https://www.prothomalony.com/
13358
opinion
যুদ্ধ কখনোই শান্তির সমাধান নয়। ইতিহাস বারবার তার সাক্ষ্য দিয়েছে। ধর্ম শান্তির কথা বলে, মানবতার কথা বলে। কিন্তু ইতিহাসের পরতে পরতে দেখা যায়, ধর্মের নামেই হয়েছে সবচেয়ে বেশি রক্তপাত। বিশ্বাস, পরিচয় ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে বারবার ক্ষতবিক্ষত হয়েছে মানবজাতি। আজ যখন ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজমান, তখন অতীতের এই অভিশপ্ত ধারাগুলো আমাদের নতুন করে ভাবিয়ে তোলে।
ধর্মীয় বিশ্বাস ও জাতিগত পরিচয়কে কেন্দ্র করে উপমহাদেশে বারবার রক্ত ঝরেছে। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর উপমহাদেশ যে বিভক্ত হলো, তা কোনো সমাধান এনে দেয়নি। বরং জন্ম দিল স্থায়ী শত্রুতার। ১৯৪৭-এর বিভাজন লাখো প্রাণ কেড়ে নিলো, লাখো মানুষকে পরিণত করল উদ্বাস্তুতে। কিন্তু তাতেও শেষ হয়নি বিদ্বেষ। এরপর ১৯৬৫, ১৯৭১, ১৯৯৯—প্রতিবারই অস্ত্রের মুখোমুখি হয়েছে দুই প্রতিবেশী। যুদ্ধ শেষ হয়েছে, কিন্তু শান্তি আসেনি।
সাম্প্রতিক সময়ে আবারও যুদ্ধের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে উপমহাদেশের আকাশে। সীমান্তে গোলাগুলি, বোমা হামলা, পাল্টা জবাব—এ যেন পুরনো চিত্রনাট্যের নতুন দৃশ্য। দুই দেশের রাজনৈতিক নেতারা একে অপরকে দোষারোপ করছেন, কূটনৈতিক সম্পর্ক খারাপের দিকে যাচ্ছে, মিডিয়া যুদ্ধের ঢাক বাজাচ্ছে, আর সাধারণ মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
এ যেন যুদ্ধকে উস্কে দেওয়ার প্রতিযোগিতা। অথচ এই ‘জাতীয়তাবাদী’ রণহুংকারের আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর, যারা শান্তি চায়, নিরাপত্তা চায়, উন্নয়ন চায়।
যুদ্ধ কখনোই সমস্যার সমাধান দিতে পারেনি। যুদ্ধ মানেই মৃত্যু, ধ্বংস আর হাহাকার। বোমা ছোঁড়ার পর যে শিশুর প্রাণ ঝরে যায়, সে হিন্দু না মুসলিম—এতে কিছু যায় আসে না। মায়ের কোল খালি হয়ে গেলে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্যই তার শোককে সান্ত্বনা দিতে পারে না। অথচ রাজনীতিবিদরা এসব মানবিক ব্যথাকে নিছক ‘কোলেটারাল ড্যামেজ’ বলে এড়িয়ে যান।
ধর্ম নিয়ে রাজনীতি, জাতীয়তাবাদকে উস্কে দেওয়া, শত্রুর ছায়া তৈরি করে জনমত নিয়ন্ত্রণ—এই পুরনো ফর্মুলা থেকে আমরা এখনো বের হতে পারিনি। ভারত ও পাকিস্তানের রাজনীতির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, অভ্যন্তরীণ সংকট এড়াতে ‘বাইরের শত্রু’ সৃষ্টি করা একটা প্রচলিত কৌশল। বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, দুর্নীতি, সংখ্যালঘু নিপীড়ন—এসব বাস্তব সমস্যা থেকে জনগণের দৃষ্টি সরাতে যুদ্ধের উত্তেজনা তৈরি করা হয়। মিডিয়া সেই আগুনে ঘি ঢালে।
অথচ এই দুই দেশের জনগণের মধ্যে কোনো ঘৃণা নেই। সীমান্তের দুই প্রান্তে বাস করা মানুষ একে অপরকে নিয়ে কৌতূহলী, শ্রদ্ধাশীল। ভাষা, সংস্কৃতি, খাবার, গান—সবকিছুতেই অদ্ভুত মিল। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে যখন যুদ্ধের কথা বলা হয়, তখন ওই সাধারণ মানুষগুলোই হয় শিকার।
এই অবস্থায় দরকার গণসচেতনতা। দরকার দুই দেশের নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, লেখক, শিল্পী, তরুণ প্রজন্মের জোরালো ভূমিকা। যুদ্ধ নয়, শান্তির পক্ষে, মানবতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার সময় এখনই। যুদ্ধ বাধলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দুই দেশই। জয়-পরাজয়ের পরিসংখ্যান যতই দেওয়া হোক, মানুষের কান্না কোনো সংখ্যা বোঝে না।
মানবতা যেন রাজনীতির কূটচালের বলি না হয়। সত্য, ন্যায়, শান্তির পক্ষে মানুষকে দাঁড়াতে হবে। শুধু নেতা বদলালে চলবে না, মানসিকতার বদল জরুরি। ধর্ম মানুষকে বিভক্ত করার বিষয় হতে পারে না, যে ধর্ম মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়, সেই ধর্মচর্চা দরকার।
পাকিস্তান-ভারতের এই উত্তেজনাকর মুহূর্তে আমাদের আরও উচ্চকণ্ঠ হতে হবে। শান্তির আহ্বান ছড়াতে হবে সামাজিক মাধ্যমে, রাস্তায়, সভা-সেমিনারে, মঞ্চে, কবিতায়, গানে, কার্টুনে—সব জায়গায়। সত্যকে তুলে ধরতে হবে সাহসের সঙ্গে, কারণ যুদ্ধ শুরু হলে প্রথম মৃত্যু হয় সত্যেরই।
উপমহাদেশকে আর কোনোভাবেই নব্য পরাশক্তির খেলার মাঠ হতে দেওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অনেক বড় শক্তি এই অঞ্চলের উত্তেজনাকে পুঁজি করে ফায়দা লুটতে চায়। অস্ত্র ব্যবসা, প্রভাব বিস্তার কিংবা ভূরাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুই এই অঞ্চলের অস্থিরতা থেকে লাভবান হয়। ফলে যুদ্ধের আগুনে যেন বাইরের কারও রুটি না সেঁকা যায়, সে সতর্কতা এখনই নিতে হবে।
মানুষই পারে ঘৃণার এই বৃত্ত ভাঙতে। মানুষই পারে ভালোবাসার সেতু গড়তে। রাজনীতির শত্রু-বন্ধুর ফ্রেম ভেঙে মানুষ যদি মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে শান্তির সম্ভাবনা অটুট থাকে।
শেষ কথা হলো—যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই। অস্ত্র নয়, আলোচনার টেবিল চাই। ঘৃণা নয়, ভালোবাসা চাই। কারণ আমরা সবাই মানুষ, এবং সবার আগে মানবতা।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন