https://www.prothomalony.com/

14320

north-america

উত্তর আমেরিকা

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: স্কুলে ফেরার আগে শিশুদের মানসিক যত্ন নিন

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৫ ০৩:০১

২১ জুলাই মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার পর থেকে একটি প্রশ্ন আমাকে ক্রমাগত নাড়া দিচ্ছে—যারা এখনও পোড়া শরীর নিয়ে অসহনীয় যন্ত্রণায় দিন কাটাচ্ছে, কিংবা যেসব শিশু চোখের সামনে এই নির্মম ট্র্যাজেডির সাক্ষী হয়েছে, তারা কীভাবে আবার সেই স্কুল ভবনে ফিরে যাবে?

নিহত শিশুদের প্রতি সমবেদনা রেখেই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি। আর খুঁজতে গিয়ে মনে হয়, আগে আমাদের বুঝতে হবে, এই শিশুদের অভিজ্ঞতা শুধুই একটি দুর্ঘটনা নয়—তাদের চোখের সামনে নেমে এসেছিল মৃত্যু, আগুন, আতঙ্ক আর হাহাকার। তাদের মনে গেঁথে গেছে কান্না, পোড়া শরীরের গন্ধ এবং প্রিয় বন্ধু-শিক্ষকদের হারানোর শোক। এমন মানসিক অবস্থা নিয়ে তারা যদি সেই একই ভবনে ফিরে আসে, তাহলে প্রতিটি করিডোর, প্রতিটি দেয়াল যেন আবারও মনে করিয়ে দেবে সেই বিভীষিকাময় দিনের স্মৃতি।

ট্রমা হলো সেই গভীর মানসিক আঘাত বা স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া, যা কোনো ভয়াবহ, বিপজ্জনক বা আতঙ্কজনক ঘটনার পর ব্যক্তির মন ও শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। যুদ্ধ, দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পারিবারিক-সামাজিক সহিংসতা বা প্রিয়জন হারানোর মতো ঘটনাগুলো ট্রোমার জন্ম দিতে পারে। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি প্রভাব ফেলে, কারণ তাদের নিরাপত্তাবোধ নির্ভর করে তাদের আশ্রয়দাতাদের উপর (যেমন বাবা-মা, শিক্ষক) বা অনুভূত নিরাপত্তার ওপর। এমনকি প্রিয়জনের জীবনের জন্য হুমকি তৈরি করা কোনো ঘটনা প্রত্যক্ষ করাও শিশুর জন্য ট্রোমার কারণ হতে পারে। শিশুদের মানসিক প্রতিরোধক্ষমতা ও বোঝার পরিসর পূর্ণভাবে গঠিত নয় বলে তারা ট্রোমার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল হয়।

এবং মনে রাখা দরকার, ট্রমাটিক কোনো ঘটনা শুধুমাত্র মনে জমে থাকা কোনো স্মৃতি নয়; সেটি ঘিরে থাকে স্থান, শব্দ, গন্ধ—এমনকি আলো-আঁধারিও সেই স্মৃতিকে ঘিরে রাখে। অপ্রত্যাশিত ঘটনার পর আমাদের মন এক ধরনের ‘সংযুক্তি’ তৈরি করে, যেখানে কোনো স্থান বা পরিবেশ হয়ে ওঠে সেই ঘটনার এক স্থায়ী প্রতিচ্ছবি। মাইলস্টোন স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ভবনের প্রতিটি করিডোর, জানালা, বেঞ্চ কিংবা খেলাধুলার মাঠ—সবকিছু এখন ওই বিভীষিকাময় ঘটনার এক নীরব স্মারক। তারা যখনই সেই ভবনে ফিরবে, তখন শুধু স্মৃতিই নয়, বরং দেহ-মনে নতুন করে সেই আতঙ্ক জেগে উঠতে পারে, যাকে বলা হয় ‘ট্রিগারিং অব ট্রমাটিক মেমোরি’। এজন্যই স্থানগত পুনরাবৃত্তি শিশুদের মানসিক পুনরুদ্ধারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে, যদি না সেই পরিবেশকে যথাযথভাবে প্রস্তুত করা হয়।

শিশুরা যখন ট্রোমার মধ্যে দিয়ে যায়, তখন তারা যেটা সবচেয়ে বেশি খোঁজে তা হলো নিরাপত্তা, বোঝাপড়া ও গ্রহণযোগ্যতা।

তখন তাদের পাশে এমন কাউকে থাকতে হবে (যেমন মা-বাবা, আত্মীয়, শিক্ষক), যিনি বলবেন, “তোমার অনুভূতি আমি বুঝতে পারছি, এটাই স্বাভাবিক। তবে তুমি একা নও, আমরা সবাই আছি তোমার সঙ্গে।”

ট্রমা মূলত শিশুদের চিন্তা, ভাবনা, আচরণ ও শিক্ষাজীবনে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলে। এর প্রভাব শুধু মানসিক নয়, বরং শারীরিক দিকেও বিস্তৃত হয়। যেমন—

১. চিন্তা ও ভাবনায় পরিবর্তন: ট্রোমাগ্রস্ত শিশুরা প্রায়ই আতঙ্ক, শঙ্কা ও অসহায়ত্বে ভোগে। তারা আগের মতো করে চিন্তা করতে পারে না, ভবিষ্যৎ নিয়ে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়।

২. আচরণগত পরিবর্তন: হঠাৎ করে চুপচাপ হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত রাগ দেখানো, একা থাকতে না চাওয়া, কাঁদতে থাকা বা অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়া—এসব আচরণ ট্রোমার সাধারণ বহিঃপ্রকাশ।

৩. শিক্ষাজীবনে ব্যাঘাত: মনোযোগের ঘাটতি, পড়ালেখায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, ক্লাসে অনুপস্থিত থাকা, স্কুলে যেতে অনিহা কিংবা পরীক্ষায় ফলাফল খারাপ হওয়া—সবই ট্রোমার ফলশ্রুতি হতে পারে।

৪. শারীরিক লক্ষণ: বিশেষজ্ঞদের মতে, পেটব্যথা, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, ঘুমের সমস্যা, খাওয়াদাওয়ায় অনীহা ইত্যাদি শারীরিক উপসর্গ ট্রোমার অভ্যন্তরীণ চাপে দেখা দিতে পারে।

৫. মানসিক স্বাস্থ্য: দীর্ঘমেয়াদে ট্রোমা চিকিৎসাহীন থাকলে শিশুর মধ্যে হতাশা, উদ্বেগ, আত্মগুটিয়ে থাকা বা আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা দিতে পারে, যা তার ভবিষ্যৎ বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

শিশুদের মানসিক আঘাত (ট্রমা) কাটিয়ে উঠতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন একটি নিরাপদ, স্থিতিশীল ও সহানুভূতিশীল পরিবেশ। দুর্ঘটনা বা সহিংস ঘটনার পর বিদ্যালয় শুধু শিক্ষার স্থান নয়, এটি হতে হবে আরোগ্য ও পুনর্গঠনের ক্ষেত্র। এক্ষেত্রে স্কুল কর্তৃপক্ষ শিশুদেরকে স্কুলে ফিরিয়ে নেওয়ার আগে কী করতে পারে?

শুরুতেই, বিদ্যালয় ও তার আশপাশের পরিবেশে ভৌত পরিবর্তন আনা জরুরি। দেয়ালের রঙ বদলানো, আসবাবপত্রের বিন্যাসে পরিবর্তন, শ্রেণিকক্ষের পুনর্গঠন—এসব ছোট ছোট পরিবর্তন শিশুদের স্মৃতিতে থাকা ঘটনার আবহ ভাঙতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে স্কুল কর্তৃপক্ষকে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে স্বচ্ছ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে এবং তা অভিভাবক ও শিশুদের জানাতে হবে, যাতে তাদের মধ্যে আস্থা জন্মায়।

শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষাকর্মীদের জন্য ট্রোমা–সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ এক্ষেত্রে আবশ্যক। তাদের ট্রোমা–সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে—যাতে তারা বুঝতে পারেন কোন শিশু কেমনভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে এবং কীভাবে তাকে সহায়তা করতে হবে।

শিশুদের মানসিক পুনর্গঠনে কাউন্সেলিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন পেশাদার শিশুকাউন্সেলর বিদ্যালয়ে নিযুক্ত থাকলে, তিনি এককভাবে ও দলগতভাবে শিশুদের সঙ্গে কাজ করতে পারেন। আর্ট থেরাপি, গল্প বলা, ছবি আঁকা, খেলাধুলা ইত্যাদির মাধ্যমে শিশুরা অনুভূতি প্রকাশের বিকল্প পথ পাবে, যা ট্রোমা নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

শুধু বিদ্যালয় নয়, ঘরও হতে হবে শিশুর জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়। এজন্য স্কুল কর্তৃপক্ষকে অভিভাবকদের জন্য ওরিয়েন্টেশন বা কাউন্সেলিং সেশন আয়োজন করতে হবে। এতে তারা শিখবেন কীভাবে শিশুকে ঘরেও মানসিকভাবে সমর্থন দেওয়া যায়। এই দুই জায়গায় একই ধরনের সহানুভূতিশীল আচরণ শিশুর মনে স্থিতি এনে দিতে সহায়ক হবে।

শ্রেণিকক্ষে শিক্ষককে হতে হবে শুধুমাত্র পাঠদাতা নয়, বরং সহানুভূতিশীল শ্রোতা, ধৈর্যশীল পথপ্রদর্শক। শিশুদের ধাপে ধাপে বিদ্যালয়ে ফিরতে সাহায্য করতে হবে, যাকে বলা হয় ‘সফট রিটার্ন’। হোমওয়ার্ক বা পরীক্ষার চাপ না দিয়ে, নমনীয়ভাবে শিক্ষায় ফিরিয়ে আনাই হবে মূল লক্ষ্য। শ্রেণিকক্ষ যেন হয়ে ওঠে শিশুদের দ্বিতীয় ঘর, একটি নিরাপদ স্থান, যেখানে তারা বিচারভীতি ছাড়াই নিজেদের প্রকাশ করতে পারবে। এখানে আনন্দ, সৃজনশীলতা ও খেলাধুলার যথেষ্ট সুযোগ থাকতে হবে, যাতে ট্রোমার ভার কিছুটা হালকা হয়। শিক্ষকের একটি সদয় প্রশ্ন, একটি শান্ত আশ্বাস, একটি মনোযোগী শ্রবণ—এসবই পারে শিশুর আত্মবিশ্বাস পুনর্গঠনে মুখ্য ভূমিকা রাখতে।

এই সব পদক্ষেপের মাধ্যমে ট্রোমাগ্রস্ত শিশুদের মনে আমরা একটাই বার্তা পৌঁছাতে পারি—“তুমি নিরাপদ, তুমি গুরুত্বপূর্ণ, এবং তুমি একা নও। আমরা তোমার পাশে আছি—প্রতিটি ধাপে।”

স্কুলের বাইরে এখানে পরিবারের করণীয় অনেক কিছু আছে, যা শিশুদেরকে ট্রোমা থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারে। শিশুরা নিরাপত্তা খোঁজে বাবা-মায়ের ভালোবাসা ও উপস্থিতিতে। অভিভাবকদের সতর্ক ও সংবেদনশীল পদক্ষেপই তাদের ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করতে পারে।

১. মনোযোগ দিন, গুরুত্ব দিন: শিশুর প্রতিটি কথা ধৈর্য নিয়ে শুনুন। অনেক সময় তারা সরাসরি সমস্যার কথা বলে না, বরং আচরণ বা খেলার ভেতর দিয়ে প্রকাশ করে। অভিভাবক হিসেবে আপনার করণীয় হলো, তাদের সেই ভাষা বুঝে নেওয়া। প্রশ্নের জবাবে তাড়াহুড়ো নয়, বরং অনুভবের জায়গা থেকে বুঝে নিন তারা কী বলতে চাইছে। বিচার না করে সহানুভূতির মনোভাব রাখলে শিশু তার অনুভূতি প্রকাশে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

২. সত্য বলুন, আতঙ্ক ছড়াবেন না: শিশুদের সঙ্গে বিভ্রান্তিকর কথা না বলে সহজ ও বয়স অনুযায়ী ভাষায় সত্য ব্যাখ্যা করুন। উদাহরণস্বরূপ, “সব ঠিক হয়ে যাবে” বলার বদলে, “আমরা সবাই মিলে সমস্যার সমাধান করছি” বলাটা বেশি কার্যকর। মিথ্যা আশ্বাস শিশুর বিশ্বাস নষ্ট করতে পারে। বরং বাস্তবতা বুঝিয়ে তাদের মানসিক প্রস্তুতি গড়ে তুলুন।

৩. নিয়মিত রুটিন বজায় রাখুন: শিশুরা পরিচিত ও পূর্বপরিচিত পরিবেশে নিরাপত্তাবোধ করে। প্রতিদিনের খাবার, ঘুম, পড়াশোনা ও খেলার রুটিন আগের মতো রাখার চেষ্টা করুন। ছোট ছোট স্বাভাবিক কাজ—যেমন পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে খাওয়া, বিছানায় গল্প পড়ে শোনানো—তাদের মনে স্থিরতা এনে দেয়। পরিবর্তনের সময়েও কিছু পরিচিত অভ্যাস ধরে রাখা তাদের মানসিক শান্তিতে সহায়ক।

৪. আপনার আচরণেও স্থিরতা আনুন: অভিভাবক হিসেবে আপনি যদি অস্থির ও আতঙ্কিত থাকেন, শিশু তা সঙ্গে সঙ্গে বুঝে ফেলে। তারা আপনার মুখের কথা নয়, আচরণ ও শরীরী ভাষা পড়ে। তাই নিজের ভয় ও উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণে রাখুন, প্রয়োজনে নিজের জন্যও কিছু সময় বের করুন। একটি শান্ত ও নির্ভরযোগ্য উপস্থিতি শিশুর জন্য আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে।

৫. প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিন: ট্রোমা আক্রান্ত শিশুর আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন যেমন—কথা কম বলা, দুঃস্বপ্ন, খিটখিটে মেজাজ, অতিরিক্ত ভয় বা নির্জনতা দেখা দিলে দেরি না করে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। পরিবার সবসময় সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে না। একজন প্রশিক্ষিত থেরাপিস্ট শিশুর মনোজগতে ঢুকে সহায়তা করতে পারেন সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে।

৬. আস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করুন: শিশুর মনে ভয় থাকতেই পারে, কিন্তু তাকে সাহস জোগাতে হবে ধীরে ধীরে, কোমল ও সহনশীল পদ্ধতিতে। কখনোই জোর করে কিছু করতে বাধ্য করবেন না। তার অনুভবগুলো গুরুত্ব দিন, কথা শুনুন মনোযোগ দিয়ে। বোঝান সে নিরাপদ, তার পাশে আপনি আছেন। এভাবে ধীরে ধীরে শিশুর মনে আবার আত্মবিশ্বাস গড়ে উঠবে।

৭. নিজের মানসিক স্বাস্থ্যেও নজর দিন: শিশু যতটাই সংবেদনশীল, অভিভাবকের আবেগ-অবস্থা ততটাই তাদের ওপর প্রভাব ফেলে। আপনি যদি ক্লান্ত, উদ্বিগ্ন বা ভেঙে পড়েন, তাহলে তা শিশুর মানসিক নিরাপত্তা নষ্ট করতে পারে। তাই নিজের বিশ্রাম, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলা কিংবা থেরাপির মতো সুযোগকেও গুরুত্ব দিন। আপনি মানসিকভাবে ভালো থাকলেই সন্তানের কাছে হতে পারবেন এক শক্ত ও নিরাপদ আশ্রয়।

মাইলস্টোনের এই দুর্ঘটনা শুধুমাত্র জীবনের ক্ষতি নয়, শিশুদের মানসিক জগতে একটি দীর্ঘস্থায়ী দাগ ফেলে গেছে। এখন সময় আমাদের সম্মিলিতভাবে তাদের পাশে দাঁড়ানোর। স্কুল, পরিবার, শিক্ষক ও সমাজ—সবারই উচিত তাদের সহচর হয়ে ওঠা। শিশুরা হয়তো ঘটনাটি ভুলে যাবে না, কিন্তু তাদের পাশে কারা দাঁড়িয়েছিল—সেই ভালোবাসা ও সহানুভূতি তারা চিরকাল মনে রাখবে।
 

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন