https://www.prothomalony.com/
14711
north-america
নেপালে সরকারের বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতি-বিরোধী আন্দোলন রীতিমতো ‘জনরোষে’র রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে দেশটির তরুণ প্রজন্ম, অর্থাৎ ‘জেন-জি’দের নেতৃত্বে এই আন্দোলন এখন ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। সরকারের সিদ্ধান্তে একযোগে ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার পর আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। বিক্ষোভ, সংঘর্ষ, কারফিউ, প্রাণহানি—সব মিলিয়ে নেপাল এখন এক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি।
সোমবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানী কাঠমান্ডুর বাণেশ্বর এলাকা থেকে এই বিক্ষোভ শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই তা পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়ে। সরকারের কঠোর অবস্থানের মুখেও দমে যায়নি তরুণদের ক্ষোভ। বরং পুলিশি দমননীতি পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে।
বিক্ষোভ ঠেকাতে সরকারের তরফ থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয় ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব, এক্সসহ ২৬টি জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এর প্রতিবাদেই রাস্তায় নেমে আসে হাজার হাজার তরুণ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ রাবার বুলেট, টিয়ার গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। সংঘর্ষে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত অন্তত ২০ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এক তরুণ বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণভাবেই আন্দোলন করছি। কিন্তু আমাদের দাবি অগ্রাহ্য করে সরকার উল্টো আমাদের দমন করছে। তবুও আমরা জয়ী।
অবশ্য চাপে পড়ে সোমবার সন্ধ্যায় সকল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আবার চালু করে সরকার। প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠক ডাকেন এবং পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। নিরাপত্তা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হওয়ায় বাতিল করা হয় বাংলাদেশ-নেপালের মধ্যকার নির্ধারিত ফুটবল ম্যাচটিও।
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাজধানী কাঠমান্ডুর বিভিন্ন এলাকায় কারফিউ জারি করে প্রশাসন। দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কারফিউ কার্যকর ছিল। প্রথমে কেবল বাণেশ্বর এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে তা বাড়িয়ে প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন ‘শীতল নিবাস’, ভাইস প্রেসিডেন্টের বাসভবন ‘লায়নচাওর’, প্রধানমন্ত্রী ভবন ‘বলুয়াটার’, সিংহ দরবারসহ বেশ কয়েকটি এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয়।
কর্তৃপক্ষ জানায়, আন্দোলনকারীরা সুরক্ষিত এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করায় এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তবে ট্যুরিস্ট এলাকা থামেলে সেভাবে আন্দোলনের প্রভাব পড়েনি।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (NHRC) পুলিশের গুলিবর্ষণ ও অতিরিক্ত বল প্রয়োগের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ গণতান্ত্রিক অধিকার। সরকার এবং আন্দোলনকারীদের উভয়পক্ষকেই সহনশীল থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে কাঠমান্ডু পোস্ট-এর সিনিয়র ফটোসাংবাদিক দীপেন শ্রেষ্ঠা বলেন, এই আন্দোলন নতুন কিছু নয়। তরুণরা দীর্ঘদিন ধরেই সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলছে। এবার শুধু সেই ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়েছে। তিনি আরও জানান, সরকার প্রথমে পার্লামেন্টের সামনে আন্দোলনের অনুমতি দিলেও, বিক্ষোভকারীরা ভবনে প্রবেশ করলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। তাতেই হতাহতের ঘটনা ঘটে।
আন্দোলনের পেছনে অন্যতম সংগঠন ‘হামি নেপাল’। তারা ২০১৫ সাল থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করছে। এবার সংগঠনটির ডাকে দেশজুড়ে একযোগে আন্দোলন শুরু হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আয়ুষ বাস্যাল বলেন, দুর্নীতির অনেক অভিযোগ শুনি, পার্লামেন্টে আলোচনা হয়, কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেই। সরকারি কর্মকর্তারা বিলাসী জীবন যাপন করছেন। আর আমরা চাকরি পাচ্ছি না, মত প্রকাশ করতে পারছি না। এটা কেমন শাসন?
আন্দোলনের আরেকটি বড় কারণ সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করা। সরকার বলেছে, এগুলোকে নিবন্ধন করতে হবে এবং দেশীয় প্রতিনিধি নিয়োগ দিতে হবে। তবে মেটা, গুগল, এক্স, রেডিট, লিংকডইন কেউই সেই সময়সীমার মধ্যে আবেদন করেনি। এরপরই কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়, যা তরুণ সমাজের মধ্যে আগুন ঢেলে দেয়।
সরকারি এই সিদ্ধান্তের সমালোচনায় মুখর হয়েছেন শিক্ষাবিদরাও। পোখারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক যোগ রাজ লামিচানে বলেন, এই আন্দোলন কেবল সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে নয়। এটা তরুণদের বঞ্চিত হওয়ার, অবহেলার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া। তারা এখন জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার চায়।
প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির সাম্প্রতিক মন্তব্য— মানুষ নিজেরাই স্বাধীন না, চিন্তাও স্বাধীন না, আবার স্বাধীনতার কথা বলছে। তার এই বক্তব্যকে ঘিরেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায় তরুণরা। তাদের মতে, এটা সরাসরি তরুণদের অপমান এবং ক্ষমতাসীন সরকারের স্বৈরাচারী মানসিকতার প্রমাণ।
নেপালের ইতিহাসে এমন একত্রিত ও ব্যাপকভাবে সংগঠিত তরুণদের আন্দোলন সাম্প্রতিক সময়ে আর দেখা যায়নি। কোথায় গিয়ে শেষ হবে এই ‘জেন-জি ঝড়’, সে প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে। তবে তরুণরা বলছেন, এইবার থামবে না, বদল আসবেই।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন