https://www.prothomalony.com/

15337

north-america

উত্তর আমেরিকা

মামদানির বিজয়: 'স্থিতাবস্থা'–এর পতন, বহুস্বরের উত্থান

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫ ০২:৫৫

৩৪ বছর বয়সী ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট জোহরান মামদানির নিউইয়র্কের প্রাক্তন গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমোকে পরাজিত করে নিউইয়র্ক সিটি মেয়র পদে নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাটি ছিল গতানুগতিক রাজনীতির বাইরে এক নতুন আন্দোলনের প্রতিধ্বনি। এই বিজয়কে একটি ঐতিহাসিক এবং বর্ণনামূলক রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা যায়, যেখানে তার জয় নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির নয়, বরং সবার একটি বিজয়।

মামদানিকে তার নির্বাচনী প্রচারণার সময় একাধিক দিক থেকে গুরুতর বিরোধিতা ও অভিযোগ মোকাবিলা করতে হয়েছিল: প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি মামদানির বিরোধিতা করে বলেছেন, যদি কেউ তাকে ভোট দেয়, তবে তিনি ফেডারেল তহবিল বন্ধ করে দেবেন। গাজা সংঘাতে ফিলিস্তিনিদের প্রতি তার দৃঢ় সমর্থনের কারণে তাকে ‘অ্যান্টি–সেমিটিক’ হওয়ার অভিযোগ মোকাবিলা করতে হয়েছে। ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্টে মামদানিকে যারা ভোট দেবেন, সেই ইহুদি ভোটারদের ‘বোকা’ বলে অভিহিত করেছেন এবং মামদানিকে ‘স্বঘোষিত ইহুদি বিদ্বেষী’ বলে মন্তব্য করেছেন।

তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যান্ড্রু কুমো সরাসরি অভিযোগ করেন যে মামদানি ‘ইহুদিদের বিরুদ্ধে ঘৃণা’ ছড়াচ্ছেন বা ‘ইহুদি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার হুমকি’ সৃষ্টি করছেন। মামদানিকে তার নির্বাচনী ইশতেহার বা অবস্থান সম্পর্কিত মন্তব্যের জন্য ‘বিশ্বব্যাপী জিহাদকে সমর্থন করা’র মতো গুরুতর অভিযোগ মোকাবিলা করতে হয় আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী স্লিওয়ার পক্ষ থেকে।

এছাড়াও, মামদানির বিপক্ষে কট্টর রিপাবলিকান এবং নিউইয়র্কের আওয়ামী লীগ–সমর্থকদের বিরোধিতা ছিল উল্লেখযোগ্য। বাঙালিদের মধ্যে কেউ কেউ প্রকাশ্যে মামদানির বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন— বলেছেন, ‘মামদানি মেয়র হলে নিউইয়র্ক শহর ধ্বংস হয়ে যাবে’ বা ‘মামদানি একজন মিথ্যাবাদী।’ কারও বিরোধিতামূলক ফেসবুক পোস্ট ছিল নিয়মিত, ঘণ্টায় ঘণ্টায় চোখে পড়ার মতো। জোহরান মামদানি মুসলিম না ভারতীয়— এমন প্রশ্নও উঠেছিল।

বিদেশি অনুদান গ্রহণকে ‘টাকা মেরে খেয়েছে’— এমন অভিযোগও ছিল প্রকাশ্য।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সব অভিযোগ সত্ত্বেও তিনি তার ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট অবস্থান ও স্থিতাবস্থা পরিবর্তনের বার্তার মাধ্যমে তরুণ, নতুন অভিবাসী ও অসন্তুষ্ট ভোটারদের সমর্থন নিয়ে জয়ী হন; বিশেষ করে এক-তৃতীয়াংশ ইহুদি ভোটার মামদানিকে সমর্থন করেছেন। বাঙালি কমিউনিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটও পেয়েছেন তিনি। এছাড়াও, নিউইয়র্ক সিটি যখন শহরের ১১১তম মেয়র হিসেবে জোহরান মামদানিকে নির্বাচিত করে, তখন এক্সিট পোলের তথ্যে প্রকাশ পায় যে নবনির্বাচিত মেয়র শহরের তরুণ জনগোষ্ঠী ও নতুন আগন্তুকদের বেশির ভাগ ভোট পেয়েছেন।

‘এসএসআরএস’ পরিচালিত এবিসি নিউজের এক্সিট পোল অনুসারে, মামদানি মঙ্গলবারের (নভেম্বর ৪) নির্বাচনে ৩০ বছরের কম বয়সী ৭৮% ভোটারের এবং ৩০ থেকে ৪৪ বছর বয়সী ৬৬% ভোটারের সমর্থন লাভ করেন। ৪৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী ভোটারদের মধ্যে প্রাক্তন গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমো সামান্য ব্যবধানে মামদানিকে ছাড়িয়ে যান (৫৩% বনাম ৪৭%)। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী অধিকাংশ ভোটার (৫৫%) কুমোকে ভোট দেন, যেখানে মামদানি পান ৩৬% ভোট। এছাড়াও, নিউইয়র্ক সিটিতে ১০ বছরের কম সময় ধরে বসবাস করা ৮১% নতুন অভিবাসী মামদানিকে সমর্থন করেছেন, যা তাকে এই শ্রেণির ভোটারদের মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় প্রার্থী করে তোলে।

নিউইয়র্কের তরুণ ও নতুন ভোটারদের মধ্যে নির্বাচনী সাফল্যের পাশাপাশি মামদানি ৫৫% ভোটারের সমর্থনও পেয়েছেন, যারা ১০ বছরের বেশি সময় ধরে শহরে বসবাস করছেন, কিন্তু শহরে জন্মগ্রহণ করেননি। এক্সিট পোল অনুযায়ী, যারা নিউইয়র্ক সিটিতে জন্মগ্রহণ করেছেন, তাদের মধ্যে মামদানির (৩৮%) চেয়ে কুমোকে (৪৯%) বেশি ভোট দিয়েছেন। আর যারা নিউইয়র্ক সিটি মেয়র নির্বাচনে প্রথমবার ভোট দিয়েছেন (৬৬%), তারা পূর্বে ভোট দেওয়া ভোটারদের (৪৭%) তুলনায় মামদানিকে বেশি ভোট দিয়েছেন।

এছাড়া, মামদানি ইসরায়েলের গাজায় যুদ্ধ পরিচালনার ওপর ক্ষুব্ধ হওয়া ডেমোক্র্যাট ও ইহুদি আমেরিকানদের একটি অংশের সমর্থন থেকেও উপকৃত হন। গত বছর কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বসন্তকালীন বিক্ষোভে এই অসন্তোষ প্রকাশ পায়, যা মামদানি সমর্থন করেছিলেন এবং রাজনৈতিকভাবে উপকৃতও হয়েছিলেন। গত বছরের পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা গেছে, ৩৫ বছরের নিচের ইহুদি আমেরিকানদের মধ্যে মাত্র অর্ধেক বলেছেন যে ইসরায়েল যেভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করেছে, তা গ্রহণযোগ্য। অন্যদিকে ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সী ইহুদিদের মধ্যে ৬৮% একে গ্রহণযোগ্য বলেছেন।

নিউইয়র্কে এক্সিট পোল অনুযায়ী, মঙ্গলবারের নির্বাচনে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ইহুদি ভোটার মামদানিকে সমর্থন করেছেন। এই সমর্থন ছিল অপ্রত্যাশিত, কারণ তিনি গাজা সংঘাতের কারণে ইহুদি বিরোধীদের লক্ষ্য ছিলেন। তবে এই সমর্থনই তাকে জয়ের পথে এগিয়ে দেয়, আর এই বিজয় তার সেইসব ইহুদি বিরোধীদের বিচলিত করেছে, যারা সাধারণত পরাজিত প্রার্থীর পক্ষে থাকতে অভ্যস্ত নন।

নিউইয়র্কের অন্যতম প্রধান ইহুদি অলাভজনক সংস্থা ইউজে–ফেডারেশন অব নিউইয়র্কের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হিন্ডি পউপকো বলেন, “নির্বাচনের পরের সকালে আমাদের সম্প্রদায়ের অনেকেই এক ধরনের অস্বস্তি নিয়ে ঘুম থেকে উঠেছেন। সিটি হলে মেয়র মামদানি দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি কীভাবে আচরণ করবেন, তা নিয়ে অনেক অনিশ্চয়তা রয়েছে।”

অনেক সেলিব্রেটি মামদানিকে সমর্থন করেছেন। অভিনেত্রী লুপিটা নিয়োং’ও তাকে ভোট দেন, কারণ তার মতে, “মামদানি নিউইয়র্ক সিটির একজন চমৎকার মেয়র হওয়ার মতো ব্যক্তিত্ব, দক্ষতা ও মেজাজের অধিকারী।” অভিনেতা মার্ক রাফালো ও কৌতুক অভিনেত্রী ইলানা গ্লেজার প্রচারণার শেষ দিনগুলোতে মামদানির জন্য ফোন ব্যাংকে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন। অভিনেতা ওয়ালেস শন ইস্ট ভিলেজে মামদানির জন্য প্রচার চালান। চলচ্চিত্র নির্মাতা স্পাইক লিও তার সমর্থন জানান।

জুন মাসে কৌতুক অভিনেতা রামি ইউসুফ কলম্বিয়ার স্নাতক ও ফিলিস্তিনপন্থী কর্মী মাহমুদ খলিলের সঙ্গে আটক অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর মামদানিকে বেকন থিয়েটারে মঞ্চে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান। অতি সম্প্রতি উইকেন্ডে ইউসুফ ‘স্যাটারডে নাইট লাইভ’-এ মামদানির ভূমিকায় অভিনয় করেন। কৌতুক অভিনেতা বোয়েন ইয়াং ইনস্টাগ্রামে নিজের একটি ছবি পোস্ট করেন, যেখানে তাকে “Zohran for Mayor” লেখা টি–শার্ট পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়। ২০১৮ সালে নিউইয়র্কের গভর্নর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা অভিনেত্রী সিনথিয়া নিক্সন দ্রুত ভোট দেওয়ার পর নিজের একটি ভিডিও পোস্ট করেন, যেখানে তিনি “মেধাবী, তরুণ” মামদানিকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। মামদানি মডেল এমিলি রাতাজকাউস্কির কাছ থেকেও প্রাথমিক সমর্থন পান, যিনি বহু উদারনৈতিক বিষয়ে মুখর।

জোহরান মামদানির প্রচার জাতীয় পর্যায়ে প্রগতিশীল নেতাদের সমর্থন পেয়েছে। সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ও নিউইয়র্কের কংগ্রেস সদস্য আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও–কর্টেজ প্রকাশ্যে তার পক্ষে প্রচারে অংশ নেন। নিউইয়র্কের প্রভাবশালী নেতা জেরি ন্যাডলার ও অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমসও জোহরানকে সমর্থন করেন। সেপ্টেম্বরে গভর্নর ক্যাথি হোকুল নীতিগত মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও মামদানির প্রতি তার সমর্থনের ঘোষণা দেন। নির্বাচনের কিছুদিন আগে প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যালঘু নেতা হাকিম জেফ্রিজও তাকে সমর্থন জানান।

সিএনএনের এক্সিট পোলের তথ্যানুসারে, ৩০ হাজার থেকে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৯ ডলার পর্যন্ত বার্ষিক আয় করা বেশির ভাগ প্রাপ্তবয়স্ক ভোটার মামদানিকে সমর্থন করেছেন। পাঁচ বছর বা তার কম সময় ধরে বসবাসকারী ভোটারদের মধ্যে ৮৫% তাকে ভোট দিয়েছেন। অখ্রিস্টান, অধার্মিক ও এলজিবিটিকিউ ভোটাররা মামদানিকে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী ছিলেন। যারা নিজেদের গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, তাদের ৮৫% মামদানিকে ভোট দিয়েছেন। পুরুষ ডেমোক্র্যাটদের ৭০% ও নারী ডেমোক্র্যাটদের ৬৩% মামদানিকে ভোট দিয়েছেন। পুরুষ রিপাবলিকানদের ৬% এবং নারী রিপাবলিকানদের ২% মামদানিকে ভোট দিয়েছেন। স্বতন্ত্র ভোটের প্রায় ৪৩% মামদানি জিতেছেন।

এই তথ্যগুলো থেকে বোঝা যায়, মামদানি প্রধানত তরুণ, নতুন বাসিন্দা, উদারমনা এবং অপেক্ষাকৃত নিম্ন-মধ্যম আয়ের ডেমোক্র্যাটদের কাছ থেকে শক্তিশালী সমর্থন পেয়েছেন, যারা জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে চিন্তিত ছিলেন।

অনেক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, এই ভোটারদের মধ্যে মামদানির সাফল্যের কারণ হলো ‘স্থিতাবস্থা’ চ্যালেঞ্জ করার বিষয়ে তার প্রচারণার বার্তা। যদি কোনো রাজনৈতিক প্রার্থী ‘স্থিতাবস্থা’ চ্যালেঞ্জ করার কথা বলেন, তার মানে তিনি বর্তমান প্রচলিত ব্যবস্থা, নিয়ম বা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর নীতিগুলো পরিবর্তন করতে চাইছেন। মামদানি তার ভাষণে দারিদ্র্যপীড়িত ভাড়াটিয়া, শ্রমিক, মধ্যবিত্ত ও অভিবাসীদের অধিকার বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন এবং বর্ণবাদ, ইসলামভীতি ও রাজনৈতিক বিভাজনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে তার ‘রেন্ট ফ্রিজ’ (ভাড়া নিয়ন্ত্রণ), ‘বাস ফ্রি’, শিশুদের জন্য সার্বজনীন শিশু–যত্ন সুবিধা এবং ধনীদের ওপর কর বাড়ানোর সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচি নিউইয়র্কবাসীদের আকৃষ্ট করেছে।

বিশেষ করে, নিউইয়র্ক শহরের জীবনযাপনের অবর্ণনীয় অবস্থা, আবাসন সংকট, বাড়িভাড়া বৃদ্ধির কারণে নিম্নবিত্ত মানুষ যখন অসহায় হয়ে পড়েছে, তখন জোহরান মামদানি নিউইয়র্ক শহরকে সাধারণ মানুষের বসবাসযোগ্য করার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি জনগণের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা বলেছেন, ঘরে ঘরে গিয়ে ভাড়া ও শিক্ষার খরচ বৃদ্ধির মতো বাস্তব প্রশ্ন তুলেছেন, যা জনগণকে আকৃষ্ট করেছে। মূলত মামদানি মানুষের নাড়ি বুঝতে পেরেছিলেন এবং তাদের মৌলিক চাহিদাগুলোকে তার নির্বাচনী এজেন্ডার কেন্দ্রে এনেছিলেন, যার ফলস্বরূপ এই ঐতিহাসিক বিজয় সম্ভব হয়েছে।

এছাড়াও, মামদানিকে ভোট দিলে ট্রাম্পের তহবিল বন্ধের হুমকি ও কুমোকে সমর্থন করার কারণে মামদানির সমর্থকরা, বিশেষ করে প্রগতিশীল ও বামপন্থী ভোটাররা, এটিকে নিউইয়র্কের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখতে শুরু করেন। এর ফলে তারা প্রতিবাদী হয়ে আরও বেশি সংখ্যায় মামদানিকে ভোট দেন। আমি দেখেছি, অনেক বাঙালি তাদের ফেসবুক পোস্টে প্রতিবাদ করে লিখেছেন, “ট্রাম্পের এই অনৈতিক ঘোষণার জবাব হলো মামদানিকে ভোট দিয়ে জয়ী করা।”

এই নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল ১৯৬০–এর দশকের পর সবচেয়ে বেশি, যা দেখায় নিউইয়র্কবাসীরা এই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত ছিল।

মামদানি যথেষ্ট সমর্থন পেয়েছেন নিউইয়র্কে বসবাসরত বাঙালি কমিউনিটি থেকেও। তাকে নিয়ে বাঙালি প্রবাসীরা সভা করেছেন, মিটিং করেছেন, প্ল্যাকার্ড হাতে দরজায় দরজায় গিয়ে ভোট চেয়েছেন। ফেসবুকে প্রচার করেছেন। শত শত, হাজার বাঙালি পথে নেমেছেন। তাদের মধ্যে একজনকে আমি দেখেছি, যিনি ফেসবুক লাইভে এসে বলেছেন, “Don't believe Trump’s threat—vote for Mamdani।” তিনি মানবাধিকারকর্মী কাজী ফৌজিয়া। এমন অসংখ্য বাঙালির অবদান রয়েছে মামদানির বিজয়ের পেছনে, যাঁদের নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না, সেজন্য ক্ষমাপ্রার্থী।

নিউইয়র্কের বাঙালি কমিউনিটির পক্ষ থেকে জোহরান মামদানির প্রতি যে জোরালো সমর্থন দেখা গেছে, তার প্রধান কারণগুলোর একটি ছিল অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও ‘ব্রেড অ্যান্ড বাটার’ ইস্যু। বাঙালি কমিউনিটির একটি বড় অংশ—বিশেষ করে কুইন্স ও ব্রুকলিনে বসবাসরত কর্মজীবী ও অভিবাসী শ্রেণি মামদানির গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক নীতির দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছেন।

মামদানির প্রচারের প্রধান ইস্যু ছিল নিউইয়র্ক সিটির জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো। বাঙালি ভোটাররা, যাদের অনেকেই নিম্ন-মধ্যম আয়ের বা কর্মজীবী, তাদের কাছে বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, দৈনন্দিন খরচ ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাড়া–নিয়ন্ত্রিত অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া স্থিতিশীল করার প্রস্তাব বাঙালি অভিবাসীদের মধ্যে ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিল। বিনামূল্যে বাস পরিষেবা ও নতুন সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন তৈরির মতো প্রতিশ্রুতি সরাসরি কর্মজীবী পরিবারগুলোর উপকার করবে বলে মনে করা হয়েছে।

এছাড়া, মামদানি একাধিক সংখ্যালঘু পরিচয় বহন করেন, যা কমিউনিটির সঙ্গে গভীর সংযোগ স্থাপন করেছে। মামদানি ভারতীয় বংশোদ্ভূত উগান্ডান অভিবাসীর সন্তান। তিনি প্রথম দক্ষিণ এশীয় পুরুষ হিসেবে নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলিতে নির্বাচিত হন। এই অভিবাসী ও দক্ষিণ এশীয় পরিচয় তাঁকে বাঙালি, ভারতীয় ও পাকিস্তানি কমিউনিটির সঙ্গে একাত্মতা তৈরি করতে সাহায্য করেছে।

মামদানি তার প্রচারে পথে পথে সভা–আলোচনায় বাংলা, হিন্দি–উর্দু ও স্প্যানিশে কথা বলার চেষ্টা করেছেন। কুইন্স ও ব্রুকলিনের বাঙালি (বাংলাদেশি–আমেরিকান) অধ্যুষিত এলাকায় বাংলায় প্রচার করা তাকে অন্য প্রার্থীর চেয়ে বেশি বিশ্বাসযোগ্য করেছে।

যদিও ট্রাম্পের মন্তব্যের কেন্দ্রে ছিল ইসরায়েল–ফিলিস্তিন ইস্যু, তবে মামদানির এই বিষয়ে কঠোর ফিলিস্তিন–সমর্থক অবস্থান মুসলিম ও বাঙালি অ্যাক্টিভিস্টদের অনুপ্রাণিত করেছে। এছাড়াও, বাঙালি কমিউনিটির উল্লেখযোগ্য অংশ মুসলিম হওয়ায়, একজন মুসলিম প্রার্থীর নেতৃত্ব (যেখানে তিনি মুসলিম ডেমোক্র্যাটিক ক্লাবের সদস্য) তাদের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও গর্বের অনুভূতি তৈরি করেছে।

তাছাড়া, বাঙালি কমিউনিটির কর্মজীবীদের সমস্যা সমাধানে মামদানির অতীত কর্মকাণ্ডও তাদের আস্থা অর্জন করেছে। নিউইয়র্কে ট্যাক্সিচালকদের মধ্যে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের একটি বড় অংশ রয়েছে। মামদানি ট্যাক্সিচালকদের ঋণ মকুবের দাবিতে অনশন ধর্মঘটে অংশ নিয়েছিলেন এবং তাদের অধিকারের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিলেন। এই কাজটি অভিবাসী শ্রমিকদের মধ্যে তার সমর্থন বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

জোহরান মামদানির এই বিজয় কেবল একটি নির্বাচনী ফলাফল নয়, এটি নিউইয়র্ক সিটি তথা বৃহত্তর আমেরিকান রাজনীতির জন্য একটি সতর্কবার্তা ও রাজনৈতিক কাঠামোর পুনঃসংজ্ঞা। এই জয়কে দুটি মূল দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা যায়: নতুন কোয়ালিশন ও প্রগতিশীল এজেন্ডার শক্তি, রাজনৈতিক বিরোধিতা ও স্থিতাবস্থা–বিরোধী প্রতিক্রিয়া।

মামদানি প্রমাণ করেছেন, ঐতিহ্যবাহী ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভিত্তি—যা প্রবীণ ও প্রতিষ্ঠিত ভোটারদের ওপর নির্ভরশীল।

—পরিবর্তনশীল ও ভঙ্গুর। তার সাফল্য নির্ভর করেছে একটি নতুন, শক্তিশালী বহু–সাংস্কৃতিক কোয়ালিশনের ওপর, যা তিনটি মূল স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত: ভবিষ্যতের কণ্ঠস্বর, অর্থনৈতিক মেরুকরণ ও নীতিগত সমর্থন। তরুণ ভোটার ও নতুন অভিবাসীরা তাকে তাদের আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছে।

মধ্যম ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন লাভ করে তিনি প্রমাণ করেছেন, ‘ব্রেড অ্যান্ড বাটার’ ইস্যু—বিশেষত সাশ্রয়ী বাসস্থান, রেন্ট ফ্রিজ ও শিশুযত্ন, স্বাস্থ্যসেবা জাতিগত পরিচয়ের চেয়েও বেশি কার্যকর রাজনৈতিক অস্ত্র। নীতিগতভাবে শক্তিশালী নেতাদের সমর্থন তাঁর ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট এজেন্ডাকে একটি জাতীয় বৈধতা এনে দিয়েছে।

তাছাড়া, রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি হলো ব্যাপক বিরোধিতার মুখেও তার জয়। ট্রাম্পের ফেডারেল তহবিল বন্ধের হুমকি, ‘ইহুদি বিদ্বেষী’ ও ‘বিশ্বব্যাপী জিহাদের সমর্থক’—এই ধরনের কট্টর আক্রমণ মামদানির জন্য ক্ষতিকর হওয়ার পরিবর্তে সহায়ক হয়েছে। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে তার দৃঢ় অবস্থান তাকে মুসলিম, আরব এবং ঐতিহ্যবাহী ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রতি অসন্তুষ্ট এক-তৃতীয়াংশ ইহুদি ভোটারের সমর্থন এনে দিয়েছে। মামদানির বিজয় নিউইয়র্কের রাজনীতির কেন্দ্রে ‘স্থিতাবস্থা’র শেষ ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে।

এই জয় একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়, ভবিষ্যতের সফল রাজনীতিককে অবশ্যই সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা ও জীবনযাত্রার মানকে তার এজেন্ডার কেন্দ্রে আনতে হবে এবং বহিরাগত চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে নতুন, প্রগতিশীল কোয়ালিশনের নেতৃত্ব দিতে হবে।
 

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন