপনার ডাক্তারের সাথে কথা বলা অপরিহার্য।

 

 

২.ওজন কমানোর ৯টি স্বাস্থ্য উপকারিতা

 

বেশিরভাগ মানুষই বোঝেন যে একটি স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা অপরিহার্য। কিন্তু ওজন কমানোর সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্য উপকারিতাগুলো সম্পর্কে সবাই জানেন না। ওজন কমানোর এই উপকারিতাগুলি জানা থাকলে তা ওজন কমানোর প্রক্রিয়ায় আপনাকে অনুপ্রাণিত করতে পারে।

 

ওজন কমানোর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্য উপকারিতাগুলো হলো:

১. হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের উন্নতি: অতিরিক্ত ওজন আপনার হৃৎপিণ্ডকে শরীরের মাধ্যমে রক্ত সঞ্চালনে আরও কঠোর পরিশ্রম করতে বাধ্য করে। ওজন কমালে ধমনীর উপর চাপ কমে এবং হৃৎপিণ্ডের ওপরের চাপ হ্রাস পায়। এটি আপনার খারাপ 'লো ডেনসিটি লিপোপ্রোটিনস' কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতেও সাহায্য করে।

 

২. টাইপ ২ ডায়াবেটিসের উন্নতি: টাইপ–২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা যখন ওজন কমানোর চেষ্টা করেন, তখন সাধারণত তাদের ইনসুলিন সংবেদনশীলতা উন্নত হয়। কারণ অতিরিক্ত চর্বি প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা ইনসুলিনের কাজ অর্থাৎ রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ বাধাগ্রস্ত করে। মাত্র ৫ শতাংশ ওজন কমালেও আপনি এই উন্নতি দেখতে পাবেন।

 

৩. স্ট্রোকের ঝুঁকি হ্রাস: ওজন কমালে কেবল হৃৎপিণ্ডের ওপর চাপই কমে না, রক্তনালীগুলির ওপরও চাপ কমে, যার ফলে রক্ত ​​জমাট বাঁধার সম্ভাবনা হ্রাস পায়।

 

৪. নির্দিষ্ট কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাস: চিকিৎসকদের মতে, আপনার ওজন যত কমবে, প্যানক্রিয়াস, কিডনি, স্তন (বিশেষ করে মেনোপজ-পরবর্তী নারীদের), এন্ডোমেট্রিয়াল এবং লিভার ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিও তত হ্রাস পায়।

 

৫. চলাফেরার ক্ষমতা বৃদ্ধি: ওজন কমালে আপনার হাঁটু এবং অন্যান্য জয়েন্টগুলির উপর চাপ কমবে। সামান্যতম ওজন হ্রাসও জয়েন্টের ব্যথা কমায় এবং চলাফেরা সহজ করে তোলে। এতে ব্যায়াম করার উৎসাহ বাড়ে, যা ওজন কমানোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখে এবং ফিটনেস আরও বৃদ্ধি করে।

 

৬. ঘুমের উন্নতি এবং শক্তি বৃদ্ধি:  অতিরিক্ত ওজনের ব্যক্তিরা প্রায়শই স্লিপ অ্যাপনিয়াতে ভোগেন-যেখানে গলায় অতিরিক্ত চর্বি জমে শ্বাস নেওয়া কঠিন হয়, ফলে রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায়। ওজন কমালে সমস্যাটি পুরোপুরি দূর না হলেও, ঘুমের মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়। ফলস্বরূপ, দিনে শক্তি ও কর্মক্ষমতা বেড়ে যায়।

 

৭. যৌন আকাঙ্ক্ষা বাড়াতে পারে: বিশেষজ্ঞদের মতে, ওজন কমানোর ফলে হরমোনের পরিবর্তন ঘটে, যা আপনার লিবিডো বা যৌন আকাঙ্ক্ষা বাড়াতে পারে। 

 

৮. স্বাদের অনুভূতি বৃদ্ধি: যদিও কারণটি পরিষ্কার নয়, তবে দেখা দেখা গেছে যে ওজন কমালে অনেকেরই খাবারের স্বাদ আরও তীক্ষ্ণভাবে অনুভূত হয়। এর ফলে, আপনি খাবারের পরিমাণ কমিয়েও একই রকম উপভোগ করতে পারেন।

 

৯. আত্মসম্মান বৃদ্ধি: ওজন কমানোর সব সুবিধা শারীরিক নয়। নিজের সম্পর্কে আপনার অনুভূতিতে আসা পরিবর্তনগুলিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং নিজেকে ফিট রাখা আত্মমর্যাদা এবং আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে।

 

তবে মনে রাখা জরুরি, যাদের ওজন বৃদ্ধি কোনো চিকিৎসাজনিত অবস্থার (যেমন থাইরয়েড সমস্যা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা বা নির্দিষ্ট ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া) কারণে হয়, তাদের ক্ষেত্রে ওজন কমানোর প্রক্রিয়া ভিন্ন হতে পারে। সেক্ষেত্রে কোনো খাদ্যাভ্যাস বা ব্যায়াম শুরু করার আগে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বা এন্ডোক্রিনোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ওজন ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি অন্তর্নিহিত চিকিৎসাজনিত সমস্যাটির সমাধান করা।

 

 

৩.শিশুরা কথা শুনছে না: অভিযোগ নয়, মনোযোগ দিন 

আধুনিক অভিভাবকত্বের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সাধারণ অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো-"আজকের যুগের শিশুরা বাবা-মায়ের কথা শোনে না।" অভিযোগটি অনেকাংশে সত্য হলেও, কেন আমাদের সন্তানেরা কথা শুনছে না, তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবাটা জরুরি। এই সমস্যার মূল কারণ প্রায়শই শিশুর জন্মগত কোনো ত্রুটি নয়, বরং তা লুকিয়ে থাকে অভিভাবকের আচরণ এবং শিশুকে 'শোনা' শেখানোর পদ্ধতির মধ্যে। আমাদের জানা খুব জরুরি যে, শিশুদের শুনতে না শেখানো পর্যন্ত তারা কখনোই শুনবে না। কেননা 'শোনা' একটি জন্মগত প্রবৃত্তি নয়, এটি একটি শিক্ষাগত আচরণ বা সামাজিক দক্ষতা-যা বাবা মাকে ধৈর্য সহকারে শেখাতে হয়। 

 

শিশুদের মনোযোগ হারানো বা কথা না শোনার পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। প্রথমত, আচরণগত মডেলিং ও যোগাযোগের ত্রুটি: শিশুরা উপদেশের চেয়ে অভিভাবকের আচরণকে বেশি গুরুত্ব দেয়। পরিবারে বাবা-মায়ের চিৎকার, অসম্মান, অতিরিক্ত নির্দেশের কারণে 'শব্দ' অকার্যকর হয়ে এবং নেতিবাচক ভাষা ('তুমি/তুই'-তে আক্রমণ, 'যদি' দিয়ে হুমকি, 'কেন' দিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া) ব্যবহারের ফলে শিশু প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং বিভ্রান্ত হয়। দ্বিতীয়ত, আবেগিক ও সম্পর্কগত বাধা: অতিরিক্ত ডিভাইস ব্যবহার বা ব্যক্তিগত হতাশার কারণে বাবা-মা যখন সন্তানের প্রয়েজনে  মানসিকভাবে উপস্থিত থাকেন না তখন শিশু নিজেকে গুরুত্বহীন মনে করে। বিশেষত, বাবা-মায়ের ত্যাগ বা সংকটের কথা টেনে এনে শিশুকে শোনাতে বাধ্য করাকে 'আবেগিক ব্ল্যাকমেইল' হিসাবে দেখে শিশুরা যা তাদের আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। তৃতীয়ত, শিশুর শ্রবণ সমস্যা বা মনোযোগের ঘাটতি থাকলে নির্দেশ বুঝতে পারা কঠিন হয়। এছাড়াও, ক্ষুধা, ক্লান্তি, রাগ বা চলমান কাজে প্রচণ্ড মনোযোগের অগ্রাধিকার-এইসব অভ্যন্তরীণ অবস্থার কারণে শিশুর পক্ষে নতুন নির্দেশনা প্রক্রিয়া করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

 

শিশুদের মনোযোগ পেতে করণীয়

শিশুদের মধ্যে শোনার অভ্যাস গড়ে তুলতে অভিভাবকদের আবেগিক সংযোগ, ধৈর্য এবং স্পষ্ট যোগাযোগের ওপর জোর দিতে হবে।

 

১.প্রাথমিক সমাদান-যোগাযোগের কৌশল: প্রাথমিক সমাধানে, অভিভাবকদের উচিত অনুরোধ বা নির্দেশকে সংক্ষিপ্ত, স্পষ্ট ও সরাসরি রাখা (দীর্ঘ বক্তৃতা এড়িয়ে চলা)। 'না'-এর বদলে কী করা উচিত, তা বলা, নরম শান্ত স্বরে কথা বলা, চোখে তাকানো এবং মৃদু স্পর্শের মাধ্যমে(আলিঙ্গন বা ছোঁয়া) মনোযোগ আকর্ষণ করা জরুরি। নির্দেশ কার্যকর হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করতে শিশুকে পুনরাবৃত্তি করতে বলা একটি কার্যকর কৌশল। যখন আপনাকে 'না' বলতে হয়, তখন সেটিকে ভবিষ্যতের 'হ্যাঁ'-তে পরিণত করুন। যেমন: "আজ পার্কে যাওয়া হবেনা তবে কাল আমরা যাবো।"

 

২.উন্নত সমাধান-শিশুর অবস্থা বোঝা: এই কৌশলগুলি সন্তানের মানসিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে বোঝার ওপর ভিত্তি করে তৈরি এবং আরও কার্যকরী।  নির্দেশ কার্যকর করতে হলে প্রথমে সন্তানের সাথে মানসিক সংযোগ স্থাপন করুন এবং তাকে কেবল কাজ করিয়ে নেওয়ার মাধ্যম হিসেবে না দেখে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে দেখুন। নির্দেশনা দেওয়ার সময় সময়জ্ঞান বজায় রাখুন; শিশু কোনো কাজে ডুবে থাকলে তাকে সরাসরি বাধা না দিয়ে শর্তসাপেক্ষ বাক্য ব্যবহার করুন (যেমন: "এটি শেষ হলে, ওটা করবে")। এছাড়াও, শিশুর আবেগিক ও শারীরিক সক্ষমতা বিবেচনা করে নির্দেশ দিন এবং সব পরিস্থিতিতে তাদের কাছ থেকে রোবটের মতো নিখুঁত আচরণ আশা না করে প্রেক্ষাপট (যেমন: ক্লান্তি, উত্তেজনা বা বড় কোনো ইভেন্ট) সম্পর্কে সচেতন থাকুন। সন্তানকে তার নাম ধরে ডেকে, চোখে চোখ রেখে, মৃদুস্বরে এবং স্বল্প শব্দে তার কাজটি  স্মরণ করিয়ে দেওয়াই হলো কার্যকর কৌশলের অংশ। 'প্লিজ' শব্দটি ব্যবহার করুন, ভালো কাজের জন‍্য ধন‍্যবাদ জানান এবং দয়া করে হাসুন, আলিঙ্গল বজায় রাখুন। 

 

৩.গভীর মনস্তাত্ত্বিক কৌশল: সম্পর্ক ও স্বায়ত্তশাসন

এই কৌশলগুলি সম্পর্কের উন্নয়ন, স্বায়ত্তশাসন এবং অভ্যন্তরীণ প্রেরণা বৃদ্ধির ওপর জোর দেয়:

 

•একসাথে কাজটি করা: আমরা শিশুদের যে কাজগুলি করতে বলি, তা অন্য অগ্রাধিকার, ক্লান্তি বা একা করার অনীহার কারণে তাদের কাছে কঠিন মনে হতে পারে। এই সমস্যা সমাধানে, অভিভাবকরা যখন বলেন, "চলো কাজটি একসাথে করি," তখন তা সন্তানের সাথে গভীর সংযোগ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা তৈরি করে। শিশুরা তাদের অভিভাবকের সাথে সময় কাটাতে ভালোবাসে-এই আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগিয়ে ঘর পরিষ্কার বা থালাবাসন ধোয়ার মতো দৈনন্দিন কাজগুলোকে অর্থবহ যৌথ স্মৃতিতে রূপান্তরিত করা সম্ভব, যার ফলে কাজগুলি শেষ করার জন্য শিশুদের আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে যায়। মনে রাখবেন, একসাথে কাজ করার সময় আপনার খুব বেশি কিছু করার প্রয়োজন নাও হতে পারে; কেবল তাদের পাশে উপস্থিত থাকা এবং মৃদু নির্দেশনা দেওয়াই যথেষ্ট।

 

•জিজ্ঞাসা করুন এবং অপেক্ষা করুন: আপনি আপনার সন্তানকে কোনো কাজ করতে বলার পর যদি তাৎক্ষণিক সাড়া না দেয়(যতক্ষণ পর্যন্ত সেখানে স্ক্রিনের ব্যবহার না থাকে), তবে আরও কিছু সময় অপেক্ষা করুন-প্রায় পাঁচ মিনিট। এই সময়টুকু শিশুদের তাদের ভেতরের কণ্ঠস্বর শুনতে, নির্দেশটি প্রক্রিয়া করতে এবং সাড়া দিতে সাহায্য করার একটি শক্তিশালী উপায়। অনেক সময় আপনার সন্তানের ভেতরের মনই তাকে বলবে যে তার উচিত আপনাকে সাহায্য করা। আর যদি দেখে আপনি নিজে সেই কাজটা করছেন, তাহলে যোগ দিতে এবং সাহায্য করতে চাওয়ার টানটা আরও অনেক বেশি শক্তিশালী হয়। সংযোগ, সহযোগিতা এবং সামান্য নিয়ন্ত্রণবোধই ভালো ফল নিয়ে আসে।

 

•অতিরিক্ত প্রশংসার বদলে ধন‍্যবাদ বলুন: শিশুকে অতিরিক্ত প্রশংসা দেওয়ার পরিবর্তে ভালো কাজটির জন‍্য  ধন্যবাদ বলুন। "ভালো কাজ করেছ" বলার চেয়ে "ধন্যবাদ, তুমি সাহায্য করায় কাজটি দ্রুত শেষ হলো"-বলা সন্তানের অভ্যন্তরীণ প্রেরণা এবং স্বায়ত্তশাসনকে উৎসাহিত করে।

 

•সংযোগ বনাম সংশোধন অনুপাত: যদি কেউ আপনাকে সর্বদা শুধরে দেয় বা নির্দেশ দেয়, তবে আপনি নিশ্চয়ই তাকে এড়িয়ে চলবেন। কিন্তু যিনি আপনাকে দেখেন, শোনেন এবং মূল্য দেন, আপনি তার কথা শুনতে বেশি আগ্রহী হবেন। এটিই হলো সংযোগ বনাম সংশোধন অনুপাত-এর মূল ভিত্তি। তাই, অভিভাবকদের উচিত শিশুদের সাথে কেবল নির্দেশ বা ভুল সংশোধন না করে, বরং একসাথে সম্পর্ক তৈরি করতে, কাজ করতে এবং সমাধান খুঁজে বের করার ওপর সময় দেওয়া। গভীর সংযোগ তৈরি হলে অনুবর্তিতার আকাঙ্ক্ষা বাড়ে, যা সংশোধন এবং নির্দেশনার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর।

 

•শিশুর অযৌক্তিকতা মেনে নিন: শিশুরা সহজাতভাবেই অযৌক্তিক এবং আবেগপ্রবণ, কারণ তারা এখনও বিকাশের পর্যায়ে রয়েছে। যখন আপনার সন্তান জেদ করছে বা শিশুসুলভ আচরণ করছে, তখন এটি মেনে নিন যে তাদের সক্ষমতা সীমিত। এর অর্থ এই নয় যে আপনি আপনার মানদণ্ড নিচে নামিয়ে আনছেন বা সাধারণ আচরণ মেনে নিচ্ছেন বরং আপনার প্রত্যাশাগুলিকে শিশুর প্রকৃত বিকাশগত বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখছেন। অনুশীলন ছাড়া পিয়ানোর কঠিন সুর যেমন বাজানো যায় না, তেমনি ভালো আচরণের জন্যও শিশুদের সময় এবং শেখা প্রয়োজন। মনে রাখবেন, তারা একদিন কোনো কাজ করতে পারলেই প্রতিদিন একই কাজ করতে পারবে-এমনটা আশা করা উচিত নয়। ক্লান্তি, ক্ষুধা বা মানসিক চাপের মতো সাধারণ বিষয়গুলোও তাদের সক্ষমতায় বাধা দিয়ে আচরণকে অযৌক্তিক করে তুলতে পারে। তাই, তাদের প্রতিদিনের পরিস্থিতি বুঝে প্রত্যাশা করুন।

 

•আপনার অনুরোধের জন্য স্পষ্ট যুক্তি দিন:যদি আপনার সন্তান বুঝতে পারে যে আপনি কেন কোনো কিছু করতে বলছেন, তবে সেই অনুরোধটি তাদের কাছে যৌক্তিক মনে হওয়ার কারণে তারা নির্দেশ পালন করতে অনেক বেশি আগ্রহী হবে। 

 

•কাজটি মজাদার করে তুলুন: যদিও জীবন সব সময় মজাদার নাও হতে পারে, তবুও দায়িত্ব বা ঘরোয়া কাজগুলিকে যখন উপভোগ্য করে তোলা যায়, তখন তা সহজ হয়ে যায়। কাজের সময় একটি মজার গান চালু করা, একসাথে ছড়া তৈরি করা, বা টাইমার সেট করে খেলার ছলে কাজটি শেষ করার চেষ্টা করা (যেমন, 'সুপারহিরো দ্রুততায়')-এই কৌশলগুলি ব্যবহার করা যায়। যখন কোনো কাজকে বাধ্য করার পরিবর্তে মজাদার করে তোলা হয়, তখন তা আর নির্দেশ বা বোঝা মনে না হয়ে, বরং একটি আকর্ষণীয় কার্যকলাপ বলে মনে করে। এই ইতিবাচক মানসিকতা শিশুর স্বেচ্ছায় সহযোগিতা করার প্রবণতা এবং অভ্যন্তরীণ প্রেরণা জাগিয়ে তোলে। 

 

পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তি হলো নিঃশর্ত মনোযোগ ও শ্রদ্ধা। অভিভাবকদের প্রথমে এই আত্মসমীক্ষা করতে হবে যে, শিশুরা কেবলই শিশু এবং কখনও কখনও তারা কথা শুনবে না-এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। শিশুদের কাছ থেকে বাধ্যতা চাওয়ার আগে অভিভাবকদের অবশ্যই তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং ধৈর্যশীল আচরণের আদর্শ উদাহরণ তৈরি করতে হবে। সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর চাপ সৃষ্টি না করে, বরং নরম স্বর, স্পষ্ট নির্দেশ এবং সহানুভূতিশীল আচরণের মাধ্যমে একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করাই হলো কার্যকর অভিভাবকত্বের মূল চাবিকাঠি।

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন