https://www.prothomalony.com/

13294

north-america

উত্তর আমেরিকা

শ্রমিক না থাকলে শ্রম নেই, শ্রম না থাকলে দেশ নেই

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৫ ০৩:৫৬

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস, যা 'মে দিবস' হিসেবেও পরিচিত, প্রতি বছর ১লা মে বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয়। এই দিনটি মূলত শ্রমিকদের অধিকার আদায় ও তাদের সংগ্রাম স্মরণে উৎসর্গিত। এক সময় শ্রমিকরা মানবিকতার নিচে থাকা শর্তে কাজ করতেন—প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা, সপ্তাহে ৬ দিন। কিন্তু এর বিনিময়ে তাদের মজুরি ছিল খুবই সামান্য, আর জীবনযাপন ছিল অমানবিক। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ জমতে থাকে। ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে শ্রমিকেরা আট ঘণ্টা কর্মদিবস দাবিতে ধর্মঘট ও মিছিল শুরু করেন। এই আন্দোলন চলাকালে ৪ঠা মে, যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটে শ্রমিকদের মিছিল সমাবেশে হঠাৎ পুলিশ দলের কাছে এক বোমার বিস্ফোরন ঘটে, এতে এক পুলিশ নিহত হয়। এই ঘটনার পর পুলিশ গুলি চালায়, এবং সংঘর্ষে ১১ জন শ্রমিক শহীদ হন। এই রক্তাক্ত অধ্যায়ের মধ্য দিয়েই মে দিবস হয়ে ওঠে শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য প্রতীক।  ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক কংগ্রেসে ১লা মে-কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর থেকে বিশ্বজুড়ে শ্রমিক সংগঠন ও সাধারণ শ্রমজীবীরা মিছিল, সমাবেশ, ও বিভিন্ন দাবিদাওয়ার মাধ্যমে দিনটি পালন করে আসছে। এই দিনটি শুধু একটি স্মরণ নয়—এটি শ্রমিকদের ঐক্য, সংগ্রাম, অধিকার ও সম্মানের প্রতীক। ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও কর্মঘণ্টা নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো আজও এই দিনের তাৎপর্যকে সামনে নিয়ে আসে।

 

শ্রমিকদের কথা এলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে শত সহস্র ক্লান্ত মানুষ—যারা ভোরের আলো ফোটার আগেই রাস্তায় নামেন, যাদের ঘামে গড়ে উঠেছে আমাদের অর্থনীতির ভিত্তি। অথচ তাদের জীবনে নেই নিরাপত্তা, নেই ন্যায্য পারিশ্রমিক, নেই স্থায়ী স্বস্তি। 

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পেছনে গার্মেন্টস খাত একটি প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে এ খাত ক্রমাগত বিস্তার লাভ করে, আজ আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প বিশ্বে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে রয়েছে শ্রমিকদের কঠিন জীবনসংগ্রাম, নিম্ন মজুরি, এবং নিরাপত্তাহীন কর্মপরিবেশ। মে দিবসের প্রেক্ষিতে শ্রমিকদের অবস্থা, তাদের অধিকার এবং আমাদের সামাজিক দায়িত্ব নিয়ে ভাবার এখনই সময়।

 

বাংলাদেশে টেক্সটাইল শিল্পের বিকাশ, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, শিল্পটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানা রকম পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। ১৯৭০-এর দশকে বাংলাদেশের রেডিমেইড গার্মেন্টস খাত মূলত ক্ষুদ্র ব্যবসার পর্যায়ে ছিল, যেখানে ছোট ছোট দর্জির দোকানগুলো অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে কাজ করত। ১৯৭২ সালে 'বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্টারপ্রাইজ (ন‍্যাচারালাইজেশন)' আদেশ জারি হলে, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ পাট ও টেক্সটাইল মিলগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত মালিকানায় চলে যায়।

১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে বৈশ্বিক রপ্তানিমুখী পোশাক খাতে প্রবেশ করে, তখন দেশে মাত্র নয়টি গার্মেন্টস কারখানা ছিল এবং রপ্তানি আয় ছিল মাত্র ০.০৬৯ মিলিয়ন ডলার। ওই বছরই রিয়াজ গার্মেন্টস লিমিটেড ১০,০০০ ওভেন শার্ট ফ্রান্সে সরবরাহ করে এই রপ্তানি যাত্রার পথপ্রদর্শক হয়। ১৯৭৯ সালে দেশ গার্মেন্টস লিমিটেড রপ্তানি বাজারে যুক্ত হয়। এরপর ১৯৮০ সালে, বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান ট্রেক্সিম লিমিটেড এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়ংওয়ান করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে একটি গার্মেন্টস কারখানা স্থাপিত হয়।  ১৯৮১ সালের মধ্যেই প্রায় ৩০০টি ছোট ও মাঝারি আকারের টেক্সটাইল কোম্পানি গড়ে ওঠে এবং নতুন শিল্পনীতি(নিউ ইন্ডাসট্রিয়াল পলিসি-এনআইপি) বেসরকারিকরণকে গুরুত্ব দেয়। ১৯৮৩ সালে বৈদেশিক বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (ইপিযি) চালু করা হয়। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ মাল্টি-ফাইবার অ্যারেঞ্জমেন্ট চুক্তির অধীনে কোটামুক্ত সুবিধা লাভ করে, যার ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগমন এবং যৌথ উদ্যোগ ও সম্পূর্ণ বিদেশি মালিকানাধীন গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল কারখানার পথ উন্মুক্ত হয়। ১৯৮৬ সালে মাল্টি-ফাইবার অ্যারেঞ্জমেন্ট কোটার মাধ্যমে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক বাজারে আরও প্রবেশাধিকার লাভ করে এরপর ১৯৯১ সাল থেকে বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস রপ্তানি খাত অভাবনীয়ভাবে প্রসারিত হতে থাকে, যা আজ দেশের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।

উন্নয়নের ইঞ্জিন হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত, রেডিমেইড গার্মেন্স শিল্পের উত্থান ছিল বিস্ময়কর। ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির মধ্যে পোশাক খাতের অংশ ছিল মাত্র ৪ শতাংশেরও কম। এক দশকের মধ্যেই এই অংশ বাড়ে ৬০ শতাংশে, এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় সর্বোচ্চ ৮৪ শতাংশে। ফলে বাংলাদেশ এখন সারা বিশ্বে চীনের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক, এবং দেশজুড়ে প্রায় চার মিলিয়ন শ্রমিক এই শিল্পে নিযুক্ত। এ শ্রমিকদের ৮০ শতাংশ নারী। কম মজুরি এবং শ্রমনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশ দ্রুত বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করেছে, কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি গঠিত হয়েছে শ্রমিকদের ওপর নির্ভর করে—যারা কাজ করেন অত্যন্ত সীমিত সুরক্ষা ও স্বল্প পারিশ্রমিকে।(The Textile Industry in Bangladesh: Growth Trends, Challenges, and Future Prospects) 

 

বাংলাদেশের পোশাকশিল্প বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতায় স্থান করে নিতে মূলত শ্রমিকদের নিম্ন মজুরি ব্যবস্থাকে ব্যবহার করেছে। বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্দেশ্যে শ্রমিকদের মজুরি দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত কম রাখা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৮ সাল থেকে পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ছিল মাত্র ৮,০০০ টাকা (প্রায় ৭৩ ডলার)। ২০২৩ এর নভেম্বরে ও ডিসেম্বরে শ্রমিকদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সরকার তা বাড়িয়ে ১২,৫০০ টাকা (প্রায় ১১৪ ডলার) নির্ধারণ করে। তবে এই পরিমাণও শ্রমিকদের কাছে অপর্যাপ্ত মনে হয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম গবেষক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ১২,৫০০ টাকা এখনো দারিদ্র্যসীমার আশেপাশে অবস্থান করছে, যেখানে শ্রমিক সংগঠনগুলো ন্যূনতম ২৩,০০০ টাকা দাবি করেছিল। ফলে বর্তমান মজুরি দিয়ে শ্রমিকদের জন‍্য একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা এখনো সম্ভব হচ্ছে না।

 

বাংলাদেশের শ্রমিকদের দিন-যাপন শুধু মজুরি বা অর্থনৈতিক নয়; তাদের কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষার ব্যাপারেও গভীর উদ্বেগ রয়েছে। পোশাক কারখানায় দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করা, সঠিক বিশ্রাম ও স্বাস্থ্যসেবা না থাকায় শ্রমিকরা অতিষ্ঠ। বিভিন্ন পরিবেশে গ্যাসের ধোঁয়া, বিষাক্ত রঞ্জনদ্রব্য এবং ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপদ কর্মপরিবেশ এক গুরুত্বপূর্ণ দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের শিল্পখাতে শ্রমিক নিরাপত্তার সংকটের মর্মান্তিক প্রমাণ ছিল পোশাক শিল্পের দু'টি ভয়াবহ দুর্ঘটনা। ২০১২ সালে ২৪ নভেম্বর তাজরিন ফ্যাশন ফ্যাক্টরিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১১২ জন শ্রমিক প্রাণ হারান। এর মাত্র পাঁচ মাস পর, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ঢাকার পাশের সাভারের রানা প্লাজা বাণিজ্যিক ভবনটি ধসে পড়ে; এতে ১১৩৮ জন শ্রমিক নিহত হন। 

এই দুই দুর্ঘটনাই কারখানাগুলির সেফটি কেবল বর্ধিত নয়, বরং সম্পূর্ণ অবহেলিত—একজন শ্রমিকের নিরাপত্তাকে গার্হস্থ্য মালিক এবং বৈশ্বিক ব্র্যান্ড উভয়ই গুরুত্ব দিতে ব্যর্থ। রানা প্লাজা কোনও আকস্মিক দুর্ঘটনা ছিল না, বরং পোশাক শিল্পে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একাধিক প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার জমাটবদ্ধ রূপ। ভবনটিতে ফাটল দেখা দেওয়ার পর আগের দিনই তা খালি করা হয়েছিল, কিন্তু বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের নির্মম চাপের কারণে পরদিন আবার কাজ শুরু করতে বাধ্য করা হয়। এই শিল্পে দরিদ্র মজুরির ফলে শ্রমিকরা জানতেন, কাজে না গেলে বেতন পাবেন না—এই ভয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও তারা কাজে ঢুকে পড়েন। শ্রমিকদের সংগঠনের স্বাধীনতা না থাকায়, তারা একত্রিত হয়ে প্রতিবাদ করার সুযোগও পাননি।

 

রানা প্লাজার পর বিশ্বব্যাপী সাড়াজাগ্রত হয়, আর দশটা শ্রমিকের নিরাপত্তা উন্নয়নে আন্তর্জাতিক অ্যাকর্ড চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, এই আইনবদ্ধ চুক্তির আওতায় ২৬০টিরও বেশি ব্র্যান্ড মালিক আবদ্ধ হয়, যার ফলে বহু কারখানায় ভবন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দৃঢ় করা হয়। ফলস্বরূপ আজ রানা-প্লাজার আগে সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে অনেকটাই নিরাপত্তার টানপোড়েন কমেছে। 

তবুও সংকট মুছে যায়নি। ব্যর্থতাও স্পষ্ট। দারিদ্র্যসীমার নিচে মজুরি এবং সংগঠনের অধিকারহীনতা এখনও বহাল। তাজরিন বা রানা প্লাজার মত বিপর্যয় ঠেকানোর গ্যারান্টি এখনও নেই কারণ ঘাটতি রয়ে গেছে কর্মী অধিকার ও ন্যায্য মজুরি-র। ন‍্যায‍্য মজুরি আদায়ের দাবীতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ মিছিল চলমান বছরের পর বছর ধরে। ২০২২ এর জুনে- সাভারের আশুলিয়ার গোরাট এলাকায় অবস্থিত স্টারলিংক গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠানটির তৈরি পোশাক কারখানা কর্তৃপক্ষ ৮০ জন শ্রমিককে ঈদের আগে চাকরি থেকে ছাঁটাই করার অভিযোগে ইউনিকর্ন সোয়েটার লিমিটেডের শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করেন। 

২০২২ এর ডিসেম্বরে-নারায়ণগঞ্জে ৩ মাসের বকেয়া বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ করে এস এস ক্রিয়েটিভ স্টিজ গার্মেন্টসের শতাধিক শ্রমিক। বিনা নোটিশে ছাঁটাই ও বেতন পরিশোধ না করে কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেন নারায়ণগঞ্জের পোশাক কারখানার প্রাইম টেক্সটাইলের শ্রমিকরা। 

২০২৩ এর মে-তে গাজীপুরের শ্রীপুরে ডার্ড কম্পোজিট টেক্সটাইল মিল কারখানায় বকেয়া বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ করেন। চলমান আন্দোলনের দ্বিতীয় দিনে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। একই সময় চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট মোড় এলাকায় 'ডায়নামিক ফাইভ নিট ওয়ার লিমিটেডের' প্রায় ২ শতাধিক পোশাক শ্রমিক বকেয়া বেতনের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে। 

২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে তৈরি পোশাক খাতের ওপর সরকার গঠিত ন্যূনতম মজুরি বোর্ড ইপিজেডের শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৮০০ টাকা নির্ধারণ করে। ইপিজেডের বাইরের কারখানার জন্য নির্ধারণ করা হয় ১২ হাজার ৫০০ টাকা। আন্তর্জাতিক কারিগরি সহায়তায় আশঙ্কাজনক ফ্যাক্টরির নিরাপত্তা উন্নয়নেও কাজ করা হয় এবং শ্রম মন্ত্রণালয় নগরীতে নিরাপত্তা পরিদর্শন বৃদ্ধি করা হয়। 

তবে এগুলো অপ্রতুল। বাস্তবে কারখানা মালিকেরা অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো মজুরি চালিয়ে যাচ্ছে: নতুন মজুরি ঘোষণার পরও কিছু কারখানায় শ্রমিকদের আগের বেতনই দেয়া হচ্ছে। যার কারণে শ্রমিকেরা আবারো মাঠে নামেন। ২০২৪ এর জানুয়ারিতে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন মানিকঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার নয়াডিঙ্গি রাইজিং স্পিনিং মিলের শ্রমিকেরা। আন্দোলনরত শ্রমিকেরা বলেন, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী বেতন ভাতা দিচ্ছে না রাইজিং স্পিনিং মিল কর্তৃপক্ষ। 

২০২৪ এর মে-তে, আশুলিয়ার ইয়ারপুর ইউনিয়নের নরসিংহপুর এলাকার ইথিক্যাল গার্মেন্টস লিমিটেড কারখানার শ্রমিকরা এপ্রিল মাসের বকেয়া বেতন ও কারখানা বন্ধের প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। একই বছর সেপ্টেম্বরে-বগুড়ার শেরপুরে মজুমদার প্রোডাক্টস লিমিটেডের ভোজ্যতেল উৎপাদন মিলে তেলের ট্যাঙ্ক বিস্ফোরণে চার শ্রমিক নিহত হন। এছাড়া ২০১৮ এর জানুয়ারিতে-জাফলংয়ে অবৈধভাবে কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলনের সময় হঠাৎ গর্তের মাটি ধসে পড়ে। এতে চাপা পড়ে নিহত হল একজন নারীসহ তিন পুরুষ শ্রমিক। 

 

২০২৫ এর ফেব্রুয়ারিতেও সাভারের আশুলিয়ায় বকেয়া বেতনের দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। 

বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ অক্যুপেশনাল সেইফটি, হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট (ওশি) ফাউন্ডেশন তথ‍্য মতে, ২০২৪ এর ডিসেম্বর পর্যন্ত চলতি বছরে অনিরাপদ কর্মক্ষেত্রের কারণে বিভিন্ন সেক্টরে ৯০৫ জন শ্রমিক নিহত হন। একই সময়ে ২১৮ জন আহত হন। এবং ২০২৩ সালে নিহত হন ১৪৩২ জন এবং আহত হন ৫০২ জন। 

 

বাংলাদেশে এখনো শ্রমিক অধিকার রক্ষা, স্বাস্থ্যসুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা তেমন করে গড়ে উঠেনি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে শ্রমিকরা যাতে কেবল খুঁটিনাটি নয়, সহানুভূতির দাবি, মানবাধিকার দাবি ও ন্যায্য হকের দাবিতে বঞ্চিত না হয়—এ বিষয়ে এখনও অনেক কিছু করা বাকি। প্রতিটি কারখানায় নিয়মিত নিরাপত্তা পরিদর্শন, আগুন নেভানোর ব্যবস্থা, জরুরি প্রস্থান পথ ও নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা, দুর্ঘটনা বিমা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা ও বার্ষিক বেতনবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে। বেসরকারি এবং সরকারি সহযোগিতায় কারখানায় সামাজিক সুরক্ষা জাল বিস্তৃত করতে হবে, যেন বীমাহীন অবস্থা শ্রমিকদের খাদ্যে, চিকিৎসা ও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না করে। 

শ্রমিকদের মজুরি শুধু সংখ্যা নয়, সেই মজুরি দিয়ে সংসার চালানো যায় কি না, সেটা ভাবাও জরুরি। সরকার ঘোষিত বর্তমান সর্বনিম্ন মজুরি ১২,৫০০ টাকা হলেও এটা ন্যূনতম জীবনযাপনের দাবি থেকে অনেক কম। তাই এই ঘাটতি পূরণ করতে কোম্পানি ও সরকারকে আরও উদ্যোগী হতে হবে। শ্রমিকরা যাতে সংগঠিত হয়ে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করতে পারে, সেটিও একটি মৌলিক মানবাধিকার। ২০২৩ সালের অক্টোবর-নভেম্বরের গার্মেন্টস বিক্ষোভে শ্রমিকেরা শান্তিপূর্ণভাবে মজুরি বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন, কিন্তু বাঁধা পেয়েছে পুলিশি লাঠিচার্জ এবং গ্রেপ্তার, শতাধিক শ্রমিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এটি দেখায় যে শ্রমিকের সংগঠন গঠন ও ধর্মঘটের অধিকার রক্ষা এখনও চ্যালেঞ্জিং। ইউনিয়ন গঠনে বাধা দিয়ে কোনোদিক থেকেই শ্রমিকদের গলার আওয়াজ নীরব করা উচিত নয়।

 

শ্রমিক না থাকলে শ্রম নেই, শ্রম না থাকলে দেশ নেই—এই সত্যকে উপেক্ষা করে কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না। বাংলাদেশের গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল শিল্প আজ যে অবস্থানে পৌঁছেছে, তার পেছনে রয়েছে লাখো শ্রমজীবী মানুষের ঘাম ও ত্যাগ। শ্রমিক দিবস কেবল স্মরণীয় প্রতিবাদ-দিবস নয়, এটি আমাদের মানবিক দায়বদ্ধতার প্রতীক। আমরা যে পোশাক পরিধান করি, তা তাদের পরিশ্রমের ফল, আর তাদের জীবন-মানোন্নয়নের দায় আমাদের সবার। বস্ত্র কারখানা থেকে শুরু করে শহুরে সব দোকানে শ্রমিকেরা অদৃশ্যভাবে আমাদের জীবন চালাতে সাহায্য করে; তাই তাদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য স্বাচ্ছন্দ্যময় মজুরি ও সংগঠিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া আমাদের সার্বিক দায়িত্ব।

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন