https://www.prothomalony.com/
13257
north-america
প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৫ ০৬:৩৮
রোহিঙ্গা সংকট দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে জটিল মানবিক বিপর্যয়গুলোর একটি, যা শুধু বাংলাদেশের নয়, গোটা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক নিপীড়নের শিকার হয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে শুরু হওয়া এই গণপালায়নের ফলে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ এলাকায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশ মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে এই জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিলেও বর্তমানে এই সংকট বহুমাত্রিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। তাই এখন সময় এসেছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই সংকটের সমাধানে আন্তরিক ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
রোহিঙ্গা সংকট শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, এটি একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এই নিপীড়নকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তারপরও কার্যত মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চাপ এবং দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেকটাই ব্যর্থতা লক্ষ করা গেছে। বিভিন্ন দেশ এবং সংস্থার কড়া বিবৃতি দিলেও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপের অভাব স্পষ্ট। মিয়ানমার এখনো রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। তারা বলছে, পরিস্থিতি অনুকূলে নয়, অথচ রোহিঙ্গাদের নিজভূমিতে ফেরত না পাঠালে এই সংকট কখনোই সমাধান সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ একাই এই বিশাল শরণার্থী জনগোষ্ঠীর চাপ বহন করে চলেছে। এদের খাদ্য, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও শিক্ষার ব্যবস্থা করতে গিয়ে দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ এবং সমাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আন্তর্জাতিক দাতাসংস্থাগুলোর অনুদান কমে আসছে, ফলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অস্থিরতা বাড়ছে। অপরাধ, চোরাচালান, মানবপাচারসহ নানা সমস্যাও জটিলতর হচ্ছে। তরুণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বাড়ছে, যা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নির্লিপ্ততা এক ধরনের নিষ্ঠুরতা বলেই বিবেচিত হতে পারে। বিশেষ করে যেসব উন্নত দেশ মানবাধিকার রক্ষার কথা বলে বিশ্বে নেতৃত্বের দাবি করে, তাদের উচিত এ বিষয়ে আরও বেশি সক্রিয় হওয়া। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ান, ওআইসি, আন্তর্জাতিক আদালত— এ সকল সংস্থার মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তোলা জরুরি। শুধু ত্রাণ পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; রোহিঙ্গা জনগণের ন্যায়বিচার ও অধিকার নিশ্চিত করাই এখন মুখ্য বিষয় হওয়া উচিত।
বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক পর্যায়ে বিভিন্ন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়েছে। চীন, ভারত, রাশিয়া— এসব প্রভাবশালী দেশগুলোর সহযোগিতাও আশা করা হয়েছে। কিন্তু ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ও অর্থনৈতিক বিবেচনায় অনেকেই কার্যকর অবস্থান নেয়নি। সবার জানা, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে অনেক দেশেরই বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে, যা এই সংকটের সমাধানে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এখন সময় এসেছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে এই সংকট নিরসনে উদ্যোগী হোক।
রোহিঙ্গাদের মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই হতে পারে এই সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান। এর জন্য প্রথমেই প্রয়োজন মিয়ানমারে অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা, যাতে তারা স্বেচ্ছায় ও নিরাপদে তাদের মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে পারেন। এ প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার উপস্থিতি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি, যারা ইতিমধ্যে শরণার্থী অবস্থায় রয়েছে, তাদের জন্য শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করাও গুরুত্বপূর্ণ, যাতে তারা ভবিষ্যতে গঠনমূলকভাবে সমাজে অবদান রাখতে পারে।
রোহিঙ্গা সংকট একটি মানবিক বিপর্যয়, যার দ্রুত সমাধান না হলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে। বাংলাদেশের সহনশীলতা ও মানবিক উদারতার যেন অপব্যবহার না হয়, তা নিশ্চিত করা দরকার। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে— তারা মানবাধিকারের পক্ষে নাকি নিপীড়কদের পাশে। কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি করাসহ সব ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের অধিকার স্বীকার করতে বাধ্য হয়। অন্যথায় এই সংকট আরও গভীর হবে এবং ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন