https://www.prothomalony.com/

15268

north-america

উত্তর আমেরিকা

উত্তরের স্বাস্থ‍্য-সচেতনতা

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৫ ০২:২৪

ডাল: বাঙালির প্রিয় খাদ্য, শরীরের মিত্র

ভাতের পাশে এক বাটি ডাল যেন বাঙালির জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মসুর ডাল-মুগডালের গন্ধে দুপুরের ভাত হোক, কিংবা ছোলার ডালে ভাজা আলু-পরোটা-শুধু পেট ভরায় না, মনও ভরায়। কিন্তু জানেন কি, এই পরিচিত ডালই আসলে একটি সুপারফুড? ডাল, ছোলা, মটরশুঁটি ও মসুর-এই সব ডালজাতীয় খাবার শুধু স্বাদের নয়, পুষ্টির দিক থেকেও অসাধারণ।

ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ডায়েটিশিয়ান ট্রেসি পার্কার পালসেস বা ডালজাতীয় শস‍্যের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্যের জন্য উপকারিতা ব্যাখ্যা করেছেন, বিশেষ করে হার্টের জন্য এদের ভূমিকা, প্রোটিন ও ফাইবার সমৃদ্ধ হওয়া এবং পরিবেশবান্ধব হওয়া নিয়ে তিনি বলেন, "ডালজাতীয় খাবার, যেমন মটরশুঁটি, মসুর ডাল, মুগ ডাল, ছোলা-আপনার স্বাস্থ্যের জন্য দারুণ উপকারী, বিশেষ করে যদি আপনার হৃদরোগ থাকে। এই ডালজাতীয় খাবারগুলোতে প্রোটিন ও ফাইবার বেশি এবং চর্বি কম থাকে। দামেও সস্তা। এগুলো আপনার টাকা বাঁচাতে পারে, ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে এবং অন্ত্রের ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে পারে।"

 

ডালজাতীয় শস‍্য মূলত লেগিউমস পরিবারের সদস‍্য। দুটোর সামান‍্য পার্থক‍্য হল-ডালজাতীয় শস‍্য খাওয়ার আগে শুকানো হয়, যেমন-শুকনো মটরশুঁটি। আর তাজা মটরশুঁটি হলো লেগিউমস। তবে চিনাবাদাম ও সয়াবিন আলাদা, এ দুটো লেগিউমস শ্রেণিভুক্ত এবং এগুলোতে চর্বি বেশি ও শর্করা কম থাকে।

 

কেন খাদ্যতালিকায় ডালজাতীয় খাবার যোগ করবেন?

আপনি যদি আপনার মাংসের অর্ধেক বা পুরোটা ডালজাতীয় খাবার দিয়ে ভরাট করেন, তাহলে তা আপনাকে অস্বাস্থ্যকর স্যাচুরেটেড ফ্যাট কমাতে, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও হজমতন্ত্রকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করবে। এতে আপনি নিজেকে আরও ভালো অনুভব করবেন এবং হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকিও কমবে। ডালজাতীয় খাবার মাংসের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে, কারণ এতে প্রোটিন থাকে যা শরীরের কোষ মেরামতে প্রয়োজন। 

উদাহরণস্বরূপ, তিন চামচ ডালজাতীয় খাবারে প্রায় ৯ গ্রাম প্রোটিন থাকে, যা দৈনিক প্রয়োজনের প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ। এক টিন কিডনি বিনে যত প্রোটিন আছে, তা এক পরিবেশন গরুর কিমার সমান, অথচ এতে প্রায় কোনো চর্বি বা লবণ নেই। তবে অবশ‍্যয়ই লেবেল দেখে নিতে হবে। 

 

ডালজাতীয় খাবার: ফাইবারের চমৎকার উৎস

ডালজাতীয় খাবার হলো ফাইবারের অন্যতম সেরা উৎস। ট্রেসি বলেন, এক পরিবেশনে আপনি দিনের মোট প্রয়োজনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ফাইবার পেতে পারেন। ফলে এটি হৃদরোগ, স্ট্রোক, টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও অন্ত্রের ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। প্রোটিন ও ফাইবারের এই মিশ্রণ হজমকে ধীর করে, ফলে আপনি দীর্ঘ সময় পেটভরা অনুভব করবেন।

 

অনেকে বলে থাকেন, বিন ও ডালের প্রোটিন 'সম্পূর্ণ প্রোটিন' নয়। কিন্তু যদি আপনি বিভিন্ন উদ্ভিদ-ভিত্তিক খাবার খান-যেমন পূর্ণশস্য বা হোলগ্রেইন ও বাদাম-তাহলে শরীরের প্রয়োজনীয় সব অ্যামিনো অ্যাসিডই পাবেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ডাল এমন একধরনের খাদ্য যা একই সঙ্গে সবজি ও প্রোটিন-দুই শ্রেণিতেই পড়ে। তিন চামচ ডাল খাওয়া মানে আপনার দিনে পাঁচটি ফল‑সবজির যে পরিমাণ প্রয়োজন, তার একটি পূরণ হয়ে গেল। এতে রয়েছে আপনার শরীরের জন্য জরুরি পটাসিয়াম, জিঙ্ক, বি‑ভিটামিন এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। তবে ডালকে শুধু ওই পাঁচটির মধ্যে একটির হিসেবেই ধরা হয়, কারণ এতে অন্যান্য ফল ও সবজির মতো পুষ্টিগুণের একই মিশ্রণ নেই।

এর মানে এই নয় যে আপনাকে শুধু একবারই ডাল খেতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি যথেষ্ট পরিমাণে ফল‑সবজি, কিছু সম্পূর্ণ শস্য এবং দুগ্ধজাত বিকল্প খাবার নিচ্ছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত দিনের বিভিন্ন সময়ে আপনার খাবার ও নাস্তায় ডাল অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। 

 

সহজ উপায়ে ডালজাতীয় খাবার খাওয়ার উপায়

ডালজাতীয় খাবারকে প্রতিদিনের খাবারে যুক্ত করা খুবই সহজ। আপনি টিনজাত বিন বা ডাল কিনে সরাসরি খেতে পারেন। তবে নুনছাড়া বেছে নিন। দুপুরের সালাদে ক্যানেলিনি বা বাটার বিন, কিংবা সবুজ বা বাদামি ডাল যোগ করলে এটি আরও পুষ্টিকর হয়। টিন বা প্যাকেটজাত লেন্টিল ও বিন স্যুপও ভালো বিকল্প, শুধু খেয়াল রাখবেন যাতে এতে লবণের পরিমাণ কম থাকে। প্রিয় চিলি রান্নায় অতিরিক্ত কিডনি বিন যোগ করতে পারেন, এতে খাবারের প্রোটিন ও ফাইবার দুটোই বাড়বে। ফুড প্রসেসরে টিনজাত ছোলা দিয়ে কয়েক মিনিটেই ঘরে বানাতে পারেন সুস্বাদু হামাস-যা দোকান থেকে কেনার চেয়ে সস্তা ও স্বাস্থ্যকর। সবজি স্টিকের সঙ্গে হামাস খেতে পারেন, আবার স্যান্ডউইচে মাখনের পরিবর্তে ব্যবহার করতে পারেন। এমনকি বোলোনেজ(মাংস-টমেটো সসযুক্ত পাস্তা) রান্নায় মাংসের অর্ধেকের বদলে সবুজ বা বাদামি ডাল ব্যবহার করলেও স্বাদে ভিন্নতা আসবে, পুষ্টিও বাড়বে। 

 

তবে বেশি মাত্রায় বা ভুল প্রক্রিয়ায় ডাল খেলে হজমে সমস্যা হতে পারে। তাছাড়া, অনেক ডাল-ভিত্তিক স্ন্যাকসে লবণ ও চর্বি (ফ্যাট) অনেক বেশি থাকে। তাই খাবার কেনার সময় লেবেল ভালোভাবে পড়ে নিবেন, বিশেষ করে লাল ও হলুদ (অ্যাম্বার) রঙের "ট্রাফিক লাইট" চিহ্ন দেখে নিবেন, যা অতিরিক্ত লবণ বা চর্বির ইঙ্গিত দেয়। যতটা সম্ভব হোমমেড বা কম প্রক্রিয়াজাত বিকল্প বেছে নিন, আর অন্যান্য ফল ও সবজির সঙ্গে সুষম খাদ্য নিশ্চিত করতে ভুলবেন না। 

 

 

 

 

ডিজিটাল ডিটক্স: জীবনের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা 

আধুনিক জীবনে প্রযুক্তি আমাদের জীবনযাত্রার অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে, যার ফলে আমরা প্রায়ই অতিরিক্ত পরিমাণে স্ক্রিনের সামনে সময় কাটাই। এই অতিরিক্ত ব্যবহার থেকে বিরতি নেয়ার মাধ্যমে নিজের মন ও শরীরকে পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ করে দেয় ডিজিটাল ডিটক্স। ডিজিটাল ডিটক্স হলো প্রযুক্তি থেকে বিরতি নেওয়া-অর্থাৎ, স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ট্যাবলেট এবং সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার ইচ্ছাকৃতভাবে কমানো বা একেবারেই বন্ধ করার প্রক্রিয়া। 

এর মূল উদ্দেশ্য হলো ক্রমাগত অনলাইন সংযোগ ও স্ক্রিন ব্যবহারের চাপ থেকে বিরতি নেওয়া, নিজের মন ও শরীরকে পুনরুজ্জীবিত করা, বাস্তব জীবনের দায়িত্ব ও সম্পর্কগুলোর ওপর মনোযোগ দেওয়া এবং জীবনের ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করা।

 

ডিজিটাল ডিটক্সের এক বড় সুবিধা হলো মানসিক চাপ এবং উদ্বেগ কমানো। সোশ্যাল মিডিয়া প্রায়ই অজান্তে চাপ ও উদ্বেগ সৃষ্টি করে।নিজেকে নিখুঁতভাবে উপস্থাপনের চাপে আমরা মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। কিছু সময় দূরে থাকলে আমরা এসবের প্রভাব বুঝে সম্পর্কটা নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারি। প্রযুক্তি থেকে কিছুটা সময় দূরে থাকা-যেমন রাতে কাজের ইমেইল না দেখা বা বারবার সোশ্যাল মিডিয়া না চেক করা, ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।

আমাদের মস্তিষ্ক ক্লান্ত হলে মেলাটোনিন নামের একটি রাসায়নিক উৎপাদন করে, যা ঘুমে সাহায্য করে। কিন্তু ফোনের উজ্জ্বল পর্দা মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে এবং মেলাটোনিনের মাত্রা কমিয়ে দেয়, ফলে ঘুম আসতে দেরি হয়। তাই শোবার আগে ফোন বা ট্যাবলেট থেকে বিরতি নিলে ঘুম আরও ভালো হয়। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিজের জন্য সময় বের করা। স্ক্রিন থেকে দূরে থাকলে মানুষ তার শখের কাজ, পড়াশোনা, শরীরচর্চা কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে পারে, যা ব্যক্তিগত সুরক্ষা ও পুনরুজ্জীবনে বড় ভূমিকা পালন করে।

 

ডিজিটাল ডিটক্সের জন্য কয়েকটি কার্যকর পদ্ধতি রয়েছে। প্রথমত, স্পষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা উচিত, যেমন প্রথমে আধা দিন বা এক দিন ডিজিটাল ডিভাইস থেকে বিরতি নেওয়া। ধীরে ধীরে সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, ডিটক্সে যুক্তির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ লক্ষ্য নির্ধারণ করা জরুরি। কেউ পুরোপুরি ডিভাইস ব্যবহার বন্ধ করতে পারেন, আবার কেউ শুধু সোশ্যাল মিডিয়াতে সময় সীমিত করতে পারেন। স্মার্টফোনে এখন স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণের টুলসও উপলব্ধ, যা ব্যবহার করে নির্দিষ্ট অ্যাপসের ব্যবহার কমানো যায়। তৃতীয়ত, ডিটক্সের সময় নিজের খালি সময় ভালোভাবে কাজে লাগানো যায়, যেমন প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো, নতুন কোনো কিছু শেখা বা আবিস্কার করা, শরীরচর্চা করা। এগুলো ডিভাইস থেকে দূরে থাকার প্রলোভন কমায় এবং মস্তিষ্ককে মুক্ত রাখে।

তবে, ডিটক্সের সময় অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা ডায়েরিতে লিখে রাখা ভালো, যা পরবর্তী ডিটক্সে সাহায্য করে। এটি ডিভাইসের প্রতি আসক্তির প্রকৃতি বুঝতে সাহায্য করে এবং নিজেকে আরও ভালোভাবে পরিচালনা করার উপায় দেয়।

 

সুতরাং, ডিজিটাল ডিটক্স শুধুমাত্র প্রযুক্তি থেকে বিরতি নয়, এটি একটি সুযোগ নিজের জীবন, মন ও শরীরের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার জন্য। ডিটক্সের মাধ‍্যমে আমরা  দৈনন্দিন জীবনে স্ট্রেস কমাতে পারি, সম্পর্ক উন্নত ও ব্যক্তিগত উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারি। তাই ডিটক্সে নিয়মিত অন্তত কয়েক ঘণ্টা বা দিন ব্যয় করা একটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস হিসেবে গড়ে তোলা যায়। 

 

 

শিশু বুলিং: অভিভাবকদের করণীয়  

 

বুলিং হলো এক ধরনের অপ্রত্যাশিত ও আক্রমণাত্মক আচরণ, যার মাধ্যমে কাউকে শারীরিক বা মানসিকভাবে অপদস্থ করা হয়। অর্থাৎ কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে অপমান, হেয করা, কটুক্তি বা শারীরিক আঘাত দেওয়া। অনেকে মজার ছলেও বুলিং করে এবং এটি অনেক ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র অপমানের মাধ্যমে শুরু হয় এবং পরে তা ঘৃণ্য ও মনোরোগজনিত সমস্যায় পরিণত হতে পারে। সাধারণত স্কুলের শিশুরা বুলিংয়ের শিকার হয় বেশি, তবে এটি যেকোনো বয়সের লোকের ক্ষেত্রেই ঘটতে পারে। তাছাড়া, সাইবার বুলিং এখন এক জনস্বাস্থ‍্য সঙ্কটে পরিণত হয়েছে। 

 

সংক্ষেপে বলতে গেলে, শিশুরা কেন বুলিং করে-এর পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকে। ‌অনেক শিশুরা বুলিং এর মাধ‍্যমে নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার প্রকাশ ও আধিপত‍্য বিস্তার করতে চায়। অনেক সময় পরিবারে বা সমাজে অবহেলা বা মানসিক আঘাতের শিকার শিশুদের বুলিং প্রবনণতা বাড়ায়। এই শিশুরা সাধারণত নিজেদের ভেতরের অনিরাপত্তা, হতাশা বা ক্রোধ প্রকাশের জন্য এ ধরনের আক্রমণাত্মক আচরণ করে। এছাড়াও, বন্ধুবাহিনীর প্রভাব থেকেও অনেক সময় বুলিং হয়ে থাকে। 

 

বুলিংয়ের মানসিক ক্ষতি অত্যন্ত গুরুতর। গবেষণায় দেখা যায়, বুলিংয়ের শিকার শিশুরা সাধারণত বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসের অভাব, একাকিত্ব এবং পড়াশোনায় মনোযোগের অভাবের শিকার হয়। কিছু ক্ষেত্রে বুলিং দীর্ঘমেয়াদী মানসিক সমস্যায় পরিণত হয়, এমনকি স্কুল ড্রপ সহ আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা যায়। শিশুরা পরিবার ও সমাজ থেকে দূরে সরে যেতে পারে, সামাজিক সম্পৃক্ততা হারাতে পারে এবং মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই বুলিং নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে কেবল অভিভাবকই নন, বরং শিক্ষকদের সজাগতা ও সহায়তা অপরিহার্য।

 

বুলিং প্রতিরোধে অভিভাবকদের করণীয়

বাবা-মা হিসেবে আমরা চাই আমাদের সন্তানরা যেন নিরাপদে বেড়ে ওঠে এবং বুলিংয়ের বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষার উপায় শিখে। বুলিং প্রতিরোধের জন্য শুধু শিশুর একার দায়িত্ব নয়, অভিভাবকসহ সবার উদ্যোগ প্রয়োজন। 

বুলিং প্রতিরোধে এখানে কিছু মূল বিষয় রয়েছে যা আপনি আপনার সন্তানের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন:

 

১. বুলিং কী তা বোঝানো  

খোলামেলা আলোচনা করুন। প্রথমে আপনার সন্তানকে স্পষ্ট করে বুলিং সম্পর্কে ধারণা দিন। তাকে বলুন যে, অন্য কারও গায়ে হাত তোলা, কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে কটাক্ষ করা বা কষ্ট দেওয়া-ভয় দেখানো কখনোই মজার বিষয় বা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অনুরূপ বুলিং গ্রহণ করে নেয়াও ঠিক নয়। 

 

২. বুলিং মোকাবেলা শেখানো  

 বুলিং-এর শিকার হলে শিশুকে শান্ত, দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী থাকতে বলুন। বুলিংকারীর কথায় ভয় না পেয়ে বা পাল্টা আক্রমণ না করে যেন দৃঢ়ভাবে চোখে চোখ রেখে বলে, "থামো" বা "এটা করো না।" পরিস্থিতি বিপজ্জনক হলে যেন নিরাপদে সরে আসে এবং প্রাপ্তবয়স্ক কাউকে জানায়। বুলিংকারীর প্রতিক্রিয়া এড়িয়ে চলা জরুরি। 

 

৩. অন্যকে বুলিং হতে দেখলে করণীয়  

‌শেখান, অন‍্য কেউ বুলিং এর শিকার হলে ভিকটিমের একা না রেখে সহযোগিতা করা দরকার। তবে নিজেকে আগে নিরাপদ রাখতে হবে। এক্ষেত্রে দ্রুত শিক্ষক, অভিভাবক, কোচ বা অন্য প্রাপ্তবয়স্ককে জানানো উচিত। ওই মুহূর্তে উদ্বেগপূর্ণ কথা না বলে বরং বুলিং এর শিকার শিশুটির হাত ধরা-উপযুক্ত হবে যেন ভিকটিম বুঝে যে, সে তার পক্ষে আছে।

 

৪. বুলিং করা ও শিকার হওয়া শিশুদের বোঝা  

বুলিং-এর শিকার হওয়া শিশুরা কখনো ভীত, একাকী ও আত্মবিশ্বাসে ঘাটতিযুক্ত হতে পারে। তারা মনে করে যে তারা দুর্বল বা তাদের কোনো ভুল আছে, ফলে তারা নিজেদের কথা সহজে প্রকাশ করতে পারে না। কখনো পরিবারে শিশুরা স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ পায় না। 

এমন পরিস্থিতিতে, সহায়তার অভাব এবং নিরাপত্তা বোধের অভাবের কারণে তাদের মানসিক দুর্বলতা আরও বাড়ে। অন্যদিকে, যারা বুলিং করে তারাও আঘাতপ্রাপ্ত বা অবহেলিত হতে পারে। কাজেই উভয় ক্ষেত্রেই সহমর্মিতা ও মানসিক সহায়তা প্রয়োজন।

 

৫. মানসিক স্থিতিস্থাপকতা ও আবেগিক বুদ্ধিমত্তা গড়ে তোলা  

বুলিং মোকাবেলায় বাইরের চাপ সামলাতে শিশুর মানসিক স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে শিশুর আবেগকে গুরুত্ব দিন ও বুঝুন। আপনার সন্তানকে শেখান কীভাবে তার রাগ, ভয় বা হতাশা চিহ্নিত করতে হয়। তাদের অনুভূতি চেপে না রেখে গঠনমূলক উপায়ে প্রকাশ করতে উৎসাহিত করুন। 

সেইসাথে সমাধানের দক্ষতা বাড়ান, যেমন-কোনো খারাপ পরিস্থিতিতে স্থান ত্যাগ করা বা শান্ত থাকা। আপনার সন্তানের গুণাবলী ও শক্তিমত্তার প্রশংসা করুন, যাতে সে বুলিংকারীর কথায় নিজের মূল্য নিয়ে বিভ্রান্ত না হয়। 

 

৬. সাইবার বুলিং ও নিরাপত্তা  সম্পর্কে সচেতনতা

শিশুর অনলাইন কার্যক্রম নজর রাখুন, আপনার সন্তান কোন অ্যাপ ব্যবহার করছে বা অনলাইনে কার সাথে যোগাযোগ করছে, তা জানুন। তবে, এটি যেন কঠোর নজরদারি না হয়ে একটি খোলামেলা আলোচনার বিষয় হয়। অনলাইনে অযাচিত বা বেদনাদায়ক কোনো মন্তব্য পেলে কী করতে হবে, তা স্পষ্ট করে বোঝান। সাইবার বুলিং হলে তা ব্লক ও রিপোর্ট করতে শেখান এবং ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার না করতে সতর্ক করুন। 

 

৭. দোষারোপ নয়, আশ্বাস দিন

শিশু বুলিংয়ের শিকার হলে শান্তভাবে শুনুন, বিশ্বাস করুন ও সমর্থন দিন। ভুল হতে পারে ভেবে তার কথাকে উড়িয়ে দেবেন না। তার অনুভূতি প্রকাশের জন‍্য একটি নিরাপদ ও চাপমুক্ত পরিবেশ তৈরি করুন। সন্তানকে আতঙ্কিত হতে দেখলে আপনি নিজে শান্ত থাকুন, আবেগপ্রবণ না হয়ে সহানুভূতি দেখান। কখনও সন্তানকে দোষারুপ করবেন না, জিজ্ঞাসা করবেন না, "তুমি এমন কী করেছিলে যে সে তোমাকে বিরক্ত করল?" বরং তাকে নিশ্চিত করুন যে বুলিং করাটা ভুল, বুলিং-এর শিকার হওয়াটা ভুল নয়। 

 

৮.স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ

যদি আপনার সন্তান বুলিং-এর শিকার হয়, তবে সম্ভবত সেই স্কুলের অন্যান্য শিশুরাও একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে  স্কুল কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করুন এবং বুলিং বন্ধ করার জন্য সাহায্য চান। 

 

বুলিং বন্ধ করার ক্ষেত্রে সবারই ভূমিকা রয়েছে। বুলিং বন্ধ করার জন্য দৃঢ় অবস্থান নিন এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। যদি বুলিং-এর আচরণ পুনরাবৃত্তি হতে থাকে এবং আপনার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তবে একজন স্কুল কাউন্সেলর বা থেরাপিস্টের পেশাদার সাহায্য নিন। এই আচরণ প্রায়শই হতাশা, উদ্বেগ বা মনোযোগের সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।
 

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন