https://www.prothomalony.com/

14404

north-america

উত্তর আমেরিকা

মিশিগানে নির্বাচনী জালিয়াতি: প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সতর্কবার্তা

প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৫ ০৯:০২

মিশিগানের হ্যামট্রামিক শহরে নির্বাচনী জালিয়াতির অভিযোগে দুই বাংলাদেশি আমেরিকান কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে—একটি খবরে নতুন করে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির মাঝে চিন্তার ছায়া নেমে এসেছে। সম্প্রতি পেনসিলভেনিয়ার মিল্বর্ন শহরে দুই বাংলাদেশি আমেরিকানকে একই অভিযোগে দণ্ড দেয়া হয়েছে এবং এর আগেও নিউজার্সির প্যাটার্সনে বাংলাদেশি প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অনুরূপ অভিযোগ উঠেছে। এই সব খবর শুধু আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, সামাজিক ও নৈতিক দিক থেকেও প্রবাসী কমিউনিটির জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ।

প্রথমেই বলতেই হবে, যুক্তরাষ্ট্রের মত বহুজাতিক ও বহুজাতিকতা সমৃদ্ধ দেশেও নির্বাচনে জালিয়াতি ঘটতে পারে, এটা নতুন নয়। অনেক সময়ই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, ভিন্ন স্বার্থের সংঘর্ষ এবং প্রভাব বিস্তারের বাসনাই এই ধরনের ঘটনা জন্ম দেয়। কিন্তু যখন এই অভিযোগ ওঠে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে, তখন তা নিছক ব্যক্তিগত সমস্যা থেকে অনেক দূরে গিয়ে সম্প্রদায়ের সম্মান, ভাবমূর্তি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের সংকেত হয়ে দাঁড়ায়।

হ্যামট্রামিক সিটি শুধু একটি ছোট শহর নয়, এটি যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম প্রধান শহরগুলোর অন্যতম। বাংলাদেশিরা এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। প্রায়শই নির্বাচনে তাদের প্রভাব দৃঢ়ভাবে প্রতিফলিত হয়, এমনকি কেউ কেউ ভাবছেন ভবিষ্যতে শহরের মেয়র হিসেবেও একজন বাংলাদেশি নির্বাচন হতে পারেন। এক্ষেত্রে এই ধরনের অভিযোগ চরম অপ্রত্যাশিত ও হতাশাজনক।

বিশেষ করে এ সময়, যখন প্রবাসী বাংলাদেশিরা নানা ক্ষেত্রে ইতিবাচক সাফল্য অর্জন করে নিজেদের পরিচিতি প্রতিষ্ঠিত করছেন, তখন এমন অস্বস্তিকর খবর মন খারাপ করার কারণ হয়। শুধু কয়েক সপ্তাহ আগের কথা মনে করুন, যখন আমেরিকার পুলিশের একজন বাংলাদেশি অফিসার দিদারুল ইসলাম আত্মাহুতির মাধ্যমে বীরত্বের উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন। সেদিন গোটা বাংলাদেশি প্রবাসী সমাজ গর্বে বুক ফুলিয়ে দিতো। কিন্তু সেই গৌরবময় মূহুর্ত এত তাড়াতাড়ি যেন কাটতে পারে না, আবার সামনে আসে নির্বাচনী জালিয়াতির মতো নেতিবাচক ঘটনা।

নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ শুধু আইনি অপরাধ নয়; এটা সামাজিক এবং নৈতিক সংকটও বটে। যুক্তরাষ্ট্রে, যেখানে ন্যায়ের ওপর বিশ্বাস, আইনশৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা দেশের সাংবিধানিক ভিত্তি, সেখানে যেকোনো প্রকার জালিয়াতি সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য। প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির সুনামের উপর এমন কালিমা পড়া মানে পুরো সম্প্রদায়ের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি হওয়া, যা সহজে কাটিয়ে ওঠা কঠিন।

এখানে আরও একটি দিক আছে যা গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে—ভিন্ন সংস্কৃতি ও দেশে বসবাসরত প্রবাসীরা নিজেদের পরিচিতি ও সম্মান রক্ষায় কতটা সচেতন এবং দায়বদ্ধ? অনেক সময়ই দেখা যায়, প্রবাসে রাজনৈতিক শক্তি অর্জনের লড়াইয়ে সঠিক পথ অনুসরণের বদলে স্বার্থসিদ্ধির জন্য অনৈতিক পথ অবলম্বন করা হয়। কিন্তু এর ফলে যারা অনেক কষ্টে, পরিশ্রমে নিজেদের পরিচিতি ও সম্মান অর্জন করেছেন তাদের কঠিন পরিশ্রমের মূল্য বিনষ্ট হয়।

নির্বাচনে জালিয়াতি আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে শুধু ভোটারদের সঠিক অধিকার হরণ নয়, এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকেই ক্ষুণ্ন করে। এ ধরনের ঘটনা একদিকে যেমন জনমতের প্রতি আস্থা কমায়, তেমনি রাজনৈতিক অসততা ও বিভাজনের জন্ম দেয়। বিশেষ করে বাংলাদেশি কমিউনিটির মত একটি ক্ষুদ্র, কিন্তু ক্রমবর্ধমান গোষ্ঠীর মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি হলে, তা দীর্ঘমেয়াদে কমিউনিটির একতা ও উন্নয়নে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

আমাদের কমিউনিটির নেতাদের জন্যও এই ঘটনা একটি কঠিন সতর্কবার্তা। শুধু ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থে নয়, কমিউনিটির স্বার্থ ও মর্যাদার কথা বিবেচনা করে কাজ করতে হবে। নেতৃত্বের দায়িত্ব শুধু ক্ষমতা অর্জন নয়, সৎ, ন্যায়নিষ্ঠ ও সম্মানজনক আচরণের মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে। যারা দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তাদের উচিত স্বচ্ছতা ও সততার পথ অনুসরণ করা, যাতে কমিউনিটির প্রতি বিশ্বস্ততা ও বিশ্বাস বজায় থাকে।

আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির উন্নয়ন ও সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য সচেতন হওয়া। ভোটের অধিকার প্রয়োগ করা হলে সেটি যেন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। যেকোনো অনিয়ম বা জালিয়াতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে বিচারিক প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে হবে।

একইসঙ্গে, আমাদের উচিত নতুন প্রজন্মকে সততা, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীল নাগরিকত্বের মূল্যবোধ শেখানো, যেন তারা প্রবাসে রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। প্রবাসে বসবাসরত আমাদের সন্তানদের জন্য সুষ্ঠু ও সম্মানজনক নেতৃত্ব গড়ে তোলা অতীব জরুরি।

পরিশেষে বলতে হয়, প্রবাসে আমাদের অবস্থান শক্তিশালী করতে হলে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সম্মানের ভিত্তিতে এগিয়ে যেতে হবে। নির্বাচনী জালিয়াতির মতো ঘটনা শুধুমাত্র দণ্ডনীয় অপরাধ নয়, এটি আমাদের সম্মানহানি এবং সমগ্র কমিউনিটির ভাবমূর্তির জন্য লজ্জার বিষয়। তাই এই ধরনের অভিযোগ থেকে মুক্ত থাকার জন্য নিজেকেই আরও দায়িত্বশীল হতে হবে এবং সঠিক নেতৃত্ব নির্বাচনে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।

এই কঠিন সময় আমাদের ঐক্য ও সততার মাধ্যমে নিজেদের সুনাম রক্ষা করতে হবে। প্রবাসের সঠিক পথ অনুসরণ করে বাংলাদেশি কমিউনিটি যেন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে, এটাই প্রত্যাশা। আমরা যেন আমাদের পরিচয় শুধু সংখ্যায় নয়, চরিত্র ও নৈতিকতায়ও শক্তিশালী করতে পারি। এই প্রত্যাশায় আমাদের সকলের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক।
 

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন