https://www.prothomalony.com/

15063

north-america

উত্তর আমেরিকা

গাজার ধ্বংস ও শান্তির প্রত্যাশা: একটি মানবিক আহ্বান

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৫ ০০:২৫

গাজা — সেই শব্দটি আজ এক পীড়া আর কান্নার প্রতিচ্ছবি হয়ে রইল। ধ্বংসস্তূপ, অভাব, মৃত্যু আর শোক—সেসবের মাঝে জীবনের শেষ চেয়েও ছোট্ট উপলব্ধি হলো, শান্তির একটি সম্ভাবনা এখনও বেঁচে আছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইস্রায়েলের ওপর যে আক্রমণ হয়েছিল, তার পর থেকে গাজা সংকটে জর্জরিত। প্রতিনিয়ত বুকে বোমা গড়িয়ে আসে, ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়, মানুষ তারা চলাচল করতে পারে না, হাসপাতাল ও স্কুল বাঁচিয়ে রাখতে পারে না। হাসপাতালে ওষুধ নেই, বিদ্যুৎ নেই, পানি জীবনদায়ী করার মতো পরিমাণে নেই। গাজার মানুষরা খাবার ও জীবনের বেসিক অধিকার পায় না।

গাজাতে মৃত্যুর সংখ্যা এতটাই বাড়েছে যে, ৬৭,০০০-এরও বেশি ফিলিস্তিনিকে মারা গিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরবাড়ি নির্ধারক সংখ্যক, এবং অনেক এলাকা এমন হয়েছে যেখানে বাস করা একসময় স্বাভাবিক ছিল, আজ সেসব এলাকা এক বিশাল ধ্বংসকূপে পরিণত।

নাসের হাসপাতাল একটি মর্মস্পর্শী উদাহরণ। খান ইয়ুনিসে অবস্থিত এই হাসপাতাল বহুদিন ধরেই যুদ্ধের শিকার। হাসপাতালে রোগীরা, আহত মানুষরা নিরুপায় হয়ে সেখানে আশ্রয় নেন। বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সাপ্লাইস্থিতি প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

এ অবস্থায় যখন গাজার জনগণ সবচেয়ে বেশি হাহাকার করছে, তখনই বিশ্ব কণ্ঠ স্বর তুলে শান্তির কথা বলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি একটি “প্রথম ধাপ” ভেস্তা দিচ্ছেন যা গাজায় যুদ্ধবিরতি ও বন্দিদের বিনিময় ও মানবিক সহায়তার প্রবাহশীলতা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা।  ইস্রায়েল ও হামাস উভয়ই এ ধরনের একটি ব্যবস্থায় অংশ নিতে সম্মতি দিয়েছে বলে খবর এসেছে। ইস্রায়েল ইতিমধ্যেই তার সংসদে ওই পরিকল্পনার রূপরেখা অনুমোদন করেছে।
ট্রাম্পের পরিকল্পনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ২০ জন জীবিত ইস্রায়েলিদের বন্দিদের মুক্তি এবং প্রায় ২,০০০ ফিলিস্তিনি বন্দির মুক্তি বিনিময়। এছাড়া ইস্রায়েলকে গাজা থেকে তার কিছু সৈন্য প্রত্যাহার করতে হবে এমন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

এমন এক ধাপে যুদ্ধবিরতিই প্রকৃত শান্তির শুরুর দিক হতে পারে। কিন্তু শান্তি শুধু যুদ্ধবিরতি নয়। যুদ্ধবিরতির পর গাজার অবস্থা দ্রুত ঠিক করা প্রয়োজন—মানবিক সহায়তা প্রবাহ, পুনর্বাসন, হাসপাতাল ও স্কুল পুনর্গঠন, প্রশাসনিক পরিষ্কার ও নিরাপত্তা।

ট্রাম্প পরিকল্পনায় একটি “প্রযুক্তিবিদ-নির্ভর প্রশাসনিক কমিটি” গঠন করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে কাজ করবে। এই কমিটি প্রথমে গাজার প্রশাসନ হস্তান্তর করবে, এবং পরে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে পুনরায় দায়িত্ব দেওয়া হবে শর্তসাপেক্ষে। পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, হামাস গাজাতে শাসন থেকে বাদ যাবে, অর্থাৎ রাজনৈতিক শক্তি হ্রাস পাবে। তবে হামাস তার অস্ত্র সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট নোনতা জানিয়েছে।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই বলেছে তারা এই প্রকল্প সফল করতে প্রস্তুত।  কিন্তু ইস্রায়েল নেতারা এখনও নিরাপত্তার বিষয়ে কঠোর দাবি তুলেছে—হামাস থেকে সন্ত্রাসীর পুনরুত্থান রোধ, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার দৃঢ়তা।

গাজার সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে, এই পরিকল্পনাগুলো অনেক বড় আশা জাগিয়ে দিয়েছে। যুদ্ধবিরতির দিক থেকে ইতিমধ্যে তিন দিন ধরে শান্তি বজায় আছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। লাখো গাজাবাসী সতর্কভাবেই ফিরে যাচ্ছে ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকায়, মৃতদের খোঁজ নিচ্ছে ধ্বংসস্তূপ থেকে। রাস্তা ও ভবন ধ্বংসপ্রায়, বিস্ফোরক অবকাঠামোই এখন ঝুঁকি।

তবে শান্তি ও পুনরুদ্ধার পথ বেশ ব্যাথার। পূর্ব ধ্বংস এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এত বেশি যে, শুধু ধ্বংস মুছতে সময় লাগবে। জীবনের মৌলিক সুবিধা—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানিস্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ—সবকিছুই ধ্বংসপ্রাপ্ত। পানি ও নিকাশীর ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে গেছে।
বাংলাদেশের পাঠকদের কাছে এই গাজার করুণ চিত্র যেন সামনে আসে একটি আক্ষেপের শীলারে—সেই শৈশব, স্কুল, মানুষের হাসি, জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ আজ ধ্বংসপ্রধান। আমাদের দেশের মানুষকে সেই ভেদ অনুভব করতে হবে। গাজার শিশুরা, গাজার মা, গাজার বৃদ্ধ—তারা আজ সে দ্বিমুখী যুদ্ধে নির্ভরহীন।

আমরা প্রবাসের বাংলাদেশিরাও নীরব থেকে যেতে পারি না। একটি ন্যায্য মানবিক সঙ্কটে আমাদের কণ্ঠ দেওয়া উচিত। শান্তির প্রতি প্রত্যাশা আমরা ব্যক্ত করতে পারি। আমাদের অনুরোধ হোক—রাষ্ট্রগুলো একসঙ্গে কাজ করুন; রাষ্ট্রহীন শান্তি ও স্থায়ী সুরক্ষা নিশ্চিত করুন।

গাজা শুধু ইতিহাস নয়—একটি জীবিত মানবিক কারণ। ট্রাম্পের উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক সমর্থন, ফিলিস্তিনি অংশগ্রহণ সব মিলিয়ে আজ একটি দরজা খুলেছে। যদি দরজা খোলা থাকে আমরা সেই সুযোগকে সজাগ রাখতে পারি। শান্তি যেমন একটি শব্দ, তেমনি একটি প্রতিজ্ঞা—যেখানে গাজা নতুন আলো দেখবে, মানুষ নতুন স্বপ্ন রচনা করবে, এবং ইতিহাস নতুন অধ্যায় লিখবে।
 

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন