https://www.prothomalony.com/

13623

north-america

উত্তর আমেরিকা

নির্বাচন: ভোটাধিকার বনাম বিশ্বাসহীনতা

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৫ ০২:৩৩

স্বাধীনতার চুয়ান্ন বছর পরও বাংলাদেশে নির্বাচন একটি রাজনৈতিক উৎসবের মতোই অনুষ্ঠিত হয়। পোস্টার, মিছিল, স্লোগান, প্রতিশ্রুতি আর বক্তৃতার ঝলক। তবে এই উৎসবের ভিড়ে তরুণদের অংশগ্রহণ ও মনোযোগ ক্রমেই একধরনের দ্বিধা ও সংশয়ে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে।

একসময় প্রথমবার ভোট দেওয়া ছিল তরুণদের জন্য গর্বের বিষয়। এখন বেশি শোনা যায়—“ভোট দিলেও কি কিছু বদলায়?” এই হতাশার পেছনে রয়েছে নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট। বিরোধী দলের অনুপস্থিতি, অবাধ ভোটাধিকার প্রয়োগের ঘাটতি, প্রশাসনিক পক্ষপাত—এসব তরুণদের মনে গভীর সংশয় তৈরি করছে। তারা দেখছে, নির্বাচন হয় বটে, কিন্তু সেখানে জনগণের প্রকৃত মতামতের প্রতিফলন ঘটছে না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দেখা যাচ্ছে, তরুণদের বড় একটি অংশ রাজনৈতিক বিতর্কে অংশ নিচ্ছেন না, বা ‘নিরপেক্ষ’ থাকার অজুহাতে নীরব থাকছেন। কেউ কেউ কেবল দলান্ধতা কিংবা ট্রল সংস্কৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছেন। এই অবস্থাটা গণতন্ত্রের জন্য সতর্ক সংকেত। তরুণেরা যদি নির্বাচনকে কার্যকর রাজনৈতিক মাধ্যম হিসেবে না দেখেন, তবে ভবিষ্যতের নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হবে।

অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, স্মার্টফোন, রোবটিকস, অ্যাপনির্ভর সেবা—এসব তরুণদের জীবনে এনে দিয়েছে গতি ও সহজতা। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো প্রকল্প তাদের মধ্যে ‘আমরাও পারি’ জাতীয় আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ, পোশাক খাতের সক্ষমতা, জলবায়ু ইস্যুতে নেতৃত্ব—এসবও তরুণদের গর্বিত করে।

তবে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতায় এই গর্বে ফাটল ধরছে। রাজধানীর বাইরের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক করা তরুণ যখন তিন বছরেও একটি সাক্ষাৎকার পান না, কিংবা একজন উদ্যোক্তা সাতটি দপ্তর ঘুরেও ট্রেড লাইসেন্স পান না, তখন তিনি আর কেবল মেট্রোরেল দেখে আশ্বস্ত হন না। তরুণ সমাজ বুঝতে শিখেছে, কেবল অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, মানব উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সমতা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতাও জরুরি।

বেকারত্ব, নিম্নমানের শিক্ষা, ব্যয়বহুল স্বাস্থ্যসেবা, দুর্নীতি, বিচারহীনতা, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা—এই সব সমস্যাই উন্নয়নের ফাঁকফোকর দেখিয়ে দেয়। অনেক তরুণ এখন বুঝে গেছেন, এই উন্নয়ন যদি জীবনযাত্রার মান না বাড়ায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ না বাড়ায়—তবে তা টেকসই নয়।

তরুণ প্রজন্ম এখন রাজনীতিতে ‘নেতা বদল’ নয়, চায় ‘নীতি ও কাঠামো বদল’। এই নতুন চাওয়া থেকেই ‘সংস্কার’ শব্দটি হয়ে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা ব্যবস্থায় বাস্তবমুখিতা, চাকরির ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্বাচন, স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় ও সেবার স্বচ্ছতা, বিচারব্যবস্থায় পক্ষপাতহীনতা—এসবই তরুণদের চোখে সত্যিকারের পরিবর্তনের চিহ্ন।

বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণায় দেখা যায়, তরুণদের বড় একটি অংশ রাজনীতি নিয়ে নির্লিপ্ত হলেও সামাজিক ন্যায়বিচার, ডিজিটাল অধিকার, পরিবেশ, নারী অধিকার, জবাবদিহিতা ইত্যাদি বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিচ্ছেন। তারা ‘পলিটিক্স’ নয়, ‘পলিসি’তে বিশ্বাস করেন। অনেকেই বলেন, “আমরা নেতার নামে ভোট দিতে চাই না, নীতির ভিত্তিতে সমর্থন দিতে চাই।”

তথ্যপ্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তরুণদের বৈশ্বিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও নাগরিক অধিকার সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছে। তাই তারা সংস্কারকে আর দূরের কোনো আদর্শ নয়, প্রতিদিনের জীবনের অংশ হিসেবে দেখছেন। তারা পুলিশি হয়রানির বিরুদ্ধে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে, কিংবা নিয়োগ পরীক্ষার অব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছেন।

তরুণদের এই সচেতনতা ও প্রশ্নবোধ রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একধরনের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, তারা আর একমুখী প্রচারণায় প্রভাবিত হয় না। তারা প্রশ্ন করে, তুলনা করে, তথ্য যাচাই করে। ফলে তাদের ‘ম্যানেজ’ করা কঠিন হয়ে উঠেছে। এ কারণে অনেক দলই তরুণদের জিজ্ঞাসাকে হুমকি মনে করে। ফলে তরুণদের একটা অংশ রাজনীতি থেকে আরও দূরে সরে যায়।

কিন্তু এখনই সময় তরুণদের সঙ্গে সত্যিকারের সংলাপে বসার। রাজনৈতিক দলগুলোকে বুঝতে হবে, তরুণদের মন জিততে হলে শুধু উন্নয়ন বা প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়—সংস্কার ও জবাবদিহির স্পষ্ট রূপরেখা দিতে হবে। রাজনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য—সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তনের প্রত্যাশা পূরণে বাস্তবিক উদ্যোগ দেখাতে হবে।

তরুণদের জন্য একটি কার্যকর, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গড়ার জন্য কয়েকটি বিষয় জরুরি:
১. নির্বাচন ব্যবস্থায় সংস্কার: অংশগ্রহণমূলক, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তরুণেরা ভোট দিয়ে পরিবর্তনের আশা করতে পারে।
২. প্রশাসনিক স্বচ্ছতা: দাপ্তরিক হয়রানি, ঘুষ ও পক্ষপাত রোধে প্রযুক্তিনির্ভরতা বাড়াতে হবে।
৩. শিক্ষা ও কর্মসংস্থান: কারিগরি শিক্ষা, বাস্তবমুখী পাঠক্রম এবং মেধাভিত্তিক চাকরির সুযোগ বাড়াতে হবে।
৪. নৈতিক নেতৃত্ব: রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে মেধা, সততা ও দায়িত্বশীলতার প্রতিফলন থাকতে হবে।
৫. তরুণদের অংশগ্রহণ: কেবল ভোক্তা নয়, তরুণদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে। তাদের চিন্তাকে জায়গা দিতে হবে, কণ্ঠস্বরকে মর্যাদা দিতে হবে।

বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম একদিকে উদ্ভাবনী, প্রযুক্তি-সক্ষম ও বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী—অন্যদিকে রাজনীতির দুর্বলতা ও প্রশাসনিক সংকটে হতাশ। তারা ভোট দিতে চায়, উন্নয়ন দেখতে চায়, কিন্তু তার চেয়েও বেশি চায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নীতির ভিত্তিতে পরিবর্তন।

এই প্রজন্মকে উপেক্ষা করার অর্থ ভবিষ্যতের রাষ্ট্রকে দুর্বল করে ফেলা। এখনই সময় তরুণদের কণ্ঠ শোনার, তাদের সঙ্গে সত্যিকারের সংলাপ শুরুর। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেমন হবে—তা ঠিক করবে তরুণদের অংশগ্রহণ ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে।

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন