https://www.prothomalony.com/

13510

north-america

উত্তর আমেরিকা

ফোবানায় বিভক্তি, নেপথ্যে ‘দাওয়াত বাণিজ্য’

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৫ ০২:৪০

এক সময় উত্তর আমেরিকায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বড় ঐক্যের প্রতীক ছিল ফোবানা। বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশনস ইন নর্থ আমেরিকা। সংস্কৃতি, সমাজ, ঐতিহ্য আর পরিচয়ের মেলবন্ধনে যাত্রা শুরু করেছিল এই প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু সেই স্বপ্নের ফোবানা আজ ভেঙে গেছে কয়েক টুকরোতে। যাকে ঘিরে আজকের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শুধুই বিভক্তি, বাণিজ্যিক স্বার্থ আর ব্যক্তিকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব।

১৯৮৭ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে বিশ্বব্যাংকের একটি ক্ষুদ্র অডিটোরিয়ামে শুরু হয়েছিল ফোবানার পথচলা। ‘অদম্য বাংলাদেশে অবাক বিশ্ব’ স্লোগান নিয়ে শুরু হওয়া এই প্ল্যাটফর্মটি তখন ছিল জাতীয় সংস্কৃতির আন্তর্জাতিক বিকাশের একটি বিরল উদাহরণ। দেশের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে যুক্ত রাখার পাশাপাশি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পরিচয় তুলে ধরাই ছিল এর লক্ষ্য।

তবে সময়ের সাথে সাথে সেই মহৎ উদ্দেশ্য চাপা পড়ে গেছে ক্ষমতার লোভ, ব্যক্তিস্বার্থ এবং আর্থিক লেনদেনের জালে। বর্তমানে ৫ থেকে ৬টি ভাগে বিভক্ত হয়ে ফোবানার নামে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হচ্ছে। বছর বছর তৈরি হচ্ছে নতুন পক্ষ। মূলত একেকজন আয়োজক নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তির বলয়ে কয়েকজনকে নিয়ে দল গড়ে সম্মেলনের ঘোষণা দিচ্ছেন। এসব আয়োজনে অনেক সময় সংস্কৃতি নয়, বরং মুখ্য হয়ে উঠছে আর্থিক লেনদেন—বিশেষ করে ‘দাওয়াত বাণিজ্য’।

ভিসার সুযোগে যুক্তরাষ্ট্রে আসা, আড়ালে টাকা-পয়সার খেলা

প্রবাসীরা অভিযোগ করছেন, ফোবানার ছত্রছায়ায় বাংলাদেশ থেকে অতিথি আনার নামে প্রতি বছর আয়োজকরা দাওয়াতের নামে লক্ষাধিক টাকা আদায় করছেন। ফোবানার নামে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসার প্রক্রিয়ায় কোটি কোটি টাকা লেনদেন হয়। অনেক সময় এই আমন্ত্রণ পত্রই ভিসা পেতে একটি প্রধান উপাদান হিসেবে কাজ করে। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আয়োজকরা নানা ধরনের টাকার লেনদেন চালিয়ে যাচ্ছেন। যা প্রবাসী সমাজের মধ্যে নানা ধরনের অবৈধ ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্ম দিয়েছে।

অনেকে ফোবানার অনুষ্ঠানে অতিথি হওয়ার নামে বাংলাদেশ থেকে আসার জন্য প্রচুর অর্থ দিয়ে থাকেন। আয়োজকরা তাদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিয়ে আমন্ত্রণপত্র, ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়। অনেক সময় এমনকি ভিসার আবেদন প্রক্রিয়ায় সাহায্য করার নাম করে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। এতে করে সাধারণ মানুষ যেখানে স্বপ্ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসার চেষ্টা করেন, সেখানে ‘দাওয়াত বাণিজ্য’ একটি মুনাফার ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।

এই প্রক্রিয়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ভিসা পেয়ে আসা অনেকেই আদতে ফোবানার আসল সংস্কৃতি বা ঐক্যবদ্ধতার অংশ হন না। তারা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য বা সময় শেষে বিদেশে থাকার সুযোগ পাওয়ার জন্য এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। এতে মূলত আয়োজকরা আর্থিক লোভে উৎসাহী হয়ে পুরো অনুষ্ঠানকে বাণিজ্যিক রূপে রূপান্তরিত করেছেন।

এই ‘দাওয়াত বাণিজ্য’ অনেক সময় প্রবাসী সমাজের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যা তৈরি করে। কেউ কেউ ভিসার সুযোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসে সমাজের মধ্যে সংহতি ও ঐক্যের পরিবর্তে বিভাজন ও দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেন। অনেক সময় এই অতিথিরা সমাজের স্বাভাবিক নিয়মকানুন অমান্য করে নানা রকম সামাজিক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ান। এতে প্রবাসী কমিউনিটির সম্মান ক্ষুণ্ণ হয়।

প্রবাসীরা বলছেন, আসলে ফোবানার আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ছিল বাংলাদেশি সংস্কৃতি, ঐক্য ও একাত্মতার প্রচার। কিন্তু ‘দাওয়াত বাণিজ্য’ ও অর্থ লেনদেনের ছায়ায় তা আজ হারিয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ না হলে, ভবিষ্যতে ফোবানা সম্মেলনের গুরুত্ব ও মর্যাদা দিন দিন কমে যাবে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

তাই অনেক সচেতন প্রবাসী ও বিশ্লেষক দাবি করেন, ফোবানার আয়োজনকে বাণিজ্যিক মঞ্চ থেকে মুক্ত করে আবার ঐক্যবদ্ধ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে হবে। যাতে প্রকৃত অর্থে প্রবাসী সমাজের উন্নয়ন, সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও একাত্মতা বজায় রাখা যায়। অন্যথায়, আজকের বিভাজন ও লোভ-লোভিতেয়া ফোবানার ভবিষ্যতকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করবে।

আটলান্টায় নতুন ফোবানা আয়োজনে আগ্রহ কম প্রবাসীদের

আগামী ২৯ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত জর্জিয়ার আটলান্টায় অনুষ্ঠিতব্য নতুন ফোবানা কনভেনশনের ঘোষণা দিয়েছে একটি পক্ষ। আয়োজকরা দাবি করছেন, এতে অংশগ্রহণ করবে প্রায় ৮০টি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে এই নতুন আয়োজনে দেখা যাচ্ছে তেমন উৎসাহ নেই।

বিভক্ত ফোবানা সম্মেলনের কারণে অনেক প্রবাসী এ আয়োজন নিয়ে বিভ্রান্ত ও হতাশ। তারা বলছেন, একেকবার একেক গ্রুপ ফোবানা করে। আরেকবার হয় নতুন কোন আয়োজক। ফলে আমরা বুঝতে পারছি না আসল ফোবানা কোনটি। এর ফলে আয়োজনে আগ্রহও কমে যাচ্ছে।

ভার্জিনিয়ায় বসবাসরত এক প্রবাসী বলেন, যেখানে একসময়ে ফোবানা ছিল ঐক্যের মঞ্চ, এখন সেখানে শুধু বিভক্তি আর বাণিজ্যের ঝক্কি। তিনি আরও বলেন, এই বিভক্তি ও অর্থের লোভের কারণে আয়োজনের মূল সার্থ ও মান অনেক নিচে নেমে গেছে।

অন্যদিকে, আটলান্টায় নতুন কনভেনশন আয়োজকরা মনে করেন, তাদের আয়োজন প্রবাসী সমাজকে নতুন করে একত্রিত করবে এবং একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে। তবে প্রবাসীদের মনোভাব এখনো শঙ্কাময় বলে মত সংশ্লিষ্টদের।

মান কমেছে ফোবানার 

নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি, টেক্সাস, ভার্জিনিয়া—যেখানেই হোক না কেন, প্রবাসীরা এখন ফোবানা নিয়ে হতাশ। কেউ কেউ বলছেন, আগে যেখানে সম্মেলনে দেশ-বিদেশের বিশিষ্টজনেরা আসতেন, গুরুত্বপূর্ণ সভা-সেমিনারে আলোচনা হতো, সেখানে এখন তা সীমিত কয়েকজনের বিনোদনে আটকে গেছে। অনেক সময় তা রুচির বাইরে চলে যায়। এমনকি বিভিন্ন স্টেট থেকে যেসব সংস্কৃতিকর্মী আসেন তাদের যোগ্যতা নয়, বরং পরিচিতি, প্রভাব ও ‘সেটিং’-এর ভিত্তিতে সুযোগ মেলে।

সচেতন প্রবাসীরা বলছেন, সব কিছু ছাপিয়ে এখন ফোবানা যেন হয়ে উঠেছে স্ট্যাটাস দেখানোর মাধ্যম। কেউ কেউ এমনও আছেন যারা ব্যক্তিগত খরচে হলেও ফোবানা করতে চান। যাতে করে সমাজে প্রভাব বিস্তার করা যায়। আর এসব আয়োজনের নেপথ্যে রয়েছে ইগোর সংঘাত। একেকজন আয়োজকের মাঝে থাকে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, কে কার চেয়ে বড়—সে প্রতিযোগিতা।

ফোবানার সূচনালগ্নে এর উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং প্রবাসী নতুন প্রজন্মকে শিকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত রাখা। কিন্তু এখন তা একরকম ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে—যেখানে থাকে উচ্চমূল্যের টিকিট, কর্পোরেট স্পনসরশিপ, গালা ডিনার আর বিজ্ঞাপনভিত্তিক লাভের হিসাব। আগে যেখানে বাংলাদেশের গান, নৃত্য, সাহিত্য থাকতো, সেখানে এখন থাকে শুধুই রঙচঙে উপস্থাপনা। অনুষ্ঠান হয়, কিন্তু তাতে প্রাণ থাকে না।

ফোবানার অতীত গৌরব স্মরণ করে প্রবাসীরা আজ আক্ষেপ করেন। কেউ কেউ এখনো আশা করেন, কোনো একদিন এই বিভক্তি ও ব্যবসায়িক ছায়া কাটিয়ে আবারও ঐক্যের প্ল্যাটফর্মে ফিরবে ফোবানা। তবে তার জন্য দরকার নেতৃত্বে সততা, উদ্দেশ্যে স্বচ্ছতা এবং সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা করার মানসিকতা।
 

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন