https://www.prothomalony.com/

13249

north-america

উত্তর আমেরিকা

আইসি'র দ্বারা অভিবাসী মায়েদের নির্বাসন: সাথে মার্কিন নাগরিক শিশুও

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৫ ২৩:৪২

ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেয়া শিশু ও তাদের পরিবারকে নির্বাসিত করতে তৎপর হয়ে উঠেছেন। সম্প্রতি এক বছর বয়সী এক মেয়েশিশুর মাকে (কিউবা-জন্ম) এবং তিনজন আমেরিকান নাগরিক শিশু ও তাদের হন্ডুরাসে জন্ম নেওয়া মায়েদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দিয়েছেন। এসব নারীদের রুটিন চেক-ইন করতে গেলে আইসিই অফিসে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কোনো আইনজীবী বা পরিবারের সাথে যোগাযোগের সুযোগ না দিয়েই তিন দিনের মধ্যেই তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়। 

ঘটনাগুলো থেকে প্রশ্ন উঠেছে— কাদের বের করে দেওয়া হচ্ছে এবং কেন, বিশেষ করে যখন মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য ট্রাম্পের দ্রুত অভিবাসন দমন নীতির বিরুদ্ধে ফেডারেল আদালতে আইনি লড়াই চলছে। 

আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন (এসিএলিউ), ন্যাশনাল ইমিগ্রেশন প্রজেক্ট এবং তাদের সহযোগী কয়েকটি সংগঠন এক বিবৃতিতে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক শিশু ও তাদের মায়েদের এভাবে নির্বাসন করা "ভয়ঙ্কর, যদিও ক্রমেই ক্ষমতার অপব্যবহার সাধারণ হয়ে উঠছে।"

ন্যাশনাল ইমিগ্রেশন প্রজেক্টের গ্রেসি উইলিস এক সাক্ষাৎকারে বলেন, "আইসিই মায়েদের কোনো বিকল্প পথ দেখায়নি, কোনো সুযোগ দেয়নি— শুধু বলেছিল, সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে দেশ ছাড়তে হবে।"  তিনি আরও জানান, বিরল ক‍্যান্সারে আক্রান্ত ৪ বছরের শিশুটিকে এবং ৭ বছরের আরেকটি শিশুকে তাদের মায়ের সঙ্গে গ্রেপ্তারের এক দিনের মধ্যেই হন্ডুরাসে ফেরত পাঠানো হয়। 

২ বছরের একটি শিশুর বিষয়ে লুইজিয়ানার এক ফেডারেল বিচারক প্রশ্ন তোলে বলেন, সরকার প্রমাণ দিতে পারেনি শিশুটির নির্বাসন সঠিক নিয়মে হয়েছে কিনা। মেয়েটির বাবার আইনজীবীরা বলেন, "বাবা চেয়েছিলেন তার মেয়ে তার সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রে থাকুক। কিন্তু আইসিই দাবি করে, মেয়েটির মা চেয়েছিলেন মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে হন্ডুরাসে চলে যেতে।" 

লুইজিয়ানার ইউএস জেলা বিচারক টেরি ডাউটি এই দাবিগুলোর কোনোটি পূর্ণাঙ্গভাবে যাচাই করেননি। 

আইনজীবীরা জানান, হন্ডুরাসে জন্ম নেওয়া গর্ভবতী মা, তার দুই বছরের মেয়ে এবং ১১ বছর বয়সী আরেক মেয়েকে মঙ্গলবার নিউ অরলিন্সের আইসিই অফিসে একটি রুটিন চেক-ইন করার সময় গ্রেপ্তার করা হয়। পরিবারটি ব্যাটন রুজ শহরে বসবাস করছিল। বৃহস্পতিবার (২৫ এপ্রিল)  আদালতে জমা দেওয়া এক নথিতে মেয়েটির বাবার আইনজীবীরা বলেন, 'আইসিই' ইচ্ছাকৃতভাবে শিশুটিকে আটকে রেখেছিল, যাতে শিশুর বাবা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। তারা বাবার অভিবাসন স্থিতি স্পষ্টভাবে জানাননি, তবে বলেছেন, বাবা তার মেয়েদের দায়িত্ব আইনত তার বউয়ের বোনের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন, যিনি একজন মার্কিন নাগরিক এবং ব্যাটন রুজেই থাকেন। 

তবে এ নিয়ে ডাউটি জানান, শুক্রবার সরকার পক্ষের আইনজীবীদের তিনি নির্দেশ দেন যাতে মহিলার সঙ্গে কথা বলা হয়, কিন্তু এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে তাকে জানানো হয় যে, কথোপকথন সম্ভব নয় কারণ ওই নারী ইতোমধ্যে হন্ডুরাসে নেমে গেছেন। 

ডাউটি, ১৬ মে শুনানির দিন ঠিক করেন। তিনি বলেন, "সরকার ঠিকমতো প্রক্রিয়া ছাড়াই একজন মার্কিন শিশুকে নির্বাসিত করেছে কি না, তা পরিষ্কার করতেই এই শুনানি হবে।"

এদিকে, ফ্লোরিডায় এক আইনজীবী জানান, এক বছর বয়সী কন্যাশিশুর মা এবং এক মার্কিন নাগরিকের স্ত্রী হেইডি সানচেজকে (যিনি কিউবায় জন্ম নিয়েছেন) ট্যাম্পার একটি ইমিগ্রেশন অফিসে নির্ধারিত চেক-ইন অ্যাপয়েন্টমেন্টে গেলে আটক করা হয়। তিনি কোনো যোগাযোগের সুযোগ ছাড়াই আটক ছিলেন এবং দুই দিন পরে কিউবায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তার আইনজীবী ক্লডিয়া কানিয়ারেস বলেন, সানচেজ এখনও তাঁর মেয়েকে বুকের দুধ খাওয়ান, তাঁর মেয়ে খিঁচুনির সমস্যায় ভোগছে। 

আইনজীবী কানিয়ারেস জানান, বৃহস্পতিবার (২৪ এপ্রিল) সকালে তিনি সানচেজের নির্বাসনের বিরুদ্ধে আইনি নথি জমা দিতে গেলে আইসিই তা নিতে অস্বীকার করে বলেন,  সানচেজ ইতিমধ্যেই চলে গেছেন — যদিও কানিয়ারেস মনে করেন, তখনও তিনি দেশেই ছিলেন।

তিনি আরও বলেন, তিনি আইসিই-কে জানিয়েছিলেন যে তিনি সানচেজের মামলা নতুন করে খুলে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে রাখার চেষ্টা করবেন, কিন্তু আইসিই জানায়, সানচেজ এখন কিউবায় থেকেও মামলা চালিয়ে যেতে পারবেন।

কানিয়ারেস আরও জানান, সানচেজ কোনো অপরাধী নন এবং মানবিক কারণে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে থাকার ভালো কারণ আছে। কিন্তু আইসিই সেটি গুরুত্ব দিচ্ছে না, কারণ তারা নাকি নির্দিষ্ট নির্বাসন লক্ষ্য পূরণের চাপের মধ্যে আছে।

কানিয়ারেস জানান, সানচেজের বিরুদ্ধে ২০১৯ সালের একটি শুনানিতে হাজির না হওয়ার কারণে পুরনো এক নির্বাসন আদেশ ছিল। সে সময় তাঁকে ৯ মাস আটক রাখা হয়েছিল। পরে কিউবা তাঁকে ফেরত নিতে অস্বীকার করলে ২০২০ সালে সানচেজকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং নিয়মিত তাকে আইসিই অফিসে হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

নির্বাসনের সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতির মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার সংক্রান্ত প্রশ্ন আরও জোরালো করেছে। আইনজীবীরা বলছেন, দ্রুত নির্বাসনের প্রক্রিয়ায় মৌলিক অধিকার উপেক্ষিত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে মানবিক বিবেচনাও রাখা হচ্ছে না। বিশেষ করে ছোট শিশুদের যুক্তরাষ্ট্রে রেখে দেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তাদের মায়েদের সঙ্গে ফেরত পাঠানোর ঘটনাগুলো নীতিনির্ধারকদের মানবিক দায়িত্বের প্রতি প্রশ্ন তুলছে। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতগুলো এখন এই সিদ্ধান্তগুলোর যথার্থতা এবং আইনি প্রক্রিয়া মানা হয়েছে কিনা, তা পর্যালোচনা করছে — যার ফলাফল ভবিষ্যতের অভিবাসন নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
 

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন