https://www.prothomalony.com/

14546

north-america

উত্তর আমেরিকা

সামাজিক মাধ্যমে কাদাছোড়াছুড়ি : বিভক্ত কমিউনিটির দুঃসহ বাস্তবতা

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৫ ০১:০৪

প্রবাসী সমাজ মানেই একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা। আমরা যারা বিদেশের মাটিতে জীবন গড়ছি, তাদের জন্য কমিউনিটি শুধু সাংস্কৃতিক পরিচয়ের আশ্রয় নয়—এটি হলো আত্মপরিচয় বাঁচিয়ে রাখার লড়াই, সহযোগিতা আর পারস্পরিক আস্থার জায়গা। অথচ সেই কমিউনিটিই আজ প্রায়শই ভেঙে যাচ্ছে, বিভক্ত হচ্ছে—আর তার বড় কারণ হয়ে উঠেছে সামাজিক মাধ্যমে কাদাছোড়াছুড়ি।

ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব কিংবা টিকটক—এই মাধ্যমগুলো একসময় প্রবাসীদের সংযোগের সেতুবন্ধন তৈরি করেছিল। দূর-দূরান্তের বন্ধুদের খবরাখবর, কমিউনিটির অনুষ্ঠান প্রচার, মানবিক উদ্যোগের ডাক—এসব কিছুই সহজ করে দিয়েছিল এই প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু ধীরে ধীরে একই সামাজিক মাধ্যম হয়ে উঠছে বিভক্তির অগ্নিগর্ভ মঞ্চ। গঠনমূলক আলোচনা কিংবা মতবিনিময়ের পরিবর্তে এখানে এখন শুরু হয় ব্যক্তি আক্রমণ, অপমান, চরিত্র হনন, এবং রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি।

সমালোচনা গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। ভুলত্রুটি চিহ্নিত করা, নেতৃত্বকে জবাবদিহির মধ্যে আনা—এসব স্বাস্থ্যকর সমালোচনার অংশ। কিন্তু যখন সমালোচনা রূপ নেয় বিদ্বেষে, তখন তার পরিণতি হয় ভয়াবহ। সামাজিক মাধ্যমে আজ আমরা দেখছি—একজনের মতের সাথে দ্বিমত হলেই শুরু হচ্ছে বিষোদগার। প্রতিপক্ষকে ছোট করা, পারিবারিক বিষয় টেনে আনা, অশ্লীল ভাষা ব্যবহার—সবকিছু যেন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এ ধরনের আচরণে ব্যক্তির ক্ষতি যেমন হয়, তেমনি সামগ্রিক কমিউনিটি হয়ে পড়ে বিভক্ত ও দুর্বল।

কমিউনিটি যদি বিভক্ত হয়, তার প্রথম ধাক্কা লাগে সাধারণ মানুষের ওপর। যখন দু’টি সংগঠন পরস্পরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তখন সমাজসেবামূলক কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বঞ্চিত হয় অসহায় মানুষ, পিছিয়ে যায় যৌথ উদ্যোগ। একপক্ষ অন্যপক্ষকে নস্যাৎ করতে গিয়ে বাস্তব কাজের চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করে সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও বানানো বা স্ট্যাটাস দেওয়ায়। এর ফলে হারিয়ে যায় আস্থা, বেড়ে যায় সন্দেহ। প্রজন্মের কাছে তৈরি হয় বিভ্রান্তি—তারা ভাবে, এই প্রবাসী নেতৃত্ব মানেই কেবল ব্যক্তিস্বার্থের লড়াই।

আমাদের সন্তানরা, যারা এই দেশে জন্ম নিয়েছে বা বড় হচ্ছে, তারা সামাজিক মাধ্যমেই দেখে আমাদের কার্যক্রম। কিন্তু যখন তারা দেখে, কমিউনিটির নেতারা নিজেদের মধ্যে কাদা ছুড়ছে, তখন তাদের কাছে এ সমাজ হয়ে ওঠে অবিশ্বাস্য। তারা প্রশ্ন তোলে—এমন বিভক্তির মধ্যে থেকে সমাজসেবা বা ঐক্যের শিক্ষা কীভাবে পাওয়া যাবে? এভাবে ধীরে ধীরে তাদের আগ্রহ কমে যায় কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার। এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হলো প্রজন্মের বিচ্ছিন্নতা।

এই বিভক্তি থেকে উত্তরণের উপায় কি নেই? নিশ্চয়ই আছে। প্রথমত, আমাদের বুঝতে হবে সামাজিক মাধ্যম একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম। এখানে যে কোনো বক্তব্য প্রকাশের আগে ভাবতে হবে—এটি ব্যক্তিগত আক্রমণ নাকি সমাজের কল্যাণে গঠনমূলক সমালোচনা। দ্বিতীয়ত, আমাদের মধ্যে **কোড অব কন্ডাক্ট** তৈরি হওয়া জরুরি। অর্থাৎ কমিউনিটি নেতারা ও সংগঠনগুলো একসঙ্গে বসে একটি নীতিমালা তৈরি করতে পারেন, যেখানে স্পষ্ট বলা থাকবে—কোনো ব্যক্তি আক্রমণ বা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রকাশ করা যাবে না।

তৃতীয়ত, মধ্যস্থতা ও সংলাপের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে। মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু সেটি আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসা করা উচিত। অপমান আর অবিশ্বাস নয়—বরং সংলাপই হবে বিরোধ মেটানোর পথ।

চতুর্থত, নতুন প্রজন্মকে যুক্ত করা জরুরি। তাদের চিন্তাভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের থেকে আলাদা। তারা প্রযুক্তি-সচেতন, তারা ভিন্নভাবে সমস্যার সমাধান খুঁজতে জানে। যদি তাদের নেতৃত্বে আনা যায়, তাহলে হয়তো সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার হবে আরও ইতিবাচকভাবে।

কমিউনিটি মানে হলো একে অপরের পাশে দাঁড়ানো, আনন্দ-দুঃখ ভাগাভাগি করা। সামাজিক মাধ্যমে আমরা যদি একে অপরকে কেবল আঘাত করি, তাহলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। মানবিক উদ্যোগ থেমে যাবে, নতুন প্রজন্ম বিমুখ হবে, আর প্রবাসী সমাজ হারাবে তার শক্তি।

তাই আজ প্রয়োজন আত্মসমালোচনা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ। মতভেদ থাকবে, সমালোচনাও হবে, কিন্তু সেটি হোক মর্যাদাপূর্ণ ও গঠনমূলক। কাদাছোরা ছুড়ি নয়—আমাদের হাতে থাকুক সহযোগিতা আর ভালোবাসার হাত। তাহলেই প্রবাসী সমাজ সত্যিকারের শক্তিতে পরিণত হবে, বিভক্ত নয়—ঐক্যবদ্ধ সমাজ গড়ে উঠবে।
 

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন