https://www.prothomalony.com/
13366
north-america
প্রকাশ: ১১ মে ২০২৫ ১১:২৯
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ২০২২ সালের পর সবচেয়ে খারাপ সময় পার করছে। কারণ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বড় বড় নীতিগত পরিবর্তনে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীরা চিন্তিত হয়ে পড়েছে। বাণিজ্য বিভাগের গত বুধবারের (মে ৭) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) যা অর্থনীতিতে উৎপাদিত সব পণ্য ও সেবার পরিমাণ পরিমাপ করে, তা প্রথম ত্রৈমাসিকে বার্ষিক হারে -০ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। চতুর্থ ত্রৈমাসিকের ২ দশমিক ৪ শতাংশ হারের তুলনায় এটি একটি তীব্র ধীরগতি এবং অর্থনীতিবিদরা যে ০ দশমিক ৮ শতাংশ হারের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, তার চেয়েও অনেক খারাপ। জিডিপির হিসাব, মৌসুমভিত্তিক ওঠানামা ও মুদ্রাস্ফীতি অনুযায়ী সমন্বয় করা হয়।
জিডিপি- রিলিজের পর মার্কিন স্টক মার্কেট পড়ে যায়।
গত কয়েক মাস ধরে ট্রাম্প প্রশাসন যেভাবে বেপরোয়া হারে শুল্ক আরোপ করেছে, তা চীনের সঙ্গে বাণিজ্য উত্তেজনা বাড়িয়েছে এবং মার্কিন জনগণের মধ্যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। বেশিরভাগ অর্থনীতিবিদ মনে করেন, বৈশ্বিক বাণিজ্য নতুন করে সাজানোর ট্রাম্পের বৃহৎ প্রচেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতি বাড়াবে এবং এমনকি মন্দারও কারণ হতে পারে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই দুর্বল অর্থনৈতিক পারফরম্যান্সের দায় নিজের উপর নেননি। তিনি গত বুধবার সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে বলেন, ‘আমাদের দেশ আরও বুম করবে, কিন্তু আমাদের বাইডেনের ‘ওভারহ্যাং’ দূর করতে হবে। এটা সময় নেবে, শুল্কের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই, সবটাই তার খারাপ সংখ্যার জন্য। কিন্তু যখন বুম শুরু হবে, সেটা হবে নজিরবিহীন। কাজেই ধৈর্য ধরুন।’
বুধবার একটি মন্ত্রিসভা বৈঠকে ট্রাম্প তার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন, ‘এটা বাইডেনের দোষ, ট্রাম্পের নয়।’
বছরের শুরুতে অর্থনীতির পতনের পেছনে মূলত ছিল বাণিজ্য ঘাটতির বিস্তার - যা হয়েছিল আমেরিকানরা ট্রাম্পের শুল্ক চালুর আগেই পণ্য কিনে ফেলার কারণে, এবং সরকারি ব্যয়ে কাটছাঁট। একটি প্রতিবেদনে এমনটাই জানানো হয়েছে। আমদানি চতুর্থ ত্রৈমাসিকে -১ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে লাফিয়ে ৪১ দশমিক ৩ শতাংশে-পৌঁছায় বছরের প্রথম তিন মাসে। এদিকে রপ্তানি ছিল ১ দশমিক ৮ শতাংশ হারে। যখন আমদানি রপ্তানির চেয়ে বেশি হয়, তখন সেটা জিডিপি থেকে কেটে নেওয়া হয়। এবার বছরের প্রথম তিন মাসে আমদানি-রপ্তানির এই পার্থক্য জিডিপিকে সবচেয়ে বেশি কমিয়েছে- ১৯৪৭ সালের পর থেকে এমনটা আর কখনও হয়নি।
ট্রাম্পের শীর্ষ বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারো জিডিপি রিপোর্টকে ‘আমার জীবনে দেখা সেরা নেতিবাচক মুদ্রণ’ বলে অভিহিত করেছেন। গত ত্রৈমাসিকে দেশীয় বিনিয়োগের তীব্র বৃদ্ধির দিকে ইঙ্গিত করে বুধবার সিএনবিসি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নাভারো বলেন, ‘বাজারের উচিত ভেতরের দিকটা দেখা।’
তবে, বাণিজ্য দপ্তর জানায়, এর বেশিরভাগই এসেছে শুল্কের আগে ব্যবসায়গুলি তাদের মজুদ বৃদ্ধি করার কারণে।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম ত্রৈমাসিকের জিডিপি প্রতিবেদনে কিছু দুর্বলতা দেখা গেলেও কিছু ইতিবাচক দিকও ছিল। ভোক্তা ব্যয়, যা মার্কিন অর্থনীতির প্রায় ৭০ শতাংশ চালায়, তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ১ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে, যেখানে আগের ত্রৈমাসিকে ছিল ৪ শতাংশ। এই ধীরগতি মূলত আমেরিকানদের পণ্যের উপর ব্যয় কমানোর কারণে হয়েছিল এবং ২০২৩ সালের মাঝামাঝির পর সবচেয়ে দুর্বল হার হিসেবে ধরা পড়েছে। একই সময়ে, সরকারি ব্যয়ও অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে- ফেডারেল ব্যয় কমে হয়েছে ৫ দশমিক ১ শতাংশ, যেখানে আগে ছিল ৪ শতাংশ। অন্যদিকে, ব্যবসায়িক খাতে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ব্যবসায়িক বিনিয়োগ ৯ দশমিক ৮ শতাংশ হারে বেড়েছে, যা আগের -৩ শতাংশ থেকে বড় ধরনের উত্থান। মোট বেসরকারি অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়কালে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৯ শতাংশ- ২০২১ সালের শেষের পর থেকে সর্বোচ্চ।
ভোক্তা চাহিদার একটি মূল সূচক, ‘ফাইনাল সেলস টু প্রাইভেট ডোমেস্টিক পার্চেসার্স’ প্রথম ত্রৈমাসিকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ শতাংশ, আগের ত্রৈমাসিকে যা ছিল ২ দশমিক ৯ শতাংশ। হোয়াইট হাউজ এই তথ্যকে ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের পর ‘শক্তিশালী অর্থনৈতিক গতি’র প্রমাণ হিসেবে দেখছে।
তবে মুদ্রাস্ফীতির হার আশঙ্কার বিষয় হয়ে উঠেছে। ব্যক্তিগত ভোগ্যপণ্যের মূল্য সূচক (পিসিই) ত্রৈমাসিকে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে, যা আগের ত্রৈমাসিকে ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ। খাদ্য ও জ্বালানি বাদ দিয়ে মূল পিসিই সূচক ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে, আগের ২ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে।
হোয়াইট হাউজের দাবি, বাইডেন প্রশাসনের অর্থনৈতিক ধাক্কা এখনো প্রবৃদ্ধিকে কিছুটা আটকে রাখলেও ট্রাম্পের নেতৃত্বে অর্থনীতি নতুন গতি পাচ্ছে। প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট একে ‘নতুন সোনালি যুগ’-এর সূচনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এই চিত্র অর্থনীতির একটি মিশ্র বার্তা দেয়- যেখানে কিছু খাতে দুর্বলতা থাকলেও বিনিয়োগ ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে একটি ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সর্বশেষ জিডিপি প্রতিবেদনটি গত বছরের তুলনায় অর্থনীতির অনেক দুর্বল চিত্র তুলে ধরলেও এর মানে এই নয় যে আমেরিকা এখনই মন্দার মধ্যে রয়েছে। যদিও জনমত জরিপ ও মতামত অনুযায়ী অনেকের কাছে পরিস্থিতি মন্দার মতো মনে হতে পারে। তবুও অর্থনীতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক এখনো ভালো অবস্থায় রয়েছে।
সরকারি তথ্যানুযায়ী, মার্চ মাসে বেকারত্বের হার ছিল ৪ দশমিক ২ শতাংশ যা এখন তুলনামূলকভাবে কম। ভোক্তা ব্যয় স্থিতিশীল ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগ চলছে।
তবে অর্থনীতি দ্রুত খারাপ দিকে মোড় নিতে পারে, বিশেষ করে যদি ট্রাম্প তাঁর শুল্ক নীতিগুলো আরও কঠোর করেন। আর্নেস্ট অ্যান্ড ইয়ংয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ গ্রেগরি ড্যাকো সিএনএন-কে বলেন, ‘এই তথ্য দিয়ে এখনই মন্দা বলা যায় না। তবে এটা পরিষ্কার যে, আমরা একদম সূক্ষ্ম এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি - যত দিন শুল্ক থাকবে, ততই অর্থনৈতিক সংকটের সম্ভাবনা বাড়বে।’
একটি আলাদা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি খাতে নিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যা ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ভালো লক্ষণ নয়।
বুধবার প্রকাশিত এডিপির রিপোর্ট অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে মাত্র ৬২ হাজারটি নতুন চাকরি যোগ হয়েছে, যেখানে মার্চে যোগ হয়েছিল ১ লাখ ৪৭ হাজারটি।
এডিপির প্রধান অর্থনীতিবিদ নেলা রিচার্ডসন বলেন, ‘আজকের মূল শব্দ হলো ‘উদ্বেগ’। নীতিনির্ধারণী অনিশ্চয়তা এবং ভোক্তাদের মনোভাব মিলিয়ে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।’
সাধারণভাবে মন্দার একটি নিয়ম হলো, পরপর দুই ত্রৈমাসিকে জিডিপি ঋণাত্মক হলে সেটাকে মন্দা ধরা হয় - যা এখনো ঘটেনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রে মন্দা নির্ধারণের আনুষ্ঠানিক দায়িত্বে আছে ‘ন্যাশনাল বুরো অফ ইকোনোমিক রিসার্চ(এনবিইআর), যাদের সিদ্ধান্ত অনেক সময় মন্দা শুরু হওয়ার কয়েক মাস পর আসে। যুক্তরাষ্ট্র সর্বশেষ মন্দার মুখোমুখি হয়েছিল ২০২০ সালে, কোভিড-১৯ মহামারির কারণে, যা মাত্র দুই মাস স্থায়ী হয়। তার আগে ছিল ‘গ্রেট রিসেশন,’ যা ডিসেম্বর ২০০৭ থেকে জুন ২০০৯ পর্যন্ত চলেছিল এবং এটি ছিল ১৯৩০’-এর মহামন্দার পর সবচেয়ে গুরুতর অর্থনৈতিক সংকট।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন