https://www.prothomalony.com/
13379
north-america
পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জিত প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তান চার দিনের সংঘর্ষ ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপের পর গত শনিবার (১০ মে) যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। তবে যুদ্ধ বিরতির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সীমান্ত শহরগুলোতে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে। জম্মু ও কাশ্মীরে, যেখানে মূলত সংঘর্ষ চলছে, সেখানে আর্টিলারি হামলা ও আক্রমণ ড্রোন দেখা গেছে। শহরগুলোতে ব্ল্যাকআউটের মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিস্ফোরণ শোনা যায়, যা আগের রাতের মতোই ছিল বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় বাসিন্দা ও রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শীরা।
গত শনিবার রাত ১১টার কিছুক্ষণ আগে নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করেন বিক্রম মিশ্রি। তিনি বলেন, ‘শনিবার সন্ধ্যায় যুদ্ধবিরতি-সংক্রান্ত যে সমঝোতা হয়েছে পাকিস্তান তা বারবার লঙ্ঘন করছে। ভারতের সশস্ত্র বাহিনী পাকিস্তানের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ‘যথাযথ ও উপযুক্ত’ জবাব দিচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা পাকিস্তানকে আহ্বান জানাই, যাতে তারা এসব লঙ্ঘনের বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেয় এবং দায়িত্বশীলতা ও গুরুত্বের সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দেয়।’
পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দেশটি যুদ্ধবিরতিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং লঙ্ঘনের জন্য ভারতকে দায়ী করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমাদের বাহিনী দায়িত্বশীলতা ও সংযমের সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে।’
মন্ত্রণালয় আরও জানায়, মাটিতে মোতায়েন সৈন্যদের সংযম দেখানোর আহ্বান জানানো হয়েছে এবং যুদ্ধবিরতির বাস্তবায়নে কোনো সমস্যা হলে তা উপযুক্ত স্তরে যোগাযোগের মাধ্যমে সমাধান করা উচিত।
দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে প্রায় তিন দশকের মধ্যে এবারকার সংঘর্ষ সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল, যা বিশ্বের অন্যতম অস্থিতিশীল ও ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
কিছুক্ষণের জন্য পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কাও দেখা দেয়। কারণ পাকিস্তান সেনাবাহিনী জানিয়েছিল, তাদের পারমাণবিক অস্ত্র তদারককারী শীর্ষ সংস্থা বৈঠকে বসবে। তবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পরে জানান, এমন কোনো বৈঠকের সময়সূচি নেই। এর আগে রাতে ভারী লড়াইয়ে দুই দেশ একে অপরের সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায় এবং বেসামরিক প্রাণহানি বেড়ে ৬৬-এ পৌঁছায়।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার এক্সে পোস্ট করে জানান, পাকিস্তান ও ভারত তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। পাকিস্তান সব সময় এই অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য চেষ্টা করেছে, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার সঙ্গে আপস না করেই!
এর আগে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিস্রী জানান, দুই দেশের সামরিক অপারেশন প্রধানরা ফোনে কথা বলে বিকেল ৫টা (ভারতীয় সময়) থেকে সব ধরনের লড়াই বন্ধ করার বিষয়ে একমত হন।
ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে কয়েক সপ্তাহের তীব্র সামরিক সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। তবে, যুদ্ধবিরতির কথা সবার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এক্সে লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দীর্ঘ আলোচনার পর আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, ভারত ও পাকিস্তান একটি পূর্ণাঙ্গ ও তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। সাধারণ জ্ঞান ও চমৎকার বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের জন্য আমি উভয় দেশকে অভিনন্দন জানাই।’
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, তিনি ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গত ৪৮ ঘণ্টায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্কর, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির এবং দুই দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
ইশাক দার জিও নিউজকে জানান, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক যোগাযোগ ও হটলাইন চালু করা হয়েছে এবং তিন ডজনেরও বেশি দেশ এই চুক্তি বাস্তবায়নে সহায়তা করেছে।
এক্সে পোস্টে মার্কো রুবিও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে যুদ্ধবিরতির চুক্তির জন্য প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘এতে শুধু তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতিই নয়, বরং একটি নিরপেক্ষ স্থানে বিস্তৃত বিষয়ে আলোচনা শুরু করার কথাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।’
যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও দুটি ভারতীয় সরকারি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে যে, ভারত কর্তৃক ঘোষিত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং পাকিস্তান কর্তৃক প্রতিদানে বাণিজ্য স্থগিতাদেশ এবং ভিসা বাতিলকরণ আপাতত বহাল থাকবে। সূত্রগুলো বলেছে, ‘১৯৬০ সালের সিন্ধু নদীর পানি চুক্তি, যা কাশ্মীর হামলার পর ভারত স্থগিত করেছিল, তা এখনও স্থগিতই থাকবে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।’
ভারত জানায়, ভারতীয় কাশ্মীরে হিন্দু পর্যটকদের উপর হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার দুই সপ্তাহ পর তারা পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সন্ত্রাসী অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। তবে, পাকিস্তান ভারতের এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, ওই হামলায় তাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। এরপর দুই দেশের মধ্যে গোলাবর্ষণ, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলতে থাকে। টানা প্রায় তিন দিনের সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছে শতাধিক মানুষ। ধ্বংস হয়েছে একাধিক যুদ্ধ বিমান। ড্রোন ধ্বংস হয়েছে কয়েক ডজন।
এদিকে, যুদ্ধবিরতি ভারত ও পাকিস্তান- উভয় গ্রহণ করার পর পাকিস্তানের বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের আকাশসীমা সম্পূর্ণভাবে খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে পরে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনায় ভারতে উদ্বেগ দেখা দেয়।
‘এই যুদ্ধবিরতির কী হলো? শ্রীনগরজুড়ে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে!’ - এক্সে লিখেছেন জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ। তিনি আরও বলেন, ‘এটা কোনো যুদ্ধবিরতি নয়। শ্রীনগরের মাঝখানে বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিট গুলি চালানো শুরু করেছে।’
ভারত ও পাকিস্তান ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই কাশ্মীর নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে আছে। হিন্দু-প্রধান ভারত ও মুসলিম-প্রধান পাকিস্তান উভয়েই কাশ্মীরের একাংশ শাসন করে, তবে তারা পুরো এলাকাটির দাবি করে। এ নিয়ে তারা তিন বার যুদ্ধে জড়িয়েছে, যার মধ্যে দুই বারই কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে, পাশাপাশি অসংখ্য ছোট ছোট যুদ্ধের ঘটনাও ঘটেছে। ভারত বলে, ‘১৯৮৯ সালে শুরু হওয়া কাশ্মীরে সশস্ত্র বিদ্রোহের জন্য পাকিস্তান দায়ী, যা এখন পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষের প্রাণ নিয়েছে।’ এছাড়া ভারতের বিভিন্ন জায়গায় জঙ্গি হামলার জন্য পাকিস্তানি ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোকেও দায়ী করা হয়।
তবে, পাকিস্তান এই অভিযোগ অস্বীকার করে। তাদের দাবি, তারা কেবল কাশ্মীরি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নৈতিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে থাকে।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন