https://www.prothomalony.com/
13087
opinion
সমকালীন বাংলা সাহিত্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কবি ও কথাসাহিত্যিক কাজী জহিরুল ইসলাম। তিনি ক্রিয়াপদহীন কবিতার প্রবর্তক। প্রকরণসিদ্ধ কবিতা রচনায় তিনি অনবদ্য। ভ্রমণসাহিত্যে ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়। প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা একশ’র কাছাকাছি, যার মধ্যে অর্ধেকই কবিতাগ্রন্থ। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে সাংবাদিক ও কলামলেখক আবুল খায়ের কবির এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন।
আবুল খায়ের: আপনি কেমন আছেন?
কাজী জহিরুল ইসলাম: খুব ভালো আছি।
আবুল খায়ের: আপনার শৈশব ও কৈশোর কেমন কেটেছে এবং কোথায়, একটু বলবেন কি?
জহিরুল: জন্মের পর থেকে পুরনো ঢাকার টিকাটুলি এলাকায় বেড়ে উঠেছি। তবে জন্ম হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার খাগাতুয়া গ্রামে। সেটি আমার নানাবাড়ি-গ্রাম। শৈশব, কৈশোরে আমি জন্মগ্রামে খুব যেতাম। প্রতি বছর স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা হয়ে গেলে গ্রামে গিয়ে একটা লম্বা সময় কাটানো ছিল আমাদের বাৎসরিক রুটিন। এ-ছাড়া বছরের মাঝখানেও যেতাম। গ্রামের গাছপালা, পাখ-পাখালি, ফসলের মাঠ, বর্ষার বিল এগুলো আমাকে নেশার মত টানত। নৌকার গলুইয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে আমি বর্ষার জলের ঘ্রাণ নিতাম। গ্রামে যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে যেতাম। যখন সপ্তম শ্রেণিতে উঠি তখন চলে আসি শহরতলী বাড্ডায়। আব্বা এক টুকরো জমি কিনে ঘর তোলেন, এখানেই কাটে কৈশোরকাল। বাড্ডা তখন একটা গ্রামই ছিল। লালা মাটির কাদা মাড়িয়ে স্কুলে যেতে হত, নিকটস্থ দোকানটিও ছিল প্রায় আধামাইল দূরে। আমাদের বাড়িটা বর্ষায় একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত দেখাত, চারপাশে অথৈ জলের ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ। খুব ভয় পেতাম বর্ষাকালে সেই বাড়িতে থাকতে।
আবুল খায়ের: শিক্ষাজীবনের কোনো স্মৃতি এখনো কষ্ট দেয় অথবা সুখ স্মৃতি যা প্রায়শ মনে পড়ে।
জহিরুল: ঢাকা, খাগাতুয়া এই করে করে দুই বার আমার শিক্ষাজীবনে ছেদ পড়ে। একবার চতুর্থ শ্রেণিতে, এক বার পঞ্চম শ্রেণিতে। বছরের অধিকাংশ সময় স্কুলে যাইনি কিন্তু তাই বলে পিছিয়ে পড়িনি, ঠিকই পরের বছর নতুন ক্লাসের বই পড়ে আপডেট হয়ে গেছি এবং যথাসময়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে গেছি। আমি তো বিজ্ঞানী হতে চেয়েছিলাম। নাইনে উঠে বিজ্ঞান ক্লাসে গিয়ে বসি। কিন্তু আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব খারাপ থাকায় আমার বড়ো মামা একদিন ক্লাসে এসে আমাকে বিজ্ঞান ক্লাস থেকে বের করে বাণিজ্য ক্লাসে বসিয়ে দেন। বলেন, কোনো রকমে আইকম পাস করে একটা কেরানীর চাকরি নাও, বাবার সংসারের হাল ধরো। এরপর আমি অনেক দিন কেঁদেছি। আমার কান্না দেখে আম্মাও কেঁদেছেন এবং তার ভাইকে বকাঝকা করেছেন। বহুদিন আমি কমার্সের বই সংগ্রহ করিনি। একদিন বাণিজ্যিক ভূগোলের শিক্ষক তয়েবুর রহমান, পরে তিনি বাড্ডা আলাতুন নেসা হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং পরে স্কুলটি কলেজ হলে তিনি প্রিন্সিপাল হন, ক্লাসে এসে পৃথিবীর কোন অঞ্চলে ভালো গম উৎপন্ন হয় জানতে চান। কেউ উত্তর দিতে পারেনি, আমি সঠিক উত্তর দিলে তিনি খুশি হন এবং আমাকে ‘গুড স্টুডেন্ট’ বলেন। পরে নতুন পড়া বোঝাতে গিয়ে দেখেন তার গুড স্টুডেন্টের সামনে বই নেই। তিনি বলেন, তোমার বই কোথায়? আমি বলি, আমার বই এখনো কেনা হয়নি।
তাহলে প্রশ্নের উত্তর দিলে কী করে?
আমি পাশে বসা আমার বন্ধু শামীম বিন সালামকে দেখিয়ে বলি, আপনি ক্লাসে আসার আগে ওর বইটা পড়ছিলাম। সেই থেকে স্যার আমাকে বিশেষ নজরে দেখতেন। আসলে বাণিজ্যিক ভূগোলের বইটা পড়তে আমার এতো ভালো লাগছিল, পুরো বইটাই আমি এক বসায় পড়ে ফেলি। তখন আমার স্মৃতিশক্তি খুব প্রখর ছিল। বলা যায় পুরো বইটাই আমার মুখস্ত হয়ে যায়।
আবুল খায়ের: কবে থেকে লেখালেখি করছেন, কিভাবে যুক্ত হলেন লেখালেখিতে?
জহিরুল: ছোটবেলায় নবী হতে চেয়েছিলাম। গৃহশিক্ষক শাহজাহান স্যার বলেন, নবী হওয়া যাবে না, তুমি কবি হও। সেই থেকে বোধ হয় কবি হয়ে যাই। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে মিল দিয়ে দিয়ে কবিতা লিখতাম। এসএসসি পাশ করার পর থেকে নিয়মিত ঢাকার পত্র পত্রিকায় লিখতে শুরু করি। দৈনিকের সাহিত্য পাতায় আমার প্রথম কবিতা ছাপা হয় সম্ভবত ১৯৮৫ সালে, দৈনিক আজাদ পত্রিকায়। সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন তখন কাজী সালাহউদ্দিন। এরপর থেকে গত ৪০ বছর ধরে অবিরাম লিখে চলেছি।
আবুল খায়ের: লেখকরা সামাজিক জীব, সমাজ পরিবর্তনে লেখকদের কী ভূমিকা হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
জহিরুল: লেখকেরা, বিশেষ করে কবিরা, সমাজের অস্বীকৃত আইন প্রণেতা। মানবিক, নৈতিক মূল্যবোধের ভিত্তিটা তৈরি করেন তারা। লেখকেরা সমাজকে সঠিক পথের সন্ধান দেন, একটি জাতিকে এবং কেউ কেউ পুরো পৃথিবীকেই সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখান। লেখকের নিজের নৈতিক ভিত খুব মজবুত হওয়া দরকার। লেখক যদি ব্যক্তি জীবনে সৎ না হন তাহলে বড় কাজ তাকে দিয়ে হয় না। আমাদের সমাজে অনেকগুলো বৃত্ত আছে, একেবারে কোরে বা বৃত্তের কেন্দ্রে থাকেন লেখকেরা। তারাই শুদ্ধতার সূত্রপাত করেন। তাকে ঘিরে একটি ছোটো বৃত্ত থাকে, সেই বৃত্ত লেখকের বাণী পৌঁছে দেয় অপেক্ষাকৃত বড়ো বৃত্তে, যেখানে থাকেন এক্টিভিস্টরা, তারা আরো বৃহত্তর বৃত্তে তা পৌঁছে দেন, সেখানে থাকেন রাজনীতির লোকেরা, তারা আরো বৃহৎ বৃত্তে কথাগুলো পৌঁছে দেন, সেখানে থাকেন সাধারণ মানুষ। এভাবে লেখকের দরকারী কথা, নৈতিক বক্তব্য সাধারণ মানুষ অব্দি পৌঁছাতে এবং তা গৃহীত হতে অনেক সময় লেগে যায়। যে সমাজের মানুষ বেশি বেশি বই পড়ে, সংবাদপত্র পড়ে, সেই সমাজে কাজটি দ্রুত ঘটে, যে সমাজের পাঠাভ্যাস কম সেই সমাজে তা খুব ধীরে ঘটে। লেখকের কোনো বন্ধু নেই, কোনো শত্রু নেই, আছে শুদ্ধ এবং অশুদ্ধ, ভালো এবং মন্দ। লেখকের মূল কাজ হচ্ছে মন্দগুলো তুলে ধরা, ভালোর পথ, আলোর পথ চিহ্নিত করা। একজন লেখকের সব সময় নিগৃহীত হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। নির্ভয়ে সত্য বলার জন্য প্রকৃত লেখকেরা সর্বকালেই নিগৃহীত হয়েছেন, মূলত এটিই একজন লেখকের সবচেয়ে বড়ো পুরস্কার।
আবুল খায়ের: আপনার প্রকাশিত গ্রন্থ সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন।
জহিরুল: গোটা দশেক সম্পাদিত গ্রন্থসহ মোট প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৯৭টি। এর অর্ধেকই কবিতা, ৫টি উপন্যাস এবং ২২-২৩টি গল্প লিখেছি। সংখ্যার দিক থেকে ভ্রমণের বই আছে দ্বিতীয় অবস্থানে, মুক্ত গদ্যের বইও আছে বেশ কিছু। কয়েকটি অনুবাদ গ্রন্থও আছে, সবগুলোই কবিতার। এজরা পাউন্ড, জালালুদ্দিন রুমি এবং রে আর্মান্ট্রাউটের কবিতা অনুবাদ করে বই করছি। শিশুদের জন্য দুটি বই লিখেছি, আরো কিছু লেখার ইচ্ছে আছে।
আবুল খায়ের: ৩৬ জুলাই নিয়ে আপনার অনেক কাজ আমরা দেখেছি, একটু যদি বলতেন।
জহিরুল: জুলাই অভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরিতে আমাদের মত অল্প কিছু সচেতন লেখকের ভূমিকা ছিল। আগেই বলেছি সত্য বলার জন্য লেখককে নিগৃহীত হতে হয়। হাসিনা-রেজিমের অপকর্মের প্রতিবাদ করে আমি প্রচুর কবিতা, কলাম, গদ্য লিখেছি। এসব কারণে বাংলাদেশে এবং নিউইয়র্কের বাঙালি সমাজে ক্রমাগত নিগৃহের শিকার হয়েছি। বাংলা একাডেমির একজন পরিচালক আমার লেখা নিয়ে ছাপেননি, বলেছেন, আপনি তো আমাদের লোক না। ঢাকার কিছু পত্রিকা আমাকে কালো তালিকাভূক্ত করেছে। নিউইয়র্কে তো ক্রমাগত আক্রমণের শিকার হয়েছি। এক দিন রাষ্ট্রদূত আমাকে ফোন করে বলেন, আপনার তো দেখি নিউইয়র্কে বন্ধুর অভাব নেই, জ্যাকসন হাইটসে নাকি আপনার বিরুদ্ধে মিছিল হবে। আওয়ামী লীগের সভায় পাবলিকলি আমার বিরুদ্ধে বিষোদগার করা হয়। এখানকার আওয়ামী লীগের একজন প্রধান নেতা এক দিন আমাকে বলেন, আপনার ব্যাপারে ডিজিএফআই ফোন দিয়ে জানতে চেয়েছে। এক বার নিউইয়র্কের সব পত্রিকা আমাকে বয়কট করার সিদ্ধান্ত নেয়। ক্রমাগত ‘রাজাকার’ গালি তো খেয়েছিই। ঢাকায় একদল ছড়িয়েছে আমার বেইজমেন্ট থেকে নাকি সরকার পতনের ষড়যন্ত্র হচ্ছে। প্রকৃত সত্য হলো এই, আমি অন্যায়ের প্রতিবাদ করি। আমাকে একবার ঢাকা থেকে বলা হলো, আপনি এতো ভালো লেখেন অথচ এখনো বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাননি, এবার আপনার কথা বিবেচনা হচ্ছে, ভ্রমণ সাহিত্যে দিলে আপনি মাইন্ড করবেন না তো? এরপরেই আসল কথাটি বলেন। সরকারের বিরুদ্ধে এতো লেখালেখি করেন কেন? এইসব লেখায় কী কোনো কাজ হবে? খামাখা নিজের ক্ষতি করছেন। এখন থেকে এইসব আর লিখবেন না।
এবার আপনাকে আমার লেখালেখির নীতিটা বলি। খুশবন্ত সিংয়ের মত, আমিও লিখি মানুষকে তথ্য দেওয়ার জন্য, আনন্দ দেওয়ার জন্য এবং একদল মানুষকে ক্ষেপানোর জন্য। লেখকের মূল কাজ প্রতিষ্ঠানের ত্রুটি বিচ্যুতি তুলে ধরা যাতে প্রতিষ্ঠানগুলো শুদ্ধ হতে পারে, এই কাজই আমি প্রতিনিয়ত করছি।
জুলাইয়ের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাফল্যকে অনেকে বিপ্লব বলতে চান না। আমি এটাকে বিপ্লবই বলি। জুলাইয়ের ২২/২৩ তারিখের দিকেই আমি বৈপ্লবিক সরকার গঠনের পরামর্শ দিয়েছিলাম। লিখিতভাবে না, পেছন থেকে যারা অভ্যুত্থানে কাজ করছিলেন তাদের একজন ফোন করে জানতে চাইছিলেন, ভাইয়া আমরা এখন কী করবো? তখন বলেছিলাম, আর কয়েক দিন আন্দোলন চালিয়ে যাও, যদি হাসিনা পদত্যাগ না করে তোমরা শহীদ মিনারে গিয়ে বৈপ্লবিক সরকার গঠন করে ফেলবে। এতে মৃত্যুর ঝুঁকি আছে সেটা মেনেই করতে হবে। কিন্তু ৫ তারিখে হাসিনার পতনের পর নানান পক্ষ এতে যুক্ত হয়, অন-গ্রাউন্ডে যারা ছিলেন তারা যা ভালো মনে করেছেন তাই করেছেন।
ব্যক্তিগত প্রাপ্তি নিয়ে আমি কখনো ভাবি না, দেশ নিয়ে ভাবি, দেশের মানুষ নিয়ে ভাবি, পৃথিবীর কল্যাণ নিয়ে ভাবি এবং তা লিখে মানুষকে জানাই। আবু সাঈদকে হত্যা করার পর ‘শহীদ আবু সাঈদ’ শিরোনামে কবিতাটি লিখে ১৯ জুলাই সকালে ফেসবুকে পোস্ট করি, সম্ভবত এর আগে আর কোনো কবি জুলাইয়ের ঘটনার ওপর কবিতা লেখেননি। মুগ্ধকে নিয়ে দীর্ঘ কবিতা লিখি, শহীদ ইয়ামিনকে নিয়ে লিখি। এ ছাড়া নাম উল্লেখ না করে আরো বেশ কিছু কবিতা লিখি। ক্রমাগত আন্দোলনের পক্ষে গদ্য লিখেছি, ৫ আগস্টের পরে রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে প্রচুর লিখেছি, আমার বিবেচনা অনুযায়ী বুদ্ধি পরামর্শ দিয়েছি, এখনো দিচ্ছি। কবির কাজ তার ভাষার মানুষকে স্বপ্ন দেখানো, আমি আমার জাতিকে একটি সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখাবার চেষ্টা করছি, আজীবন তা করবো।
আবুল খায়ের: বাংলা সাহিত্যের বিকাশে কী কী পদক্ষেপ থাকা উচিৎ বলে আপনি মনে করেন।
জহিরুল: এক সাক্ষাৎকারে তো সব বলা যাবে না। শুধু এই একটা বিষয়ের ওপরই একটা বই লেখা যেতে পারে। প্রথমত আমাদের লেখকদের সততা ও নৈতিকতার চর্চার মধ্যে আনতে হবে। সেটা করতে হবে সৎ এবং মেধাবী লেখকদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, পুরস্কার, সম্মাননা প্রদানের মধ্য দিয়ে। এরপর উদ্ভাবনী সাহিত্যকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে, তাহলে লেখকেরা অধিক সৃজনশীল হবেন। গতানুগতিক গল্প, কবিতা, উপন্যাসের জন্য পুরস্কার সম্মাননা দেওয়ার চেয়ে নতুন ধরণের কাজকে অধিক স্বীকৃতি দিতে হবে তাহলে লেখকেরা অধিক পরিশ্রমী হবেন এবং নতুনের অনুসন্ধান করবেন। এমন আরো বহু পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে।
আবুল খায়ের: লেখকদের উন্নয়নে কেমন নীতিমালা থাকা চাই।
জহিরুল: সকল পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকের বেতন হতে হবে বার্তা সম্পাদকের সমান এবং এই পদে একজন মেধাবী ও যোগ্য সাহিত্য বোদ্ধা ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে হবে। মেধার ভিত্তিতে সকল রাষ্ট্রীয় পদক, সম্মাননা দিতে হবে। সকল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে পাণ্ডুলিপি সম্পাদক নিয়োগ বাধ্যতামূলক করতে হবে। ভালো বই নিয়ে উন্নত মানের অনুষ্ঠান করতে হবে, ভালো বইয়ের লেখককে প্রোমোট করার জন্য সরকারি বেসরকারি উদ্যোগ তৈরি করতে হবে। মানহীন বইয়ের প্রকাশনা কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ কোর্স সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু করতে হবে। নিদেনপক্ষে সাহিত্যের একটি কোর্সও করেননি এমন লেখকদের মধ্যে কেবলমাত্র অসামান্য মেধার স্ফুরণ দেখাতে সক্ষম না হলে সেই লেখককে বই প্রকাশে নিরুৎসাহিত করতে হবে। প্রকাশকদের সচেতন হতে হবে, তারা যেন লেখকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে যা খুশি তা প্রকাশ না করেন।
আবুল খায়ের: জুলাই বিপ্লবে অনেক লেখক কোনো ভূমিকা রাখেনি, কেন?
জহিরুল: তারা লেখকের মত দেখতে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা লেখক নন। এত বড় অন্যায়ের, হত্যার প্রতিবাদ যে করে না তাকে আপনি লেখক বলবেন কী করে? চাটুকার, দলদাস কখনো লেখক হয় না। ভীতু মানুষ কখনো লেখক হয় না। এরা লেখক সমাজের কলঙ্ক। ব্যক্তিগত প্রাপ্তির প্রত্যাশা কিংবা অনৈতিক সুবিধা হারানোর ভয় এদের তাড়িত করেছে, এরাই স্বৈরাচার হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করেছে, হাসিনাকে রক্তলোলুপ এক দানবে পরিণত করেছে। বাংলাদেশের লেখক, সাংবাদিক, শিল্পী সমাজ যদি নষ্ট হয়ে না যেত তাহলে হাসিনা এতো বড়ো দানব হয়ে উঠতে পারত না।
আবুল খায়ের: সাহিত্য আপনাকে কী দিয়েছে কী দেয়নি। বর্তমান সাহিত্য নিয়ে কী বলবেন।
জহিরুল: সাহিত্য আমাকে প্রতিদিন একটু একটু করে উন্নত মানুষ হওয়ার দিকে ঠেলে দেয়। সাহিত্য আমাকে সাহসী করে তোলে। সাহিত্য আমাকে শক্তি দেয়। সাহিত্য আমার জ্ঞানতৃষ্ণা তৈরি করে। আর কী দেয়নি? না, আমার তেমন কোনো অপূর্ণতা নেই। তবে আজকাল মনে হয়, আমি যে কোনো একজন মানুষের মত ভোগ-বিলাসে আনন্দ করতে পারি না। গান শুনতে গেলে, সিনেমা দেখতে গেলে, বেড়াতে গেলে খুব তাড়া অনুভব করি, মনে হয় আমি সময়ের অপচয় করছি, আমার তো এই সময়ে কিছু লেখার কথা। এই দায়িত্ববোধের তাড়ার কারণে অন্যদের মত জীবনকে উপভোগ করতে পারি না। বাংলাদেশের বর্তমান সাহিত্য জগৎ কলুষিত। রাষ্ট্রের সকল অঙ্গের মত এই জায়গাটিও মাফিয়াদের দখলে। যে সরকার ক্ষমতায় আসে সেই সরকারের চাটুকারেরা এই জায়গাটি দখল করে নেয়। দেখেন, সবচেয়ে সৎ, নিরপেক্ষ ইউনূস সরকারের সময়েও পাঠ্যপুস্তকে হাসান রোবায়েতের একটি অপাঠ্য, দুর্বল কবিতা পাঠ্যপুস্তকে ঢোকানো হল। এতে শিক্ষা ব্যবস্থার যে ব্যাপক ক্ষতি হলো সেটা কারো চিন্তার মধ্যেই নেই। ছাত্রদের কাছের লোক তাই স্বজনপ্রীতি করা হল। আগের সরকারের আমলে এই জগৎ নিয়ন্ত্রণ করতেন কামাল চৌধুরী। তিনি নিজের কবিতাই পাঠ্যপুস্তকে ঢুকিয়ে দেন। শুধু তাই না, তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের প্রধান কবি। বাংলা একাডেমি, একুশে পদক সবই নিয়ে নেন। আরেক বছর থাকলে স্বাধীনতা পদকটাও নিতেন। অথচ তিনি মধ্যম পর্যায়ের একজন কবি। এমন অসংখ্য নাম বলা যায়। এই অবস্থা থেকে সাহিত্য জগৎকে বের করে আনতে না পারলে দেশের নৈতিক ভিত্তিটা কিছুতেই গড়ে উঠবে না।
আবুল খায়ের: আপনি একজন কবি ও কথাসাহিত্যিক। আপনি গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভ্রমণ গদ্য লিখেছেন, কোনটি লিখতে আপনার বেশি আনন্দ অনুভব করেন।
জহিরুল: কবিতা লিখেই বেশি আনন্দ পাই। কবিতাই আমার আরাধ্য। এক সময় প্রচুর ভ্রমণ লিখেছি। এখন ভ্রমণ লিখলেও সেটিকে ফিকশনের মত করে লিখি যাতে সৃজনশীলতার জায়গাটা তৈরি করা যায়।
আবুল খায়ের: আপনাকে নিরীক্ষাধরমী কাজ করতে দেখা যায়, কেন?
জহিরুল: নিরীক্ষা না করলে সাহিত্য এগুবে কী করে? নিরীক্ষা করে করেই তো নতুন কিছু তৈরি করতে হবে, এভাবেই আমাদের সাহিত্যের দিগন্তটা বড়ো হবে। আমি ক্রিয়াপদহীন কবিতা লিখেছি, উপদেশমূলক কবিতা কবুয়তনামা লিখেছি, কুকুরবাদ নিয়ে কথা বলেছি, এলিয়েনিজমের ধারণা দিয়েছি, বিভ্রান্তিবাদ বা কনফিউসিজমের কথা বলেছি। এইসব ধারণা যদি কাউকে উদ্বুদ্ধ করে আমাদের সাহিত্যের একেকটা নতুন জনরা তৈরি হবে, দিগন্তটা বড়ো হবে। মধ্যযুগের পয়ার ছাড়া কাঠামোর দিক থেকে বাংলা কবিতার তো নিজস্ব তেমন কিছু নেই। যাও আছে, ধরেন পুঁথিসাহিত্য, তার চর্চা নেই, আধুনিকায়ন নেই। নতুন কোনো উদ্ভাবনও নেই। আমার মত কেউ নতুন কোনো ধারণা নিয়ে হাজির হলে উৎসাহের বদলে জোটে তিরস্কার। আসলে নতুনকে বোঝার জন্য দরকার মেধা আর গ্রহণ করার জন্য দরকার উদার দৃষ্টিভঙ্গি, এই দুইয়ের কোনোটাই আমাদের নেই। তারপরেও আমি আশাহত নই, আল মাহমুদের ভাষায় বলি, ‘আশাহত হয় না কবিরা’। বাংলা সাহিত্যের একদিন সুদিন আসবে, প্রকৃত মেধাবীরা আলোতে উঠে আসবেন এবং আরো অধিক আলো ছড়াবেন এই প্রত্যাশা আমি আমৃত্যু বাঁচিয়ে রাখতে চাই।
আবুল খায়ের: বাংলা সাহিত্য নিয়ে আপনার একান্ত ভাবনা যদি বিশদভাবে বলতেন।
জহিরুল: আমি তো স্বপ্ন দেখি আমাদের মধ্য থেকে বিশ্বমানের লেখক বেরিয়ে আসবেন। শাহাদুজ্জামানের "একজন কমলালেবু" বইটা পড়ে মনে হয়েছে উপন্যাসে বড়ো কাজ তিনি করতে পারবেন। বিশ্বসাহিত্যের বেশ কিছু অনুবাদ বাংলায় হয়েছে, প্রতিনিয়ত হচ্ছে কিন্তু আমাদের সাহিত্য অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ করাতে হবে। এই কাজটি রাষ্ট্রীয়ভাবে করাতে পারলে খুব ভালো হয়, অথবা রাষ্ট্রীয় উৎসাহে, পৃষ্ঠপোষকতায় প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান বা কোনো সাহিত্য সংগঠনও করতে পারে।
আবুল খায়ের: দেশকে কোথায় দেখতে চেয়েছেন, দেশ এখন কোথায় আছে বলে মনে করেন।
জহিরুল: ৫৪ বছরের বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চর্চা হয়েছে খুব অল্প সময়। সেই গণতন্ত্রও কোনো ভালো গণতন্ত্র ছিল না। দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্র নেই। দুটি রাজপরিবারের হাতে দেশ জিম্মি। ছেলেরা যে সেকেন্ড রিপাবলিকের কথা বলে, যথার্থই বলে। সেটা করতে হলে একটি নতুন সংবিধান লাগবে। এই মুহূর্তে পাঁচ বছরের জন্য যদি একটি জাতীয় সরকার গঠন করে সেকেন্ড রিপাবলিক তৈরির কাজ করা যায় তাহলে সবচেয়ে ভালো হবে। ড. ইউনূসকে অনুরোধ করে যদি সেই সরকারের রাষ্ট্রপতি করা যায় তাহলে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াবে। আমাদের বিপুল জনসংখ্যা অনেক বড়ো সম্পদ কিন্তু আমরা ভুল নেতৃত্বের কারণে সেই সম্পদকে দেশের বোঝা বানিয়ে রেখেছি।
আবুল খায়ের: সলিমুল্লাহ খান বলেছেন, দেশে কোনো লেখক নেই, তাই তো ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। আপনি কি একমত?
জহিরুল: পুরোপুরি একমত। যারা আছে অধিকাংশই দালাল। দালালের কাজ ফ্যাসিবাদ তৈরি করা, লেখকের কাজ নৈতিক রাষ্ট্র তৈরি করা। একটু আগেই তো বললাম, লেখকের কাজ হলো রাষ্ট্রযন্ত্রের ত্রুটি নির্ণয় করা, স্তুতি করা নয়। জাফর ইকবালরা তো সিংহাসনের পায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়তেন, তাদের মতো চাটুকারদের জন্যই তো ফ্যাসিস্ট তৈরি হয়েছে।
আবুল খায়ের: দেশকে নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?
জহিরুল: বাংলাদেশ এক দিন এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে সভ্য এবং মানবিক দেশ হয়ে উঠবে। পৃথিবীর মানুষ তলাবিহীন ঝুড়ির দেশ নয়, দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দেশ নয়, বাংলাদেশের দিকে আঙুল তুলে বলবে, দেখো এবং শেখো কীভাবে সফল অর্থনীতির দেশ হয়ে উঠতে হয়, কীভাবে সাম্য এবং মানবিক মর্যাদার দেশ হয়ে উঠতে হয়। আমি স্বপ্ন দেখি বাংলাদেশ একদিন পৃথিবীর মধ্যে বাক স্বাধীনতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে, এই দেশ থেকে সাহিত্যে, অর্থনীতিতে, বিজ্ঞানে প্রায়শই নোবেল পুরস্কার পাবে।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন