https://www.prothomalony.com/

14181

north-america

উত্তর আমেরিকা

বাংলাদেশি কৃষির ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছে প্রবাসের চৌহদ্দিতে

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৫ ০০:৪০

উত্তর আমেরিকার শহরতলিতে যখন গ্রীষ্ম নামে, তখন প্রবাসী বাংলাদেশিদের বাড়ির আঙিনায় শুরু হয় এক প্রাণের আয়োজন। শীতের জড়তা পেরিয়ে, বরফের আচ্ছাদন গলে যেতেই মাটি খুঁড়ে, মাটি ঝাঁকি দিয়ে তারা নামিয়ে আনেন বাংলাদেশের স্মৃতি। ঢেঁড়স, পটল, লাউ, কদু, বরবটি, ধনে পাতার বীজ, এমনকি পুঁই শাকের লতা—সব কিছুই যেন ভিনদেশের মাটিতে জন্ম নেয় নতুন প্রাণ নিয়ে।

আজ থেকে বিশ-পঁচিশ বছর আগেও আমেরিকার বাড়ির আঙিনা মানে ছিল এক রঙিন ঘাসে ঢাকা মাঠ, ফুলের গাছ আর কিছু সাজসজ্জার নিদর্শন। সেখানে দক্ষিণ এশিয়ার অভিবাসীরা নিয়ে এসেছেন এক ভিন্ন ধারা। তারা শুধু ফুল নয়, ফল, শাক আর সবজির চাষ শুরু করেছেন, যার মাঝে রয়েছে প্রিয় জন্মভূমির সুবাস, শিকড়ের ঘ্রাণ।

এই চাষাবাদ কেবল নস্টালজিয়ার অংশ নয়। এটি এখন উত্তর আমেরিকার অভিবাসী জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশি, ভারতীয়, নেপালি, শ্রীলঙ্কান, এমনকি পাকিস্তানি প্রবাসীরা তাদের শৈশবের গ্রামীণ কৃষিজ সংস্কৃতিকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন বিদেশে। আর এ চর্চা এখন গৃহস্থালি সীমা ছাড়িয়ে পৌঁছেছে বাণিজ্যিক স্তরে।

আমাদের মতো উষ্ণমণ্ডলীয় দেশের গাছপালা ও ফসল মূলত গ্রীষ্মকালীন। ফলে মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উত্তর আমেরিকার যেসব এলাকায় তাপমাত্রা অনুকূলে থাকে, সেসব জায়গায় দেখা যায় অভাবনীয় ফলন। আজ নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি, কানেকটিকাট, পেনসিলভানিয়া, ওহাইও, ইলিনয়, মিশিগান—এসব অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা রাজ্যেও প্রবাসীরা ঢেঁড়স, বরবটি, কুমড়া, ঝিঙ্গা, সিম, ডাঁটা শাক, পুঁই শাক, ধনে, সরিষা, লাল শাক, কচু—সবই উৎপাদন করছেন। শীতকালে যেসব ফসল জমিতেই হিম হয়ে যেত, সেসবও এখন উন্নত বীজ, টানেল হাউজ, আর অভিজ্ঞতাভিত্তিক কৃষি কৌশলে সম্ভব হচ্ছে।

অনেকেই ভাবতেন—ফ্লোরিডা, টেক্সাস বা ক্যালিফোর্নিয়ার মতো উষ্ণ রাজ্যেই কেবল সম্ভব এসব চাষ। কিন্তু বাস্তব বলছে, সঠিক পরিকল্পনা আর আগ্রহ থাকলে নিউইয়র্ক বা শিকাগোর মতো তুলনামূলক শীতল এলাকাতেও সফল হচ্ছে গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষ। এর প্রধান কারণ হলো—সাময়িক গ্রীষ্মের চার মাসকে কাজে লাগিয়ে অভিবাসীরা তৈরি করছেন এক নির্ভরযোগ্য ফলনব্যবস্থা।

আজকাল অনেক পরিবার শুধু নিজের খাওয়ার জন্য নয়, আশপাশের আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, এমনকি স্থানীয় বাজারে বিক্রির জন্যও চাষ করছেন। বাড়ির আঙিনা ছাড়িয়ে এখন অনেকেই ভাড়া খামার, কমিউনিটি গার্ডেন বা নিজস্ব জমিতে সবজি উৎপাদনে যাচ্ছেন। তারা বুঝতে পারছেন—এই চাষাবাদ শুধু স্মৃতিময় নয়, অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক।

এই চাষাবাদের একটি বড় দিক হলো “অর্গানিক” উৎপাদন। আজ বিশ্বজুড়ে অর্গানিক খাবারের কদর বেড়েছে। মানুষ চাইছে কীটনাশকমুক্ত, প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে উৎপাদিত খাদ্যপণ্য। আর এখানেই দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের অভিজ্ঞতা একটি আলাদা ভূমিকা রাখছে। গ্রামে বড় হওয়া অনেকেই জানেন কীভাবে প্রাকৃতিক সার তৈরি করতে হয়, কীভাবে মাটি ঠিক রাখতে হয়, কোন গাছে কী ধরনের রোগবালাই হয়, কিংবা কীভাবে গাছের পরিচর্যা করলে ফলন বেশি হয়।

উত্তর আমেরিকায় এই দক্ষতাগুলো এখন স্বীকৃতি পাচ্ছে। অনেক কৃষি প্রতিষ্ঠান, বাজার, এমনকি খাদ্যবিজ্ঞান গবেষকরা এই অভিবাসী কৃষকদের অভিজ্ঞতা নিয়ে গবেষণা করছেন। তারা বুঝছেন, একুশ শতকের কৃষির ভবিষ্যত শুধু যন্ত্রনির্ভর নয়—বরং প্রজন্ম ধরে চলে আসা মাটি-জল-আবহাওয়ার সম্পর্ক বোঝার মধ্যেই লুকিয়ে আছে টেকসই কৃষির চাবিকাঠি।

ফলমূলের দিক দিয়েও বাংলাদেশিরা পিছিয়ে নেই। আজ গ্রীষ্মকালে ক্যালিফোর্নিয়া , ফ্লোরিডার অনেক বাড়িতেই দেখা যায় কাঁচা আম, দেশি লিচু, কাঁঠালজাতীয় ফলের গাছ। অনেকেই সফলভাবে আম গাছ বড় করে তুলছেন—টবে কিংবা মাটিতে। যদিও আবহাওয়া এবং সময়ের সীমাবদ্ধতায় এসব গাছ থেকে ফল পাওয়া এখনও চ্যালেঞ্জ, তবে ধৈর্য, নতুন প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনী চাষপদ্ধতির মাধ্যমে এটি এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।

শুধু খাবারের জন্য নয়—এই আঙিনার চাষাবাদে আছে পারিবারিক বন্ধনের ছোঁয়া। মা গাছ লাগান, ছেলে জল দেয়, নাতি পাতা ছিঁড়ে নিয়ে খেলা করে। গরমের সন্ধ্যায় পুরো পরিবার মিলে বাগানে বসে—কেউ আগাছা তুলে, কেউ গাছে বাঁশের মাচা বাঁধে। এই চাষাবাদ যেন পরিণত হয়েছে এক সামাজিক-সাংস্কৃতিক বন্ধনে, যা পরিবারকে একত্র করে, প্রজন্মকে পরিচয় করিয়ে দেয় শিকড়ের সাথে।

সবচেয়ে বড় কথা, এই চাষাবাদ আমাদের এক নতুন আত্মপরিচয় দেয়। আমরা আমেরিকান সমাজের অংশ, আবার আমরা নিজেদের বাংলাদেশি শেকড়ও বহন করি। সেই শেকড় আজ মিশে গেছে আঙিনার মাটিতে, পাতার রংয়ে, আর গন্ধে। এই চাষাবাদ আমাদের কেবল খাবার দেয় না, দেয় আত্মিক শান্তি। দেয় বাংলাদেশকে ছুঁয়ে থাকার আনন্দ।

এই যুগে যখন বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ বিপর্যয়, আর স্বাস্থ্য সচেতনতাই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, তখন প্রবাসে থাকা মানুষদের আঙিনার সবজি চাষ এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এটি প্রমাণ করে—অভিবাসনের মানে শুধু কর্মক্ষেত্রে সাফল্য নয়, বরং নিজের সংস্কৃতি, মাটি আর মানসিক পরিচয়কে বহন করে নিয়ে যাওয়া।

উত্তর আমেরিকার বহুজাতিক, বহুভাষিক সমাজে আমাদের এই কৃষিচর্চা এখন এক সাহসিক ও সংস্কৃতির চিহ্ন। এটি কেবল বেঁচে থাকার কৌশল নয়—বরং নিজের শিকড়কে বাঁচিয়ে রাখার একটি কৌশলী এবং সচেতন প্রয়াস।

আমাদের এই চাষাবাদ যেন ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকে, আরও সম্প্রসারিত হয়, এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে এক নতুন সচেতনতা নিয়ে—বাংলাদেশি হয়ে ওঠার অর্থ কেবল পাসপোর্ট নয়, বরং গন্ধে, রংয়ে, খাদ্যে, সংস্কৃতিতে, এবং আঙিনার মাটিতে রোপিত এক আত্মপরিচয়।
 

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন