https://www.prothomalony.com/

13144

north-america

উত্তর আমেরিকা

বিচার বিভাগের সঙ্গে সংঘর্ষে ট্রাম্প প্রশাসন: এল সালভাদরে নির্বাসন ঘিরে আদালত অবমাননার অভিযোগ

প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৫ ০৩:১৩

ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার জন্য ফৌজদারি অভিযোগ গঠনের যৌক্তিক প্রমাণ পেয়েছেন ফেডারেল বিচারক । বিচারক সতর্ক করে বার্তা দিয়েছেন যে, তিনি গত মাসে এল সালভাদোর কারাগারে নির্বাসিতদের বহনকারী বিমানগুলি ঘুরিয়ে দেওয়ার আদেশ লঙ্ঘনের জন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে পারেন। এই রায়টি দিয়েছেন মার্কিন জেলা বিচারক জেমস ই. বোসবার্গ, যাকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিশংসনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। এটি বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে এক নাটকীয় সংঘাতের ইঙ্গিত দেয়-বিশেষ করে প্রেসিডেন্টের প্রধান নীতিমালাগুলো বাস্তবায়নে তার ক্ষমতা নিয়ে।

বিচারক বোসবার্গ অভিযোগ করেন, প্রশাসনের কর্মকর্তারা গত মাসে ‘অ্যালিয়েন এনিমিজ অ্যাক্ট’ আইনের আওতায় বহিষ্কৃতদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দেন, যাতে তারা আদালতে তাদের বহিষ্কার চ্যালেঞ্জ করতে না পারেন। এরপর, বিচারক কর্তৃক মাঝ আকাশে থাকা বিমানের ফিরে আসার নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও, সেটি ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা হয়।

তিনি বলেন, ‘প্রশাসন যদি এই আদেশ লঙ্ঘনের প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে তিনি শুনানি আহ্বান করতে পারেন এবং মামলাটি বিচারের জন্য পাঠাতে পারেন। যদি ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন বিচার বিভাগ মামলা পরিচালনা করতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে বিচারক বোসবার্গ অন্য একজন আইনজীবী নিয়োগ করবেন বিষয়টি এগিয়ে নিতে।’

তবে, প্রশাসন জানিয়েছে, তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চিয়াং লিখেছেন, ‘সন্ত্রাসবাদী ও অপরাধী অবৈধ অভিবাসীরা যেন আর আমেরিকান জনগণ ও তাদের কমিউনিটির জন্য হুমকি না হতে পারে, তা নিশ্চিত করতেই প্রেসিডেন্ট শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

এই মামলাটি এখন সবচেয়ে বিতর্কিত মামলাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। কারণ রিপাবলিকান প্রশাসনের বিরুদ্ধে একাধিক আইনি লড়াই চলছে যা হোয়াইট হাউসকে ফেডারেল আদালতের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষের পথে নিয়ে গেছে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা একাধিকবার বিচারকদের সমালোচনা করেছেন প্রেসিডেন্টের কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ করার অভিযোগে, এবং আদালতকে নির্বাহী ক্ষমতায় অনুচিত হস্তক্ষেপের দায়ে অভিযুক্ত করেছেন।

ট্রাম্প ও তার সমর্থকরা বিচারক বোসবার্গকে অভিশংসনের দাবি তোলেন, যা চিফ জাস্টিস জন রবার্টসকে বিরলভাবে একটি বিবৃতি দিতে বাধ্য করে, যেখানে তিনি বলেন, ‘একটি বিচারিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিমত পোষণ করলেই অভিশংসনের আহ্বান জানানো যথাযথ প্রতিক্রিয়া নয়।’

বিচারক বোসবার্গ বলেছেন, ‘সরকার এল সালভাদরের কারাগারে প্রেরিত নির্বাসিতদের হেফাজতে নেয়- যাতে তারা তাদের বহিষ্কারের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করার সুযোগ পাবে। কারণ নির্বাসিতদের বিচারকের আদেশ লঙ্ঘন করে এল সালভাদর কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। তবে কীভাবে এটি কার্যকর হবে, তা স্পষ্ট নয়, কারণ বিচারক উল্লেখ করেছেন যে, সরকারকে সেই ব্যক্তিদের মুক্তি দিতে হবে না, কিংবা তাদের স্বদেশে ফেরত পাঠানোরও প্রয়োজন হবে না।’

বিচারক উল্লেখ করেননি ঠিক কোন কর্মকর্তা বা কর্মকর্তারা অবমাননার জন্য দায়ী হতে পারেন। তবে তিনি সরকারকে আগামী ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত সময় দিয়েছেন, এর মধ্যে হয় তারা জানাবে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে আদালতের আদেশ লঙ্ঘনের প্রতিকার হিসেবে, অথবা জানাতে হবে, কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা বিমানগুলো ঘুরিয়ে না আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

একটি পৃথক মামলায়, প্রশাসন স্বীকার করেছে যে তারা ভুলবশত কিলমার আবরেগো গার্সিয়াকে এল সালভাদরের কারাগারে নির্বাসিত করেছে, কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের রায় থাকা সত্ত্বেও তাকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনার কোন পরিকল্পনা তাদের নেই- যেখানে আদালত বলেছিল যে প্রশাসনকে তার মুক্তির জন্য সহায়তা করতে হবে। ঐ মামলার বিচারক বলেছেন, তিনি আদালত অবমাননার কার্যক্রম শুরু করবেন কি না, তা বিবেচনা করছেন, কারণ কর্মকর্তারা গার্সিয়ার মুক্তি বা তাকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনার জন্য কিছুই করেননি বলে মনে হচ্ছে।

বোসবার্গ, যাকে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ফেডারেল বিচারপতি হিসেবে মনোনীত করেছিলেন, গত মাসে প্রশাসনকে আদেশ দিয়েছিলেন যেন তারা ‘অ্যালিয়েন এনিমিজ অ্যাক্ট’-এর অধীনে তাদের হেফাজতে থাকা কাউকে নির্বাসিত না করে। এই আইনটি ট্রাম্প ১৭৯৮ সালের যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির আইন হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন এবং তিনি ১৭৯৮ সালের যুদ্ধকালীন আইন প্রয়োগ করে ভেনেজুয়েলার গ্যাং ট্রেন ডি আরাগুয়ার আক্রমণের অভিযোগ তুলেছিলেন।

যখন বোসবার্গকে জানানো হয় যে, কয়েকটি বিমান ইতিমধ্যেই এল সালভাদরের উদ্দেশ্যে উড্ডয়ন করেছে, যে দেশটি কুখ্যাত এক কারাগারে নির্বাসিত অভিবাসীদের রাখার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল, তখন বিচারক আদেশ দেন, সেই বিমানগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনতে হবে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরেই এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলে ঘোষণা দেন যে, নির্বাসিত ব্যক্তিরা ইতিমধ্যেই তার দেশে পৌঁছে গেছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টে বোসবার্গের আদেশ সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন শেয়ার করে তার ওপরে লেখেন, ‘উপস... অনেক দেরি হয়ে গেছে।’

অন‍্যদিকে, প্রশাসন দাবি করেছে, তারা কোনো আদেশ লঙ্ঘন করেনি। তারা উল্লেখ করেছে যে, বিচারক তার লিখিত আদেশে বিমান ঘুরিয়ে আনার নির্দেশ অন্তর্ভুক্ত করেননি এবং সেই নির্দেশ আসার আগেই বিমানগুলো যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে গিয়েছিল।

মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট চলতি মাসের শুরুতে বোসবার্গের অস্থায়ী আদেশ বাতিল করে দেয়, যা ‘অ্যালিয়েন এনিমিজ অ্যাক্ট’-এর অধীনে নির্বাসন আটকে রেখেছিল। তবে আদালত জানিয়েছে, অভিবাসীদের নির্বাসনের আগে তাদের সেই আদেশের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের সুযোগ দিতে হবে। কনজারভেটিভ সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকরা রায় দিয়েছেন, আইনি চ্যালেঞ্জগুলো টেক্সাসে অনুষ্ঠিত হবে, ওয়াশিংটন আদালতে নয়।

বোসবার্গ লিখেছেন, যদিও সুপ্রিম কোর্ট তার আদেশে আইনি ত্রুটি খুঁজে পেয়েছে, তা সত্ত্বেও সরকারের আদেশ লঙ্ঘনের জন্য কোনো অজুহাত হতে পারে না।

সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে এবং আনন্দের সাথে আদালতের আদেশ উপেক্ষা করেছে উল্লেখ করে তিনি জানান, বিমানের অবতরণের পর এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট বুকেলের পোস্ট মার্কো রুবিও রি-টুইট করেন, যা আদালতের আদেশের পরিপন্থী।

‘আদালত এমন সিদ্ধান্তে হালকাভাবে বা তাড়াহুড়ো করে পৌঁছেনি; বরং, এটি আসামিপক্ষকে তাদের কর্মকাণ্ড সংশোধন বা ব্যাখ্যা করার জন্য যথেষ্ট সময় দিয়েছে। তাদের কোনো জবাবই সন্তোষজনক হয়নি।’ লিখেছেন বোসবার্গ।

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন