https://www.prothomalony.com/
13029
north-america
প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৫ ০০:৪০
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বুধবার (২ এপ্রিল) এক ভাষণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও শুল্ক (ট্যারিফ) নিয়ে বেশকিছু দাবি উত্থাপন করেন- যার বেশিরভাগই আগেও তিনি বলেছেন, কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে সেগুলোর বেশ কিছুটা ফারাক রয়েছে।
তাঁর কয়েকটি বক্তব্যের ফ্যাক্ট চেক তুলে ধরেন ‘সিএনএন’-এর সিনিয়র সাংবাদিক ড্যানিয়েন ডেল।
কানাডার দুধের শুল্ক:
ট্রাম্প বলেছেন যে, কানাডা কিছু মার্কিন দুধের পণ্যের উপর ২৫০ শতাংশের বেশি শুল্ক আরোপ করে। তবে তিনি ভুলভাবে দাবি করেন যে, প্রথম ছোট দুধের কার্টন রপ্তানি করলে দাম কম হয়, পরে তা ২৭৫ শতাংশ থেকে ৩০০ শতাংশ শুল্কে পৌঁছে।
বাস্তবে, কানাডা প্রতি বছর হাজার হাজার মেট্রিক টন আমদানি করা মার্কিন দুধের জন্য শূন্য শুল্কের নিশ্চয়তা দিয়েছে, শুধুমাত্র একটি ছোট কার্টন নয়। কানাডা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইউনাইটেড স্টেটস-মেক্সিকো-কানাডা চুক্তির অংশ হিসেবে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শূন্য শুল্কের মার্কিন দুধের বাজারে প্রবেশের সুযোগ দেয়, যা ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসন নিজেই আলোচনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
তাছাড়া, ট্রাম্প কানাডার দুগ্ধজাত পণ্যের শুল্ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলি ক্রমাগতভাবে এড়িয়ে গেছেন। তিনি এমন কোনো তথ্য উল্লেখ করেননি যা মার্কিন দুগ্ধ শিল্প স্বীকার করেছে। যুক্তরাষ্ট্র কানাডায় রপ্তানি করা কোন দুগ্ধজাত পণ্যের শূন্য-শুল্কের সর্বোচ্চ স্তর অতিক্রম করছে না, ফলে কানাডিয়ান শুল্ক প্রয়োগ করা হচ্ছে না। বিশেষ করে দুধের ক্ষেত্রে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুল্কমুক্ত কোটার অর্ধেকও রপ্তানি করছে না।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি:
ট্রাম্প দাবি করেছেন, ‘আমরা অনেক দেশকে ভর্তুকি দিই’ এবং ভুলভাবে বলেছেন যে, কানাডার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি ‘প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার।’ তিনি বহু বার কানাডার সঙ্গে এই পরিমাণ ঘাটতির কথা বলেছেন, যদিও প্রকৃতপক্ষে কানাডার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত বাণিজ্য ঘাটতি তার বলা পরিমাণের অনেক কম। যুক্তরাষ্ট্রের অফিসিয়াল পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে কানাডার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য ও সেবা বাণিজ্যে মোট ঘাটতি ছিল ৩৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, আর শুধুমাত্র পণ্যের বেলায় তা ছিল ৭০ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।
এবার ট্রাম্প সরাসরি বাণিজ্য ঘাটতির কথা উল্লেখ করেননি, তবে যদি ধরে নেওয়াও হয় যে তিনি ‘ভর্তুকি’ শব্দটি আরও বিস্তৃত অর্থে ব্যবহার করেছেন, তাহলেও তাঁর এই দাবির পক্ষে কোনো তথ্যগত ভিত্তি নেই।
কারা শুল্ক দেয়:
ট্রাম্প প্রায়ই দাবি করেন যে, তিনি তার প্রথম মেয়াদে চীনের উপর যে শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তার ফলে যুক্তরাষ্ট্র শত শত বিলিয়ন ডলার আয় করেছে এবং এই টাকা তারা (চীন) দিয়েছে।
এই দাবি ভুল। বাস্তবে, শুল্ক পরিশোধ করে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারকেরা, চীনের রপ্তানিকারকেরা নয়। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, ট্রাম্পের আমলে চীনের ওপর আরোপিত শুল্কের প্রধান বোঝা বহন করেছে আমেরিকান ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তারা। অনেক আমেরিকান কোম্পানি এই শুল্কের খরচ সরাসরি পণ্যের দামে যুক্ত করে ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে, অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত এই শুল্কের খরচ এসেছে আমেরিকান জনগণের পকেট থেকেই।
পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্টদের আমলে চীনের ওপর শুল্ক:
ট্রাম্প ভুলভাবে দাবি করেন যে, তার প্রথম প্রেসিডেন্সির আগে ‘চীন কোনো প্রেসিডেন্টকেই ১০ সেন্টও দেয়নি’ শুল্ক হিসেবে। কিন্তু এই বক্তব্য সঠিক নয়। প্রথমত, আগেই বলা হয়েছে, শুল্কের টাকা চীন নয়, যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারকেরা দেয়। দ্বিতীয়ত, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার বহু আগেই যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক বসিয়ে প্রতিবছর বিলিয়ন ডলার রাজস্ব অর্জন করছিল। মূলত ১৭৮৯ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করে আসছে। ট্রাম্পের পূর্বসূরি প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও চীনা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ:
ট্রাম্প শুল্কের কথিত সুফল তুলে ধরে দাবি করেন, ‘১৭৮৯-১৯১৩ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র আনুপাতিকভাবে সবচেয়ে ধনী ছিল,’ সেই সময় যখন শুল্ক ছিল ফেডারেল সরকারের প্রধান রাজস্ব উৎস (১৯১৩ সালে ফেডারেল ইনকাম ট্যাক্স চালু হওয়ার আগে)। তবে ট্রাম্প ‘প্রোপোরশনেটলি দ্য উয়েলদিয়েস্ট’ বলললেও স্পষ্ট করেননি তিনি ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন।
ট্রাম্পের এই দাবি অর্থনৈতিক তথ্য ও ইতিহাসভিত্তিক মানদণ্ড অনুযায়ী সত্য নয়। মানদণ্ড অনুসারে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে এবং তার আগের তুলনায় অনেক ধনী। মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন এখন তখনকার তুলনায় অনেক গুণ বেশি। ডার্টমাউথ কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক ডগলাস আরউইন, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি নিয়ে গবেষণা করেন, ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্পের অনুরূপ দাবির পর বলেছেন, ‘যদি ট্রাম্পের বক্তব্য থেকে ধরে নেওয়া হয় যে, তিনি প্রতি-ব্যক্তি আয় বোঝাতে চেয়েছেন (যেমন অর্থনীতিবিদরা সাধারণত বোঝেন), তবে এই দাবি স্পষ্টভাবে ভুল। আজকের দিনে প্রতি-ব্যক্তি আয় এবং জীবনমান অতীতের তুলনায় অনেক বেশি। আজ আমাদের ঘরে পানি, স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ রয়েছে যা এক সময় ছিল না।’
তিনি এটাও উল্লেখ করেন যে, ট্রাম্প সম্ভবত গৃহযুদ্ধের পরে ফেডারেল সরকার কীভাবে ‘সামঞ্জস্যপূর্ণ বাজেট উদ্বৃত্ত পরিচালনা করেছিল এবং জাতীয় ঋণ প্রায় পরিশোধ করেছিল’ তা উল্লেখ করেছিলেন। কারণ, ট্রাম্প মনে করেন, সরকার বেশি টাকা আয় করছে এবং কম ব্যয় করছে মানেই দেশ ধনী হচ্ছে। বড় বাজেট উদ্বৃত্ত কোনো দেশকে ধনী করে তোলে না।
বাইডেন ও ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতি:
ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, জো বাইডেনের প্রেসিডেন্সিতে যুক্তরাষ্ট্রে ‘দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ’ মুদ্রাস্ফীতি হয়েছে। ট্রাম্পের দাবিগুলো অতিরঞ্জিত এবং তথ্যানুযায়ী পুরোপুরি সঠিক নয়। ট্রাম্প চাইলে যুক্তিযুক্তভাবে বলতে পারতেন যে, ২০২২ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রে বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতির হার ৯ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছেছিল, যা গত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে এটি মোটেও সর্বকালের রেকর্ড নয়- যুক্তরাষ্ট্রে সর্বোচ্চ মুদ্রাস্ফীতি হয়েছিল ১৯২০ সালে, যার হার ছিল ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ।
এছাড়া, বাইডেন প্রেসিডেন্সির শেষ সময়, অর্থাৎ ডিসেম্বর ২০২৪-এ, মুদ্রাস্ফীতি ছিল ২ দশমিক ৯ শতাংশ এবং জানুয়ারি ২০২৫-এ (যেটি বাইডেন ও ট্রাম্প- উভয়ের সময়কাল অন্তর্ভুক্ত করে), মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৩ শতাংশ।
ট্রাম্প আরও দাবি করেছেন যে, তার প্রেসিডেন্সিতে ‘প্রায় কোনো মুদ্রাস্ফীতি ছিল না।’ যদিও ‘প্রায়’ শব্দটি তাকে কিছুটা ছাড় দিয়েছে, তবুও বাস্তবতা হলো- তার চার বছরের মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৮ শতাংশ বেড়েছিল। তিনি যখন ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতা ছাড়েন, তখন বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল ১ দশমিক ৪ শতাংশ।
গ্যাসের দাম নিয়ে ট্রাম্পের দাবি:
ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, তিনি আবার ক্ষমতা নেওয়ার পর (জানুয়ারি ২০২৫) গ্যাসোলিনের দাম ‘অনেক কমিয়ে এনেছেন’ এবং বলেছেন, ‘গ্যাসোলিন এখন অনেক জায়গায় ৩ ডলারের নিচে।’ যুক্তরাষ্ট্রের কিছু এলাকায় গ্যাসের দাম ৩ ডলারের নিচে নামলেও জাতীয় গড় দাম ট্রাম্পের বক্তব্যের সময় ছিল প্রতি গ্যালন ৩ দশমিক ২৪ ডলার (এএএ’র তথ্য অনুযায়ী)। ট্রাম্পের শপথ নেওয়ার দিন (জানুয়ারি ২০২৫) গড় দাম ছিল ৩ দশমিক ১২ ডলার। এর মানে এই নয় যে, গ্যাসের দামের এই বৃদ্ধির জন্য ট্রাম্প দায়ী- কারণ, গ্যাসের দামের উপর প্রেসিডেন্টদের প্রভাব সীমিত। আন্তর্জাতিক বাজার, চাহিদা ও সরবরাহের ওঠানামা এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপরই গ্যাসের দাম মূলত নির্ভর করে। তবে এটা সত্য যে, ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির সময় অর্থাৎ ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত জাতীয় গড় গ্যাসের দাম কমেনি।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন