https://www.prothomalony.com/
13040
north-america
প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৫ ০২:৫৭
ফিলিস্তানের গাজা উপত্যকায় গত ২৩ মার্চ ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্স ও একটি অগ্নিনির্বাপণ ট্রাকে লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি চালায়, যার ফলে ১৫ জন ফিলিস্তিনি জরুরি সেবা কর্মী নিহত হন। এই হত্যাকান্ড নিয়ে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) দাবি করেছিল, কয়েকটি সমন্বয়হীন যানবাহন আলো বা জরুরি সংকেত ছাড়া সেনাদের দিকে সন্দেহজনকভাবে এগিয়ে যাচ্ছিলেল দেখে ‘আইডিএফ’ গাড়িগুলোর ওপর গুলি চালায়। তবে, এই ঘটনার যে ভিডিও ফুটেজ প্রকাশিত হয়েছে, তা তাদের প্রাথমিক দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
প্রকাশিত ভিডিওতে একটি অ্যাম্বুলেন্সের সামনে থেকে ধারণ করা হয়েছল, যাতে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, চিহ্নিত অ্যাম্বুলেন্সের একটি বহর ভোরবেলায় রাস্তা ধরে এগোচ্ছে। প্রতিটি গাড়ির হেডলাইট এবং জরুরি ফ্ল্যাশিং লাইট চালু। অ্যাম্বুলেন্স বহরটি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকটি গাড়িকে সামনে পেয়ে থেমে যায়। ওই গাড়িটি ছিল আরেকটি অ্যাম্বুলেন্স (প্যালেস্টাইন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্য মতে) যা আহত বেসামরিক লোকজনকে সাহায্য করতে আগে থেকেই সেখানে পাঠানো হয়েছিল। ইউনিফর্ম পরা দুইজন উদ্ধারকর্মী গাড়ি থেকে নেমে আসেন, আর ঠিক তখনই যানগুলো লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এ সময় ভিডিও বন্ধ হয়ে যায়, তবে অডিও প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে চলতে থাকে। সেখানে থাকা ফায়ার ট্রাক ও অ্যাম্বুলেন্সে স্পষ্টভাবে পিআরসিএসের চিহ্ন ছিল।
এই ফুটেজ প্রমাণ করে যে গাড়িগুলো সন্দেহজনক ছিল না, বরং পরিষ্কারভাবে জরুরি চিকিৎসা সহায়তা বহন করছিল। প্যালেস্টাইন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি আরো জানিয়েছে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত ১৫ জন অ্যাম্বুলেন্স ও ত্রাণকর্মীর একজনের মোবাইল ফোন থেকে ভিডিওটি উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁর নাম রিফআত রাদওয়ান। গুলির মাঝে তিনি বারবার মৃত্যুর আগে ‘শাহাদা’ পাঠ করছিলেন। তিনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইছিলেন এবং বলছিলেন যে তিনি জানেন, তিনি মারা যাচ্ছেন। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আমাকে মাফ করে দিও মা, আমি এই পথটা বেছে নিয়েছি মানুষের সাহায্য করার জন্য - আমি কসম করে বলছি, এই পথটা আমি শুধু মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্যই বেছে নিয়েছি।’
ভিডিওতে অন্যদের কণ্ঠও শোনা যায়, পাশাপাশি কিছু মানুষের কণ্ঠও শোনা যায়, যারা হিব্রু ভাষায় আদেশ দিচ্ছিলেন। তবে এটি স্পষ্ট নয় তারা কারা এবং কী বলছিলেন। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনা ও উদ্বেগ ছড়িয়েছে।
গত মাসে উদ্ধারকর্মীদের নিখোঁজ হওয়ার এক সপ্তাহ পর, তাদের মরদেহ দক্ষিণ রাফাহ অঞ্চলের একটি গণকবর থেকে উদ্ধার করা হয়। পিআরসিএসের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘উদ্ধারকৃত ১৪টি মরদেহের মধ্যে ৮ জন প্যালেস্টাইন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সদস্য, ৫ জন সিভিল ডিফেন্স কর্মী এবং ১ জন জাতিসংঘ সংস্থার কর্মী ছিলেন। এই হত্যাকাণ্ডের পর আন্তর্জাতিকভাবে তীব্র নিন্দা শুরু হয়।’
সম্প্রতি, ভিডিওটি প্রকাশের পর, ‘আইডিএফ’ জানায় যে ঘটনাটি তদন্তাধীন। গত শনিবার (এপ্রিল ৫) এক বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘ঘটনাটি নিয়ে যেসব দাবি এবং ভিডিও ঘুরে বেড়াচ্ছে, সবকিছুই গভীরভাবে যাচাই করা হবে, যেন পুরো ঘটনাক্রম এবং ব্যবস্থাপনার বিশদ বিশ্লেষণ করা যায়।’
‘আইডিএফ’ বলেছে যে, ‘তদন্তের ফলাফল রোববার (এপ্রিল ৬) চিফ অফ স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল আইয়াল জামিরকে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর একটি তদন্তে এমন তথ্য উঠে এসেছে যা ইসরায়েলি আকাশ নজরদারি ভিডিও থেকে প্রাপ্ত, তবে এই ভিডিওটি এখনও প্রকাশ করা হয়নি। সিএনএন-কে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এক কর্মকর্তা এই তথ্য জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, সামরিক কর্মকর্তার মতে, গোলানি পদাতিক ব্রিগেডের সেনারা গত ২৩ মার্চ ভোরের দিকে একটি সড়কে অতর্কিত অপারেশন চালায়। ভোর সাড়ে চারটা নাগাদ তারা প্রথম একটি গাড়িতে গুলি চালায়, যার ফলে দুইজন নিহত হন এবং একজনকে আটক করা হয়, যাদের হামাসের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলে ‘আইডিএফ’ দাবি করে। প্রায় দুই ঘণ্টা পর সকাল ৬টায় অ্যাম্বুলেন্স বহরটি ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
সেনারা বলেছে, ‘ড্রোন অপারেটররা তাদের জানিয়েছিল যে যানবাহনগুলো সন্দেহজনকভাবে এগিয়ে আসছিল। তারা বলেছে যে, অ্যাম্বুলেন্স বহরটি রাস্তার পাশে থামার পর লোকজন দ্রুত গাড়ি থেকে বের হলে, তারা অবাক হয়ে গুলি চালায় এবং তারা মৃতদের মধ্যে অনেক জরুরি কর্মীকে পড়ে থাকতে দেখলেও বিশ্বাস করে যে তাদের আক্রমণ সফল ছিল এবং কিছু মৃতের পরিচয় যাচাই করার চেষ্টা করেছিল।’
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী, গত ১ এপ্রিল এক বিবৃতিতে জানায়, তাদের প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা গেছে যে, সেনারা হামাসের এক সামরিক সদস্য মোহাম্মদ আমিন ইব্রাহিম শুবাকি এবং হামাস ও ইসলামিক জিহাদের আরও আটজন সন্ত্রাসীকে হত্যা করেছে, যারা ৭ অক্টোবরের হামলায় জড়িত ছিল।
সিএনএন জানায়, প্যালেস্টাইন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির কাছ থেকে তারা নিহত ১৪ জনের নাম পেয়েছে- এর মধ্যে মোহাম্মদ শুবাকি নামের কেউ নেই। নিহত ১৫তম ব্যক্তি জাতিসংঘের ইউএনআরডব্লিুএ-তে কর্মরত ছিলেন, তার নাম পরিবারের সম্মানের খাতিরে প্রকাশ করা হয়নি, তবে সেটিও ইসরায়েলের দেওয়া নামের সঙ্গে মেলে না।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এখনো কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি যে নিহত ৯ জন জরুরি সহায়তা কর্মী আসলে সন্ত্রাসী ছিল।
অন্যদিকে, মৃত জরুরি সেবা কর্মীদের কেন নিজ উদ্যোগে গণকবর দেয়া হল, এ নিয়ে ইসরায়েলের এক সামরিক কর্মকর্তা সিএনএন-কে বলেন, ‘তারা মনে করেছিলেন পিআরসিএস এবং জাতিসংঘের সঙ্গে সমন্বয় করে মৃতদেহগুলো উদ্ধার করতে সময় লাগবে। তাই, তারা নিজ উদ্যোগে কর্মীদের মৃতদেহ কবর দিয়েছিল।’তবে কেন জরুরি সেবার যানবাহনগুলোও কবর দেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে ইসরায়েল এখনো কিছু ব্যাখ্যা দেয়নি।
গত ২৩ মার্চের স্যাটেলাইট চিত্রে, যা প্রথমে আল জাজিরা আরবিতে প্রকাশ করে এবং পরে সিএনএন বিশ্লেষণ করে, দেখা যায়- প্যালেস্টাইন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ও সিভিল ডিফেন্সের পাঁচটি অ্যাম্বুলেন্সকে ঘিরে রেখেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সামরিক যানবাহন। এর দুই দিন পর, ২৫ মার্চের আরেকটি স্যাটেলাইট চিত্রে- যেটি আল জাজিরা প্রকাশ করেছ ও সিএনএন বিশ্লেষণ করেছে- দেখা যায় একই স্থানে একটি ইসরায়েলি ট্যাঙ্ক, একটি খননকারী যন্ত্র এবং আরও কিছু সামরিক যানবাহন অবস্থান করছে।
যেখানে এক সময় অ্যাম্বুলেন্সগুলো দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানকার মাটি থেকে এখন বেরিয়ে এসেছে ধ্বংসপ্রাপ্ত যানবাহনের ধ্বংসাবশেষ।
যখন মানবিক সহায়তা প্রদানকারীরাও আর নিরাপদ নয়, তখন কি মানবতা আর যুদ্ধের নিয়ম বলে কিছু থাকে? জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে এখন প্রশ্ন- এই ধরনের হত্যাকাণ্ডকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে? যুদ্ধের নামে যদি জীবনরক্ষাকারী মানুষেরাই নির্মমভাবে প্রাণ হারান, তবে সে যুদ্ধ আসলে কাদের বিরুদ্ধে? এ ঘটনায় আবারও প্রশ্ন উঠছে- মানবিক সহায়তা কর্মীদের ওপর হামলা কি যুদ্ধাপরাধ নয়?
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন