https://www.prothomalony.com/
13760
north-america
দিগন্ত বিস্তৃত হাওরে মাছ শিকার হাওরবাসীর যাপিত জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্ষার উত্তাল ঢেউকে নির্ভয়ে মোকাবিলা করে মাছ শিকারে হাওরবাসীর যেমন আগ্রহ থাকে, তেমনি শীত মৌসুমে হাওর জুড়ে ছোট–বড় জলাশয়, পুকুর, এমনকি জলাভূমির তলদেশ কিছুই বাদ যায় না অভিজ্ঞ মাছ শিকারিদের হাত থেকে। ভরা মৌসুমেও হাওরের নানা রূপ আর চরিত্রের ভিন্নতা নিয়ে বেঁচে থাকা হাওর জনপদে বাসকারীদের মধ্যে মাছ শিকারের গল্পের শেষ নেই। জাল দিয়ে মাছ ধরা, পলো ঝাঁপানো কিংবা ছোট ছোট নৌকায় শুকনো ডালপালা ডুবিয়ে রেখে মাছ ধরার ফাঁদ পাতা হয়।
শীত মৌসুমে শান্ত নদীতে মুলি নামের বাঁশের নানা অংশ ছিদ্র করে নারকেল তৈরি রশি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। নির্দিষ্ট সময় পরে ডুবে থাকা বাঁশ তীরে তুলে এনে সংগ্রহ করা হয় ছোট–বড় বাইমজাতীয় মাছ ও কালো–হলুদ ডোরাকাটা রানী মাছ।
হাওরে সব মৌসুমে মাছ ধরার প্রতিটি পর্বে থাকে প্রস্তুতি ও আয়োজনে মোটা দাগের উত্তেজনা। তবে সবকিছু ছাড়িয়ে যায় বর্ষার ভরা মৌসুমে আলো দিয়ে মাছ শিকারের আয়োজনে। অঞ্চলভেদে যার নামের ভিন্নতা।
কেউ বলেন আলোয়ারি, কেউ আবার ছোট করে বলেন আললরা। বোশেখ মাসের শেষ, জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি সময়ে উজান থেকে নেমে আসা বানের জল ধীরে ধীরে হাওরে প্রবেশ করতে শুরু করে। ইতিমধ্যে বোরো ফসল তোলা শেষ। সারা হাওরে পড়ে থাকে কাটা ধানের শুকনো গোছা। হাওরঘেঁষা নদীর তীর জুড়ে ছড়ানো ধান মাড়াইয়ের পরিত্যক্ত খড়ের ছোট–বড় স্তূপ। তীর ছাপিয়ে নয়তো সেচের নালা ধরে বানের জল পুরো হাওরের সব উঁচু–নিচু এলাকা ধীরে ধীরে প্লাবিত করে দেয়। নতুন জলে শুরু হয় নানা প্রজাতির মাছের নীরব উপস্থিতি। পচা খড়ের স্তূপের নিচে খলসে কিংবা দেশি কৈ মাছের পোনার ঝাঁক আশ্রয় নেয়। দিনের বেলা লুকিয়ে থেকে সন্ধ্যায় জিয়ল মাছের আনাগোনা শুরু কাটা ধানের গোছায় জমে থাকা জলজ ও দানাদার খাবার খেতে।
হাওরপাড়ের সাহসী সন্তানরা শৈশব থেকেই জেনে যায় জীবন বাঁচাতে সব ধরনের কৌশল। পরিবারের খাবারের জোগান দেওয়া ও নিজেদের শখ মেটাতে মাছ শিকারের নেশা লালন করে যাচ্ছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
বর্ষার শুরুতে বানের জলে খাবারের সন্ধানে হাওরজুড়ে ঘুরে বেড়ানো নানা জাতের সুস্বাদু মাছ ধরার পর্ব শিকারিদের কাছে সব সময় মনে পুষে রাখা একেকটি স্বপ্ন। যার একটি হলো আলো দিয়ে মাছ শিকার। কখনো হাঁটু পানি বা শুধু গোড়ালি ভিজিয়ে
ছপ ছপ আওয়াজ তুলে শিকারিদের দল ডান হাতে টেঁটা (সিলেটি ভাষায় কুঁচা) আর বাম হাতে শক্তিশালী টর্চ (ছয় ব্যাটারির) নিয়ে সাবধানে ডানে–বামে তাকাতে তাকাতে হাঁটেন অনেক দূর পর্যন্ত। যে অঞ্চলের কথা বলছি, সেখানে প্রতি গ্রামে প্রবাসীদের বাস। তাঁদের কেউ থাকেন আমেরিকা কিংবা ইউরোপের কোনো ধনী দেশে। মধ্যপ্রাচ্যে থাকা প্রবাসীদের উপস্থিতি ভাটি এলাকায় এখন খুবই সাধারণ ব্যাপার।
বিদেশফেরত এসব মানুষ স্বজনদের জন্য আনা উপহারের তালিকায় বেশির ভাগ সময় রাখেন হাওরে আলো দিয়ে মাছ শিকারের মূল অস্ত্র—চায়নার তৈরি ছয় ব্যাটারির চালিত শক্তিশালী টর্চলাইট।
উজান থেকে নেমে আসা বানের জলে ধীরে ধীরে হাওর পূর্ণ হওয়ার সুবর্ণ মুহূর্তে শক্তিশালী টর্চের আলোয় জিয়ল মাছ শিকারের আনন্দ উপভোগের সময় আসে আরও কয়েক দিন পর। শ্রাবণ–ভাদ্র মাসে ভাটির হাওরের রূপ ধরা দেয় বিশালতার আদলে। দিগন্তজুড়ে জলে টইটম্বুর শীতের সময় দেখা হাজার একরের কৃষিজমি। একসময় যেখানে বোরো ফসলের সবুজে কৃষক আর হাওরবাসীর হৃদয়ে লাগত আনন্দ ও সুখের দোলা। বর্ষায় সেই হাওরে কারও কারও চিত্তে আসে আফালের ভয় আর জীবনযুদ্ধের কঠিন চিরায়ত চিত্র। সাগরের রূপের হাওরে ভেসে থাকা ছোট–বড় গ্রামগুলো দেখলে মনে হয় জলে ভাসা এক খণ্ড ভাটির জীবনের জীবন্ত ক্যানভাস। ভাটির সেই গ্রামের কোনো এক অবস্থাপন্ন গৃহস্থ বাড়ির এক সৌখিন শিকারি মহাজনের মনে খায়েস জাগে ‘আললরা’তে যাবেন।
আললরা হলো হ্যাজাক লাইটের স্ফুরিত রুপালি রঙের তীব্র আলোর ছটায় নৌকায় চড়ে মাছ শিকার। রাতের ভিন্ন রূপের হাওরে নেমে উত্তেজনায় পরিপূর্ণ মাছ শিকারে যেতে প্রথমে প্রয়োজন দুই–তিন জাতের কৌশলী অস্ত্র। হাঁটাহাঁটি করে আলো দিয়ে মাছ শিকারে যেখানে কোঁচই যথেষ্ট, সেখানে নিশী রাতে নৌকায় চড়ে মাছ শিকারে দরকার বিশেষভাবে নির্মিত লোহার তৈরি টেঁটা।
সৌখিন শিকারিদের মাছ শিকারের বিশেষ হাতিয়ার ‘টেঁটা’ তৈরির জন্য আছেন বিশেষ কামার। টেঁটা তৈরি হয় টনটনে আওয়াজের লোহায়। বিশেষ কায়দায় তৈরি ৪/৫ শলাকার টেঁটায় উল্টো করে এঁটে দেওয়া হয় তীক্ষ্ণ ২/৩ ইঞ্চি সাইজের ধারালো কাঁটা। প্রতিটি ১০ ইঞ্চির লোহার শলাকা কামারের হাপরের গনগনে লাল টকটকে আগুনে বারবার পুড়ে পুড়ে তৈরি হয় মাছ শিকারের টেঁটা।
বিশেষভাবে তৈরি চকচকে ধারালো টেঁটার হাতল তৈরি হয় পোক্ত বাঁশের সাহায্যে। বাঁশের সরু অংশ হাতলের আকারে রেখে বিপরীতে মুখে শক্ত করে তার দিয়ে বেঁধে জুড়ে দেওয়া হয় বিশেষভাবে আটকানো ৫ শলাকার মুঠো অংশ। এবার অপেক্ষা আললরা তথা নিখাদ কালো ঘুটঘুটে অন্ধকারে বিশাল হাওরে নৌকায় চড়ে ভেসে বিশেষ আলোতে সৌখিন মহাজনের মাছ শিকারের শখ মেটানো। এবার আসুন জেনে নিই, হাওরের টলটলে জলে, চলে চলে নীরব রাতে মাছ শিকারের অন্যতম অংশ—আলো আসে কোথা থেকে। হাওরে সব জাতের ছোট–বড় মাঝারি কিংবা বড় মাছ খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়ায় হাওরের অগভীর জলে। হাওরের সর্বত্র অনেক জাতের লতা–গুল্মের কখনো কমতি ছিল না, যার বেশির ভাগই মাছের খাবার। আলো দিয়ে মাছ শিকার করতে দরকার হাওরের কালো জল ভেদ করতে পারে এমন আলোর রশ্মি, যা আসে এংকর মার্কা হ্যাজাক লাইটের ছড়ানো–ছিটানো সাদা ঝকঝকে আলোর বন্যা থেকে। হ্যাজাক লাইটের জ্বালানি সাদা কেরোসিন তেল দিয়ে পূর্ণ করা হয় হ্যাজাকের নিচের অংশ। বিশেষ মেকানিজমে তৈরি হয় বাতির কাজ করা বাল্ব–আকৃতির জালের মতো আবরণ (ম্যান্টেল), যা উত্তপ্ত হয়ে উজ্জ্বল আলো বিকিরণ করে। সরাসরি গিয়ে পড়ে হাওরের স্বচ্ছ জলে।
প্রচলিত আছে, অমাবস্যা রাতের নিখাদ কালো অন্ধকারে মাছ খাবারের সন্ধানে বের হয় নির্ভয়ে। স্বল্প গভীরতার হাওরের উঁচু অংশে জন্মানো জলজ উদ্ভিদ আর গুল্মের স্বাদ নিতে নানা আকারের মাছের ঝাঁক ভিড় করে। আর তারই সুযোগ নেয় সৌখিন শিকারিদের দল।
রাতের মধ্যভাগে খোলা নৌকায় চড়ে বসেন শিকারি। নৌকার গলুইতে অন্ধকার দূরে করে আশপাশ উজ্জ্বল করে রাখা আলোর উৎস—বিদেশি হ্যাজাক লাইট, কেউ বলেন পেট্রোম্যাক্স—থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসে আলোর ঝরনা। শ্রাবণ মাসের নীরব রাতে শান্ত হাওরে নিঃশব্দে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আলোর ফেরিওয়ালার ছদ্মবেশে চকচকে লোহার তৈরি টেঁটা হাতে সখের আললরায় অভিজ্ঞ গ্রামের মহাজন। রাতের হাওরজুড়ে এমন আলো নিয়ে ঘুরে বেড়ানো শিকারিদের দলকে নিয়ে অনেক গল্প শোনা যায় এলাকায়। আললরা করতে গিয়ে নাকি কোনো কোনো শিকারি ভূত–পেত্নীর মতো অশরীরী আত্মার কবলে পড়ে প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়েন। কেউ কেউ নাকি এদের কবলে পড়ে প্রাণও হারিয়েছেন। অনেক সাহসী শিকারি নৌকার গলুইতে পেট্রোম্যাক্স বসিয়ে ছোট আকারের কোষা নৌকায় চড়ে রাতের বেলা হাওরে মাছ শিকারে নেমে যান। এমন সাহসী শিকারিদের পেছনে পেছনে ঘুরতে থাকে নাম না জানা অতৃপ্ত আত্মার দু–একজন। তেমনি এক শিকারির কাছ থেকে শোনা কাহিনি—কীভাবে মরীচিকার মতো আলো দেখিয়ে হাওরপাড়ের গ্রামের এক পাশে গোরস্থান কিংবা শ্মশানঘাটে নিয়ে যায়। কখনো আবার বড় মাছের আকার নিয়ে হাজির হয় হ্যাজাকের রুপালি আলোতে, ডুবে যায় আবার ভেসে উঠে শিকারিকে নিয়ে যায় নির্জন স্থানে। অভিজ্ঞ শিকারিরা বুঝে ফেলেন কোথায় মাছের আনাগোনা, আর কোথায় জ্বিন–ভুতের ছলনার খেলা। তাই রাতের অন্ধকারে শিকারিদের থাকতে হয় সদা হুঁশিয়ার। কেউ আবার মসজিদের হুজুরের দেওয়া দড়ি পড়া শরীরে বা নৌকায় পেঁচিয়ে রেখে আললরাতে হাওরে নামেন। মজার কথা হলো, শত শত ভয়ের গল্প আর কিসসা শুনেও বারবার নেমে যান আলোর খেলায়, খেলে খেলে কালো জলের অগভীরে লুকিয়ে থাকা ছোট–বড় নানা স্বাদের মাছ শিকারের আদিম নেশায়। তাই বুঝি বিশাল হাওরের প্রান্ত আর সীমানায় প্রতি বছর সৌখিন শিকারিরা অপেক্ষা করেন—কবে আসবে উজানের ঢল আর বানের পানি, পূর্ণ হবে দিগন্ত হাওর, শিকারিদের হাতে ধরা পড়বে সুস্বাদু মাছ—রুই, মৃগেল আর তেলতেলে বোয়াল।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন