https://www.prothomalony.com/

13647

north-america

উত্তর আমেরিকা

মামদানির ট্রাম্প কার্ড ‘অভিবাসী-মুসলিম’ ভোটার, বাড়ছে সমর্থন

নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচন

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৫ ০১:২০

একদিকে অভিবাসীদের ধরপাকড় অন্যদিকে ফিলিস্তিনপন্থী শিক্ষার্থীদেরও ওপর প্রশাসনের কড়াকড়িতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে অসংখ্য নিউইয়র্কবাসীর। তদন্তের মুখে পড়ে বর্তমান মেয়র এরিক অ্যাডামসের ট্রাম্প প্রীতি নগরবাসীর বড় চিন্তার কারণ। একটা সময় অভিবাসীদের পক্ষে নগরপিতার কড়া অবস্থান থাকলেও অদৃশ্য এক কারণে মুদ্রার অপর পিঠ দেখালেন অ্যাডামস। যা চরমভাবে হতাশ করেছে অভিবাসী কমিউটিগুলোকে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ প্রশান্তি ও স্বস্তির খোঁজে ছুটছেন দিগ্বিদিক! আতঙ্কের এ সময়ে অনেকের কাছে ‘আশা-ভরসা’ হয়ে উঠছেন জেহরান মামদানি! আর তাইতো আগামী ২৪ জুন অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মেয়র নির্বাচনের প্রাইমারিতে মামদানির জয়ের জন্য কাজ করছেন অসংখ্য অভিবাসী ও মুসলিম কমিউনিটির সদস্যরা।

জানা গেছে, নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনের প্রাইমারিতে ডেমোক্রেটদের ৯ প্রার্থী লড়ছেন। যাদের মধ্যে আলোচনায় তুঙ্গে জোহরান মামদানি ও সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমো। বাকি প্রার্থীদের চাপিয়ে এই দুই প্রার্থীর মধ্যে প্রতিযোগিতা ইতিমধ্যে তমুল আকারে ধারণ করেছে। এদিকে বর্তমান মেয়র এরিক অ্যাডামস স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। প্রাইমারি যত ঘনিয়ে আসছে ততই উত্তপ্ত হচ্ছে রাজনৈতিক মাঠ। বিভিন্ন সভা, ক্যাম্পেইনে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা। যদিও অ্যান্ড্রু কুমো অনেকটা সময় ব্যস্ত থাকছেন তার ঘাড়ে থাকা মামলা সামলাতে!


অভিবাসী-মুসলিম ভোটারে সমর্থন মামদানির পক্ষে

৮ মিলিয়নের বেশি জনসংখ্যার নিউইয়র্ক শহরে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ৪.৭ মিলিয়নেরও বেশি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মুসলিম, দক্ষিণ এশীয়, এবং তরুণ ভোটাররা ইতিমধ্যে মামদানির প্রগতিশীল রাজনৈতিক এজেন্ডাকে সমর্থন জানিয়েছেন। নিউইয়র্কে বসবাসকারী মুসলিমদের সংখ্যা প্রায় ৭.৫ লাখ। যাদের একটি বড় অংশ ভোটার তালিকাভুক্ত।

ব্রুকলিন, কুইন্স, ও ব্রঙ্কসের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে মামদানির নির্বাচনী প্রচারে প্রাণ ফিরে এসেছে। তার ব্যক্তিগত ধর্মীয় পরিচয়, মুসলিম সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ইস্যুতে অবস্থান এবং গাজা সংকটের সময় স্পষ্ট বিবৃতি তাকে এই গোষ্ঠীর কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে। বিশেষ করে তরুণ মুসলিম ভোটারদের মধ্যে মামদানি একটি আশার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। 

অন্যদিকে, অভিবাসী ভোটারদের ভূমিকা এবার আরও জোরালো। নিউইয়র্ক সিটির জনসংখ্যার ৩৭ শতাংশেরও বেশি মানুষ বিদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন। তাদের অনেকে ইতোমধ্যে নাগরিকত্ব পেয়ে ভোটাধিকার অর্জন করেছেন। বাকিরা ‘আওয়ার সিটি, আওয়ার ভোট’ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পাওয়ার জন্য সোচ্চার। এই কমিউনিটির কাছে মামদানি বিশ্বাস ও ভরসার স্থানে পরিণত হচ্ছেন।

নিউইয়র্ক সিটির নির্বাচনী রাজনীতিতে এত বড় আকারে অভিবাসী ও মুসলিম ভোটারের একত্রিত প্রভাব অতীতে খুব কম দেখা গেছে। মামদানির দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ে কাজ, কমিউনিটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকা, এবং সংস্কারমূলক নীতির প্রতি অঙ্গীকার তাকে এগিয়ে রেখেছে অ্যান্ড্রু কুমোর মতো অভিজ্ঞ কিন্তু প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিবিদের চেয়ে। কুমো প্রচলিত রাজনৈতিক সমর্থন নিয়ে মাঠে থাকলেও, মামদানি এই নির্বাচনে নতুন ভোটার, তরুণ ও বঞ্চিত সম্প্রদায়ের সমর্থন নিয়ে ভোটের সমীকরণ পাল্টে দিতে পারেন।

জরিপেও এগিয়ে যাচ্ছেন মামদানি


নিউইয়র্ক সিটির মেয়র পদের নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়নকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ক্রমেই তুঙ্গে উঠছে। প্রাইমারি ভোটের আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি থাকতেই একাধিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, প্রগতিশীল রাজনীতিক ও কুইন্সের অ্যাসেম্বলিম্যান জোহরান মামদানি অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছেন।

মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে পরিচালিত একটি সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, মামদানি পেয়েছেন ৪৪ শতাংশ ভোটারের সমর্থন। যা তাকে এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ জনপ্রিয় প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরছে। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী, স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমো রয়েছেন ৪২ শতাংশ সমর্থন নিয়ে। 

তবে এই অবস্থান হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এর আগে, এমারসন কলেজ, পিক্স১১ ও দ্য হিল’র যৌথ জরিপে ক্যুমো পেয়েছিলেন ৩৫ শতাংশ প্রথম পছন্দের ভোট, যেখানে মামদানি ছিলেন দ্বিতীয় স্থানে ২৩ শতাংশ নিয়ে। কিন্তু তখন থেকেই ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে জনমতের ধারা।

নিউইয়র্ক সিটির নির্বাচনে চালু হওয়া র‌্যাংকড চয়েস ভোটিং পদ্ধতিতে দ্বিতীয় ও তৃতীয় পছন্দ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই পদ্ধতিতে প্রার্থীদের সমর্থন শুধুমাত্র প্রথম পছন্দে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং অন্যান্য প্রার্থীর বাদ পড়ার পর তাদের ভোটও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আগের জরিপে কুমো শেষ রাউন্ডে মামদানিকে ৫৪-৪৬ শতাংশে হারালেও নতুন ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে। মামদানি এখন এই ব্যবধান পার করে আরও এগিয়ে গেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, মামদানির জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে তার জোরালো তৃণমূল প্রচারণা, প্রগতিশীল নীতিমালা। তিনি ভাড়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ, ফ্রি এবং দ্রুত গণপরিবহন, সাশ্রয়ী বাজারব্যবস্থা এবং সার্বজনীন শিশুসেবার ঘোষণা দিয়েছেন। এ ছাড়া তার নির্বাচনী প্রচারণায় রয়েছে ২৫ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবক এখনও পর্যন্ত শহরের ছয় লাখেরও বেশি দরজায় কড়া নেড়েছেন।

কে এই তরুণ, কিভাবে উত্থান?

জোহরান কোয়ামে মামদানি উগান্ডায় জন্মগ্রহণ করা একজন মুসলিম রাজনৈতিক। তার বাবা মাহমুদ মামদানি একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত উগান্ডার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবং মা মীরা নায়ার একজন খ্যাতিমান ভারতীয়-আমেরিকান চলচ্চিত্র নির্মাতা। বাবার কর্মসূত্রে তিনি শৈশবে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে অবস্থান করেন এবং সেখানকার সেন্ট জর্জ গ্রামার স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে পরিবারের সঙ্গে নিউইয়র্কে চলে আসেন এবং ব্রঙ্কস হাই স্কুল অব সায়েন্স থেকে স্নাতক হন। এরপর বোডোইন কলেজ থেকে আফ্রিকানা স্টাডিজে স্নাতক সম্পন্ন করেন। মামদানি কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। 

রাজনীতিতে প্রবেশের আগে মামদানি ফোরক্লোজার প্রতিরোধ পরামর্শদাতা ও সাবওয়ে স্টেশনে হিপ-হপ এমসি হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি ২০১৭ সালে সিটি কাউন্সিলের প্রার্থী খাদের এল-ইয়াতিমের প্রচারণায় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন। ২০১৮ সালে রস বারকানের প্রচারণা এবং ২০১৯ সালে ডিএ পদপ্রার্থী টিফানি কাবানের নির্বাচনী প্রচারণায় জড়িত ছিলেন। ২০১৯ সালে নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং ২০২০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হন। তিনি পরপর দুইবার—২০২২ ও ২০২৪ সালে বিরোধীহীনভাবে পুনর্নির্বাচিত হন।

বর্তমানে, ফিলিস্তিন সংকটে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া এবং ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ায় তিনি আন্তর্জাতিকভাবে বামপন্থী রাজনীতির এক প্রগতিশীল কণ্ঠ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। চলমান বৈষম্য ও সংকটময় বিশ্বে জোহরান মামদানির মত নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আগামী দিনে কীভাবে পরিবর্তন আনবে, সে প্রশ্ন আজ সবার মনে।

প্রসঙ্গত, আগামী ৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম সিটি নিউইয়র্কের ১১১তম মেয়র নির্বাচন। সিটির ৩৬০ বছরের মেয়রের তালিকায় এরিক অ্যাডামস দ্বিতীয় কৃষ্ণাঙ্গ মেয়র, যিনি ২০২১ সালে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিসাবে নির্বাচিত হন। প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মেয়র ছিলেন ডেভিড নরম্যান ডিনকিনস। তিনি সিটির ১০৬তম মেয়র হিসাবে ১৯৯০ থেকে ১৯৯৩ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন