https://www.prothomalony.com/
13175
north-america
গাজার ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও তখন কিছু মানুষ জীবনের জন্য লড়ছিলেন- তাঁরা ছিলেন ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মী, যাঁরা যুদ্ধের ভয়াবহতা উপেক্ষা করে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে গিয়েছিলেন আহত ও অসহায় মানুষের কাছে। অথচ সেদিন তাদের ওপরেই গুলি চালিয়েছিল ইসরায়েলি বাহিনী। মৃত্যু হয়েছিল ১৫ জন উদ্ধারকর্মীর, যাঁদের অপরাধ- তাঁরা জীবন রক্ষার চেষ্টা করছিলেন।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) দাবি করে যে, অ্যাম্বুলেন্স বহরটি সন্দেহজনক ছিল, গাড়ির আলো নিভানো ছিল এবং কোনো জরুরি সংকেত ছাড়াই সেনাদের দিকে সন্দেহজনকভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল। তাই গুলি করা হয়। কিন্তু নিহত একজন কর্মী, রিফআত রাদওয়ানের মোবাইল ভিডিও এবং স্যাটেলাইট চিত্র স্পষ্ট করে দেখায়- তাঁদের গাড়িতে জরুরি সংকেত লাইট জ্বলছিল, তাঁরা ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় সম্পূর্ণভাবে ‘পিআরসিএস’ চিহ্নিত গাড়ি ব্যবহার করছিল।
এটা কি শুধুই ‘একটি ভুল?’ না কি পূর্বপরিকল্পিত একটি হত্যাকাণ্ড?
এমনকি এ ঘটনায় ইসরায়েলি বাহিনী নিহতদের ‘সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যায়িত করে দায় এড়াতে চেয়েছিলেন। তাদের দাবি, নিহত উদ্ধারকর্মী মোহাম্মদ আমিন ইব্রাহিম শুবাকি-হামাসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু নিহত উদ্ধারকর্মীদের তলিকায় এ নামটি মেলে না।
অত্যন্ত মর্মান্তিক বিষয়টি হল, এই ১৫ জনের দেহ পরে উদ্ধার করা হয় ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত এলাকায় একটি অস্থায়ী গণকবর থেকে-পরিবারের কাউকে জানানো হয়নি, স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক সংস্থার কোনো অনুমতি ছাড়াই কবর দেওয়া হয়। আরো অবাক করার বিষয়টি হল, তাদের গাড়িও চাপা দিয়ে ফেলা হয় মাটিতে।
এই ঘটনাটি মানবতা, ধর্ম, সভ্যতা- সবকিছুর বিরুদ্ধে গেলেও, অসহায়ত্বের ব্যাপারটি হল, যেখানে ইসরায়েল নির্বিচারে হত্যা চালিয়ে যাচ্ছে, সেখানে পর্দার আড়ালে গণকবর নিয়ে কে কথা বলবে? কি-ই বা বলবে?
রাষ্ট্র যখন বর্বর আচরণ করে- যেমন গণহত্যা, নির্বিচার বোমাবর্ষণ, গণকবর তৈরি বা শিশু-নারী হত্যা- তখন এর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘ, সুশীল সমাজ, স্বতন্ত্র রাষ্ট্র এবং গণমাধ্যম-সবার সরব হতে হয়। কিন্তু বাস্তবে এই ন্যায়ের কণ্ঠগুলো ম্লান থেকে যাচ্ছে। এই হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ও স্যাটেলাইট প্রমাণ সামনে আসার পরেও জাতিসংঘ এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয় শক্তিগুলো কার্যকর কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। আর ইসরায়েল বরাবরের মতোই ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই’-এর ব্যানারে সবকিছু ঢেকে ফেলতে চাইছে।
এখানে ভূরাজনৈতিক স্বার্থ একটি বড় ব্যাপার। প্রভাবশালী রাষ্ট্ররা নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থে নীরব থাকছে, কেননা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো ইসরায়েলের পাশে থেকে তাদের সামরিক, গোয়েন্দা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করছে। তারা ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের অগ্রবর্তী ঘাঁটি হিসাবে বিবেচনা করছে। তাছাড়া, বিশ্ব রাজনীতিতে মুসলিম রাষ্ট্র বা জনগণ আক্রান্ত হলে অনেক সময় মানবতা নয়, বরং রাজনীতি মুখ্য হয়ে ওঠে। একারণেই মুসলিম শিশুর মৃত্যু ‘সংখ্যা’ হয়ে ওঠে, কিন্তু ইউক্রেনে শিশুর মৃত্যু হয়ে ওঠে ‘স্মৃতিস্তম্ভ’।
ইসরায়েল, দাঁড়িয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোর মাঝখানে, ক্ষুদ্র কিন্তু সামরিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসাবে। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে, ব্রিটেন যখন ফিলিস্তিন ত্যাগ করে, সেই শূন্যস্থানে ইহুদি নেতৃত্ব ঘোষণা করে নতুন রাষ্ট্র ‘ইসরায়েল’-এর জন্ম হয়। সেই দিন থেকে শুরু হওয়া একটি ভূখণ্ডগত ও রাজনৈতিক সংঘাত শুধু আজও চলমানই নয়, বরং তা ধীরে ধীরে আরও জটিল ও বিস্তৃত হয়েছে, নিজেদের অস্তিত্বকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে পরিধি ও প্রভাব বিস্তার করেছে বহু গুণে। আর এই উত্তরণের বিপরীতে আরব রাষ্ট্রগুলো, যাদের এক সময় ছিল সংখ্যার আধিক্য ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য, তারা রাজনৈতিক বিভাজন, নেতৃত্বহীনতা ও অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত হয়ে পড়েছে। ফলে, ইসরায়েল আজ শুধু একটি রাষ্ট্র নয়- এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক অনিবার্য বাস্তবতা, আর আরব রাষ্ট্রগুলোর জন্য এক গভীর মাথাব্যথার কারণ।
গাজার নিরীহ জনগণের উপর ইসরায়েলের লাগাতার বর্বর হামলা আজ বিশ্ববিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই নির্মমতা কেন থামছে না? এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক জটিল আন্তর্জাতিক সমীকরণ, যেটি ইসরায়েলকে অপার সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে বলীয়ান করছে। মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের একমাত্র পরমাণু শক্তিধর দেশ হিসেবে ইসরায়েল তার ভৌগোলিক ক্ষুদ্রতা সত্ত্বেও একটি বিশাল কৌশলগত প্রভাব তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং সামরিক শক্তির বিচারে ইসরায়েল আজ বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর কাতারে। এই শক্ত অবস্থান গড়ে তোলার পেছনে কাজ করেছে একাধিক ঐতিহাসিক, কূটনৈতিক ও সাংগঠনিক কারণ।
ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা শক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। ইসরায়েল জন্মলগ্ন থেকেই ব্রিটেন, ফ্রান্স ও আমেরিকার সমর্থন পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা ইসরায়েলের ভিত্তিকে শক্তিশালী করেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। যেমন- লন্ডনের স্কুল অব আফ্রিকান এন্ড ওরিয়েন্টাল স্টাডিজের আওতাধীন মিডলইস্ট ইন্সটিটিউটের শিক্ষক ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক গবেষক ড. সেইয়েদ আলী আলাভি বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘ইসরায়েলের জন্মই হয়েছে মূলত পরাশক্তিদের বিশাল সমর্থনে যেটা ইসরায়েলের ক্ষমতায়নে একটা বড় ভূমিকা রেখেছে।’
ইসরায়েল হচ্ছে ফরাসি সামরিক সহায়তার (এফএমএ) অধীনে শিরোনাম ২২’-এর সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক গ্রাহক। এটি ২০১৯-২০২৮ সাল পর্যন্ত একটি ১০ বছরের সমঝোতা স্মারক (এমওইফ) দ্বারা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ‘ইউএস সিকিউরিটি করপোরেশন উইথ ইসরাইল’-এর তথ্য মতে, এই সমঝোতার আওতায়, যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার ‘এফএমএ’ এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত সমবায় প্রোগ্রামের জন্য ৫০০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে। ২০০৯ অর্থবছর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কার্যক্রমের জন্য ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে, যার মধ্যে ২০১১ সাল থেকে আয়রন ডোম সমর্থনে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার অন্তর্ভুক্ত। ‘এফএমএ’-এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে বিশ্বের কিছু অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জামের অ্যাক্সেস দেয়, যার মধ্যে ‘এফ-৩৫’ লাইটনিং অন্তর্ভুক্ত।
মূলত, রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের আধিপত্য স্পষ্ট থাকলেও সময়ের চাকা ঘুরে ১৯৫৬ সালের দ্বিতীয় আরব-ইসরায়েলি যুদ্ধে, যখন আমেরিকার সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক আরো দৃঢ় হয়। ওই যুদ্ধেই প্রথম ইসরায়েল স্পষ্টভাবে পশ্চিমাদের ছত্রছায়ায় মিশরের ওপর আক্রমণ চালায়। প্রতিক্রিয়ায়, মিশরের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। কিন্তু এই অঞ্চলে সোভিয়েতদের প্রবেশ ঠেকানো ছিল পশ্চিমাদের মূল লক্ষ্য। সোভিয়েত ঘাঁটি ঠেকানোর নামে ব্রিটিশ সেনাদের প্রভাব সরিয়ে দিয়ে অবস্থান নেয় যুক্তরাষ্ট্র। এই সময় থেকেই ইসরায়েল-আমেরিকা সম্পর্ক গাঢ় হতে থাকে। রাজনৈতিক ছায়া সরিয়ে রেখে শুরু হয় সামরিক, অর্থনৈতিক এবং গোয়েন্দা সহায়তার এক দীর্ঘ দখলদার-সহযোগীর সম্পর্ক।
গাজায় যখন একের পর এক বোমা ফেটে ছিন্নভিন্ন হচ্ছে শিশুর দেহ, ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ছে একেকটি পরিবার- ঠিক তখনই পর্দার আড়ালে ধ্বংসযজ্ঞে জ্বালানি যোগাচ্ছে বিশ্বের তথাকথিত সভ্য রাষ্ট্রগুলো। ইসরায়েলের হামলা শুধু আকাশ থেকে নয়, এই হামলার রসদও এসেছে পশ্চিমাদের সহযোগিতা থেকে। ‘ক্যামপেইন এগেন্সড আর্ম ট্রেড’-এর তথ্য মতে, ইসরায়েলি ‘এফ-৩৫’ যুদ্ধবিমান যা গাজার আকাশে তাণ্ডব চালাচ্ছে- তার প্রতিটি বিমানে প্রায় ১৫ শতাংশ যন্ত্রাংশ ব্রিটিশ কোম্পানির তৈরি। বিশেষ করে ‘বিএই সিসটেমস’ নামক ব্রিটিশ কোম্পানি সরবরাহ করেছে এসব প্রযুক্তি এবং ২০০৮ সাল থেকে যুক্তরাজ্য ইসরায়েলকে প্রায় ৭২৭ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র রপ্তানির লাইসেন্স দিয়েছে। শুধু ২০২২ সালেই ইসরায়েলকে ৫৩ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র লাইসেন্স দিয়েছে যুক্তরাজ্য। এই লাইসেন্সগুলো আজ রক্তে স্নাত গাজার সরাসরি অংশীদার।
ইউরোপে জার্মানির ভূমিকাই ধরুন। ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় ইউরোপীয় বাণিজ্যিক অংশীদার হচ্ছে জার্মানি। প্রতি বছর জার্মানি থেকে ইসরায়েল আমদানি করে প্রায় ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। শুধু তা-ই নয়, উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে ইসরায়েল হলো জার্মানির চতুর্থ বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং জার্মানি ইসরায়েলকে ডলফিন-শ্রেণীর ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন সরবরাহ করেছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম বলে মনে করা হয়।
ভারতের সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক আরেকটু গভীর। ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ভারত ইসরায়েল থেকে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনেছে। আর ২০২২ সাল পর্যন্ত ইসরায়েল ভারত থেকে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের অপরিশোধিত তেল ও ডায়মন্ড আমদানি করেছে। শুধু অস্ত্র নয়, যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক এখন ‘কৌশলগত মৈত্রী’ নামের মোড়কে রক্তাক্ত বাস্তবতা ঢেকে রাখছে। এছাড়াও ভারতের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান যেমন টাটা গ্রুপ, উইপ্রো, সান ফার্মা, রিলায়েন্স ইনডাস্ট্রিস এবং এলএন্ডটি টেকনোলোজি সার্ভি-ইসরায়েলি স্টার্টআপে সরাসরি বা ভেঞ্চার ক্যাপিটাল একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিপুল বিনিয়োগ করেছে।
অন্যদিকে আরব রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান এখন আর আগের মতো একরোখা নয়। এক সময় যারা ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ ছিল, তারা আজ একে একে সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে। মিশর, জর্ডান ও মৌরিতানিয়া ধীরে ধীরে স্বীকৃতি দিলেও ২০১০ সালে মৌরিতানিয়া আবার সে সম্পর্ক ছিন্ন করে। কিন্তু ২০২০ সালের আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সুদান এবং মরক্কো- সবাই ইসরায়েলের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থাপন করে।
আবার, উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণায় বিপুল বিনিয়োগ দেশটিকে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে গেছে। তেলআবিব, হাইফা ও জেরুজালেমের মতো শহরগুলো বিশ্বমানের গবেষণা কেন্দ্র ও স্টার্টআপ হাব হিসেবে পরিচিত। সাইবার নিরাপত্তা, কৃষি প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রে ইসরায়েল বৈশ্বিক নেতৃত্ব অর্জন করেছে। ইহুদি প্রবাসীদের আর্থিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানও ইসরায়েল এর জাতীয় শক্তিকে প্রসারিত করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত ইহুদি জনগণ শুধু বিনিয়োগ ও সাহায্যই নয়, প্রযুক্তি, জ্ঞান ও সংস্কৃতির নতুন নতুন ধারা এনেছে। সব মিলিয়ে, ইসরায়েল তার ভূখণ্ডগত ও জনসংখ্যাগত সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে, একটি আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক পরাশক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে আরব-ইসরাইল দ্বন্দ্ব এবং ফিলিস্তিন সংকটের পটভূমিতে ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই শক্তিগুলি বরাবরই একপাক্ষিক দৃষ্টিকোণ থেকে নিজেদের স্বার্থে ইসরাইলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, যা এই অঞ্চলের মুসলিম দেশগুলোর কাছে এক গভীর অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসম্পদ পশ্চিমী দেশগুলোর অর্থনীতি ও প্রযুক্তি-নির্ভর শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিশ্বের শতকোটি মুসলমানের মানবিক অধিকারের প্রতি তারা কখনোই যথাযথ মনোযোগ দেয়নি। বরং, মুসলিম বিশ্বের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে, তারা যুদ্ধবাজ, জায়নবাদী ইসরাইলকে সব দিক দিয়ে সমর্থন দিয়ে এসেছে।
পশ্চিমা শক্তির এই সমর্থন, যা অর্থনৈতিক, সামরিক এবং কূটনৈতিক সহায়তার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছে, তা ইসরাইলকে তাদের উপস্থিতি ও ক্ষমতা দৃঢ় করার জন্য সহায়ক হয়েছে। একদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের তেলসম্পদে আসক্তি, অন্যদিকে, ইসরাইলের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা করার প্রবণতা- এই দুই উপাদানই পশ্চিমা শক্তির ইসরাইলের প্রতি নিরন্তর সমর্থনের মূল কারণ। এর ফলে, ইসরাইল গত সাত দশকে প্রায় প্রতি বছর শত শত কোটি ডলার সামরিক সহায়তা পেয়ে চলেছে, যা তাদেরকে শুধুমাত্র অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করেনি, বরং সামরিক শক্তিতে এক অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, যেগুলোর মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রও অন্তর্ভুক্ত, ইসরাইলের কাছে এখন একটি শক্তিশালী বাহন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই সমর্থনের কারণে ইসরাইল এখন মধ্যপ্রাচ্যে এক অপারাজেয় শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যার বিরুদ্ধে কথা বলা বা প্রতিবাদ করা অনেক দেশের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা শুধু রাজনৈতিক কিংবা সামরিক সমর্থন নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, যা মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমী শক্তির আধিপত্য বজায় রাখতে সাহায্য করছে।
এছাড়া, পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র, তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক বিধি-নিষেধ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে ইসরাইলকে নীরব সমর্থন দিচ্ছে। এই একটি দৃষ্টান্ত, যেখানে ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের মানবিক পরিণতি বা আঞ্চলিক শান্তির প্রতি কোনো খোঁজখবর নেওয়া হয়নি। বরং, সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের কারণে পৃথিবীর অন্যতম নৃশংস সহিংসতার সাক্ষী থাকতে হচ্ছে ফিলিস্তিনসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে। এই সমর্থন এবং সহযোগিতা ইসরাইলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখেও তাদেরকে এক রকম নির্জলা নিরাপত্তা দিয়েছে, যা বহু দেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। ইসরাইলের আক্রমণাত্মক নীতি ও ফিলিস্তিনিদের প্রতি নির্যাতনের বিষয়টি যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে উন্মোচিত হয়, তখনও ইসরাইলের সঙ্গে পশ্চিমী শক্তির সম্পর্কের কারণেই কৌশলগত বা অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগে কার্যকর কোনও পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি।
যদিও জাতিসংঘ মসৃণভাবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং শান্তি বজায় রাখতে কাজ করার চেষ্টা করছে, তবে ইসরাইল-প্যালেস্টাইন সংকটের মতো জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘের ভূমিকা প্রায়শই সীমিত হয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, ফিলিস্তিনিদের মানবিক সহায়তা দিচ্ছে, তবে নিরাপত্তা বা স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শক্তিশালী পদক্ষেপ গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘে পাঁচটি স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র (ভেটো পাওয়ারধারী) রয়েছে, যাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম। যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের শক্তিশালী মিত্র এবং তারা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে প্রায়ই ইসরাইলের বিরুদ্ধে আনা সিদ্ধান্ত বা প্রস্তাবের বিরোধিতা করে ভেটো দেয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এর ফলে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইসরাইলের বিরুদ্ধে কার্যকরী কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় না। এই বাস্তবতাই জাতিসংঘের প্রভাব সীমিত করেছে।
একটি দেশের মাটিতে, একটি যুদ্ধক্ষেত্রে ১৫ জন নিরপরাধ স্বাস্থ্যসেবা কর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হলো। লুকিয়ে গণকবরে চাপা দেওয়া হলো তাদের মরদেহ- এমনকি হত্যার সাক্ষ্যপ্রমাণ নিশ্চিহ্ন করতে উদ্ধারকর্মীদের ব্যবহৃত গাড়িও মাটির নিচে পুঁতে ফেলা হলো। এরপর সেই মানুষগুলোকে সন্ত্রাসী বলে অপবাদ দেওয়ার অপচেষ্টা চালানো হলো- এ যেন মৃত্যুর পরেও তাদের মানবতাকে অপহরণ করা। এই ঘটনা শুধু নিষ্ঠুরতা নয়, এটি ইতিহাসের কলঙ্ক, সভ্যতার মুখে এক নির্মম থাপ্পড়।
রিফআত রাদওয়ান, যার মোবাইলে ধারণ করা চিত্রটি আজ সামনে এসেছে, গুলির মুখেও তাঁরা পালানোর চেষ্টা করেননি; বিশেষ করে রিফআত রাদওয়ান। গুলির মাঝে তিনি বারবার মৃত্যুর আগে ‘শাহাদা’ পাঠ করছিলেন। তিনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইছিলেন এবং বলছিলেন যে তিনি জানেন, তিনি মারা যাচ্ছেন। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আমাকে মাফ করে দিও মা, আমি এই পথটা বেছে নিয়েছি মানুষের সাহায্য করার জন্য - আমি কসম করে বলছি, এই পথটা আমি শুধু মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্যই বেছে নিয়েছি।’
প্যারামেডিক হাসান হোসনি আল-হিলা ২৩ মার্চ রাতে নিজ ডিউটিতে যাওয়ার মতো সুস্থ বোধ করছিলেন না। তাই ফিলিস্তিন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির হয়ে সেই রাতের কাজটি করার দায়িত্ব হাসানের ২১ বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে তুলে নেন। কিন্তু সেটাই ছিল মোহাম্মদের জীবনের শেষ শিফট। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দক্ষিণ গাজার রাফাহ অঞ্চলে একটি নিখোঁজ অ্যাম্বুলেন্স দলের সন্ধানে জরুরি যানবাহনের একটি বহরের সঙ্গে মোহাম্মদ রওনা দেন। অভিযানের এক পর্যায়ে, তীব্র ইসরায়েলি সামরিক গুলির মধ্যে মোহাম্মদ তার বাবাকে ফোন করে অসহায়ভাবে সাহায্যের জন্য আকুতি জানান....
‘আমার কাছে এসো, বাবা... সাহায্য করো... আমাদের লক্ষ্য করেছে ইসরায়েলিরা, ওরা আমাদের ওপর সরাসরি গুলি চালাচ্ছে,’- এরপরই কলটি কেটে যায়।
এরপর পুরো এক সপ্তাহ মোহাম্মদের কোনো খোঁজ মেলেনি। অবশেষে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অনুমতি নিয়ে একটি উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে এক ভয়ংকর দৃশ্যের মুখোমুখি হয়: একটি গণকবর, যেখানে ১৫ জন স্বাস্থ্যসেবাকর্মীর মৃতদেহ তাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত জরুরি যানবাহনসহ কবর দেওয়া হয়েছে। তাঁর ছেলের গুলিবিদ্ধ মরদেহ দেখে হোসনি আফসোস করে বললেন, ‘তিনি ছেলের শেষ মুহূর্তে পাশে থাকতে পারেননি।’ বলেন, ‘আমাদের দুিইজনের অ্যাম্বুলেন্স একসঙ্গেই রওনা হতো। আমি যদি ঘরে না ফিরতাম, তাহলে ওর সঙ্গে একই মিশনে থাকতাম।’ হোসনি ছেলেকে স্মরণ করে বলেন, ‘তোর সঙ্গে যেতে পারিনি বলে দুঃখিত।’
ইসরায়েলের সেনাবাহিনী এখন স্বীকার করেছে যে ২৩ মার্চ দক্ষিণ গাজায় ১৫ জন উদ্ধারকর্মীকে হত্যার ঘটনায় তাদের সেনারা ভুল করেছিল। কিন্তু এই স্বীকারোক্তি কি আদৌ যথেষ্ট? এটি কোনো সাধারণ সামরিক ত্রুটি নয়- এটি একটি গভীর মানবিক বিপর্যয় এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্পষ্ট উদাহরণ।
উদ্ধারকর্মীরা যুদ্ধের ময়দানে নিরপেক্ষ ও মানবিক দায়িত্ব পালনের জন্য থাকে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রতিটি রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনীর বাধ্যবাধকতা। এমন অবস্থায়, যদি কোনো পক্ষ ইচ্ছাকৃত হোক বা ভুলবশত, তাদের ওপর আক্রমণ চালায় এবং পরে শুধুমাত্র ‘ভুল হয়েছে’ বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করে- তা জাতিসংঘের মানবাধিকার চুক্তিকে অবমাননা করার নামান্তর।
এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মহলে কতটা উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে, জানা নেই। যে পরিবারগুলো তাদের প্রিয়জন হারিয়েছে, তাদের জন্য এই ‘ভুল’ শব্দটি অপমানজনক ও বেদনাদায়ক। এই স্বীকারোক্তি তখনই অর্থবহ হবে, যদি এর ভিত্তিতে নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্ত শুরু হয়, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয় এবং ভবিষ্যতে এমন মানবিক ট্র্যাজেডি প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
শুধু স্বীকারোক্তি নয়- প্রয়োজন ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও মানবিক দায়িত্ববোধের পূর্ণ বাস্তবায়ন। এই ধরনের ভুল ক্ষমার যোগ্য নয়, এর জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার হওয়া উচিত।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন