https://www.prothomalony.com/

12916

north-america

উত্তর আমেরিকা

ইতিহাস সেই জবাব জানতে চাইবে

প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৫ ০৬:৪৮

যখন অন্যায় ঘটে, তখন শুধু অন্যায়কারীর জন‍্যই ইতিহাস লেখা হয় না—নীরব দর্শকদের চুপ করে থাকা, তাদের পিছু হটাও সেই ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। ন্যায় ও অন্যায়ের দ্বন্দ্বে মাঝামাঝি কোনো অবস্থান থাকে না। ইতিহাস সাক্ষী, অন্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে যারা নীরব থাকে, তারা নিপীড়কের সমান অপরাধী। ন্যায় ও অন্যায়ের দ্বন্দ্বে নিরপেক্ষতা কেবলই একটি ভ্রান্তি, আর এখানেই নীরবতা একপ্রকার সম্মতির ভাষা হয়ে ওঠে। সময়ের পরীক্ষায় প্রতিটি মানুষকে দাঁড়াতে হয় সত্য ও মিথ্যার মাঝখানে, যেখানে কণ্ঠস্বর তুলতে না পারা মানেই বিবেকের মৃত্যুর দিকে একধাপ এগিয়ে যাওয়া।

ফ্রেডেরিক ডগলাস বলেছিলেন, "যেখানে ন্যায়বিচার অস্বীকৃত হয়, যেখানে দারিদ্র্য চাপিয়ে দেওয়া হয়, যেখানে অজ্ঞতা বিরাজ করে, এবং যেখানে কোনো একটি শ্রেণিকে এই অনুভূতি দেওয়া হয় যে সমাজ একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাদের দমন, শোষণ ও অবমাননা করছে—সেখানে ব্যক্তি বা সম্পদ কোনোভাবেই নিরাপদ থাকতে পারে না।"

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আমাদের সামনে যে বাস্তবতা উন্মোচন করেছিল, তা ইতিহাসের এক নির্মম রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। এবং এ কেবল রাজনীতি বা বিপ্লবের অধ‍্যায় নয়; এটি এক নৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবিও, যেখানে কিছু কলমধারীর নীরবতা সবচেয়ে ভয়াবহ রূপে ধরা দিয়েছিল। তখন যারা কলম ধরেছিলেন, তারা কেবল সত্যের পক্ষেই দাঁড়াননি—তারা প্রজন্মের বিবেকের প্রতিধ্বনি হয়ে উঠেছেন। আর যারা যারা লিখতে পারত, যারা সত্য উচ্চারণ করতে পারত, তারা যখন চুপ ছিলেন, তাদের নীরবতা কি নিরপেক্ষ ছিল, নাকি অন্যায়ের ছায়াতলে গিয়ে দাঁড়ানোর নামান্তর? এসব প্রশ্নই আজ মনে দোলা দেয়।

ইতিহাস কখনো নিস্তব্ধতার সাক্ষী রাখে না, বরং যারা নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তাদের আত্মদানের মাধ্যমেই ভবিষ্যৎ নির্মিত হয়। সেই জুলাই আগস্টের সংকটময় সময়ে কিছু কবি ও লেখকদের নীরবতা আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। কারণ, প্রথমত, লেখকদের সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। সমাজের দর্পণ হিসেবে লেখকগণ সমাজের সমস্যাগুলোকে তুলে ধরবেন এবং সেগুলোর সমাধানে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করবেন, এমনটাই জানি। একজন লেখক হিসাবে আমার মনে হয়েছে, আমাদের কলম শুধু সৃষ্টির মাধ্যম নয়, বরং সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের হাতিয়ার। তাই জুলাই আগস্টে দিনরাত কলম ধরেছি। যখন রাষ্ট্র তার নাগরিকদের উপর নিপীড়ন চালায়, তখন আমাদের দায়িত্ব হয় সেই অবিচারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা। কিন্তু আমরা যখন সেই মুহূর্তে নীরব থাকি, তখন তা আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে পিছিয়ে আসার ইঙ্গিত দেয়।

তাছাড়া, নৈতিক মূল্যবোধকে অস্বীকার করা যায় কী? সমাজে যখন মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়, গুরুতর অন্যায় সংঘটিত হয়, এবং নিরপরাধ মানুষ নিপীড়নের শিকার হয়, গণহত‍্যা ঘটে, তখন নীরবতা সেই অন্যায়ের পক্ষে সমর্থন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, নীরবতা অপরাধের সমতুল্য হয়ে ওঠতে পারে। লেখকদের নৈতিক দায়িত্ব হল সত্য প্রকাশ করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। নীরবতা শুধুমাত্র নিপীড়কের পক্ষে সমর্থন জ্ঞাপন করে না, বরং সমাজে অবিচারকে স্থায়ী করে তোলে। লেখকরা যদি নিজেদের স্বার্থে বা ভয়ে নীরব থাকেন, তবে তা নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

দক্ষিণ আফ্রিকার ফটোগ্রাফারের কেভিন কার্টারের কথা অনেকেই জানেন। তিনি ১৯৯৩ সালে সুদানে একটি ভয়াবহ ছবি তোলেছিলে, যেখানে একটি ক্ষুধার্ত শিশু শকুনের দিকে তাকিয়ে ছিল এবং শকুনটি শিশুটিকে হুমকি দিচ্ছিল। এই ছবি বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল এবং আফ্রিকার দুর্ভিক্ষের বাস্তবতা তুলে ধরেছিল। কঙ্কালসার শিশু আর ক্ষুধার্ত শকুনের ছবি তুলে তিনি পেয়েছিলেন পুলিৎজার পুরস্কার।

কার্টার তার দায়িত্ববোধ অনুযায়ী দুর্ভিক্ষ ও মানবিক সংকটের বাস্তব চিত্রটিই বিশ্বকে দেখাতে চেয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে।

তবে, এই ছবি তোলার পর ক্যার্টার ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হন, বিশেষ করে তার এই সিদ্ধান্তের জন্য যে তিনি শিশুটিকে সাহায্য করার পরিবর্তে ছবি তুলেছেন। একসময় কার্টার প্রচণ্ড অনুশোচনার মুখোমুখি হন। শিশুটিকে শকুনের থাবা থেকে কেন রক্ষা করতে পারেননি, সেই অনুশোচনায় পরবর্তীতে ক্যার্টার নিজের দুঃখ ও অনুতপ্ত হওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করেন ১৯৯৪ সালে আত্মহত্যা করে।

কার্টারের অনুশোচনা এবং পরবর্তীতে তার আত্মহত্যা থেকে আমাদের কি কিছুই শেখার নেই? আমরা যদি শুধু নিজের স্বার্থের কথা ভাবি এবং বিপদগ্রস্ত কাউকে সাহায্য না করি, তাহলে তা কেবল নৈতিক ব্যর্থতাই নয়, বরং ভবিষ্যতে আমাদের নিজেদের জন্যও অনুশোচনার কারণ হতে পারে, যা মানসিকভাবে বিবেকবানদের জন‍্য কঠিন অবস্থা তৈরি করতে পারে। কেভিন কার্টারের ঘটনা আমাদের দেখায়, কাউকে মৃত‍্যুর রথে ছেড়ে দিতে নেই।

ইতিহাসে অনেক লেখক নির্যাতন, দমন-পীড়ন ও সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার কারণে কারাবরণ করেছেন। ফিওদর দস্তয়েভস্কি ১৮৪৯ সালে জার শাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হন। তাকে

পিটার অ্যান্ড পল দুর্গে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে সে সময়ের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ আসামীদের রাখা হতো। তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু পরে শাস্তি কমিয়ে সাইবেরিয়ায় ৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এই অভিজ্ঞতা তার অনেক সাহিত্যকর্মে প্রভাব ফেলেছে, বিশেষ করে 'ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট' ও 'দ‍্য হাউজ অফ  ডেড' বইয়ে।

আন্তোনিও গ্রামশি ছিলেন একজন মার্ক্সবাদী দার্শনিক ও লেখক, তিনি ইতালীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং এক সময়ের নেতা ছিলেন। ফ্যাসিস্ট নেতা বেনিটো মুসোলিনি এবং ফ্যাসিবাদের একজন কট্টর সমালোচক হিসাবে তাকে ১৯২৬ সালে মুসোলিনির সরকার গ্রেফতার করে এবং ১১ বছরের জন্য কারাগারে পাঠায়। তিনি কারাগারে বসেই তার বিখ্যাত 'প্রিজন নোটবুকস' লিখেছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে বামপন্থী চিন্তাধারার ভিত্তি হয়ে ওঠে।

সোভিয়েত শাসনের কঠোর সমালোচক ছিলেন আলেক্সান্ডার সলঝেনিৎসিন। ১৯৪৫ সালে তদানীন্তন জোসেফ স্টালিন সরকারের সমালোচনা করার ফলে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং ৮ বছরের জন্য গুলাগে বন্দি রাখা হয়। এ নিয়ে তার প্রথম বই 'ওয়ান ডে ইন্‌ দ্য লাইফ অফ ইভান দেনিসোভিচ' (ইভান দেনিসোভিচের জীবনে একটি দিন) ১৯৬০ সালে ছাপা হয়। মুক্তির পর তিনি 'দ্য গুলাগ আর্কিপেলাগো' (গুলাগ দ্বীপপুঞ্জ) তিন খণ্ডে প্রকাশ করেন, যা গুলাগ সিস্টেমের বর্বরতা এবং সোভিয়েত কমিউনিজমের প্রকৃত চরিত্র সমগ্র বিশ্বের কাছে তুলে ধরে।

ভাকলাভ হ্যাভেল ছিলেন চেক লেখক ও নাট্যকার, যিনি কমিউনিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। তার লেখা এবং 'চার্টার ৭৭' আন্দোলনের কারণে ১৯৭৯ সালে তাকে কারাবন্দি করা হয়। পরে তিনি চেকোস্লোভাকিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেন।

ইন্ডিয়ান লেখক মুনশি প্রেমচাঁদ তার  মডার্ন হিন্দুস্তানি সাহিত‍্যের জন‍্য জনপ্রিয় ছিলেন। ১৯০৯ সালে, তাঁর উপন্যাস 'সোজ-ই-ওয়াতান' ব্রিটিশ সরকারের নজরে আসে, যারা এটিকে বিদ্রোহী রচনা বলে নিষিদ্ধ করে। ব্রিটিশ কর্মকর্তারা এমনকি প্রেমচাঁদের বাড়িতে অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন, যেখানে 'সোজ-ই-ওয়াতান'-এর প্রায় ৫০০ কপি পুড়িয়ে ফেলা হয়। যদিও তাকে দীর্ঘমেয়াদী কারাবরণ করতে হয়নি, তবে ব্রিটিশ সরকার তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে এবং তাকে নিপীড়নের শিকার হতে হয়।

এই যে তাদেরকে আজও আমরা স্মরণ করি, কেন করি? কারণ তারা নিপীড়নের বিরুদ্ধে কলমকে নিজের শক্তি হিসাবে ব্যবহার করেছেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, যা তাদের সাহসী কণ্ঠকে ইতিহাসে অমর করেছে।

কাজুকি তাকাহাশির কথা না বললেই নয়, জনপ্রিয় জাপানি সিরিজ "ইউ-গি-ওহ!"-এর স্রষ্টা কাজুকি তাকাহাশি ২০২২ সালের ৪ জুলাই, ডুবে যাওয়া তিনজনকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে মারা যান। তার বয়স ছিল ৬০। আরো একজন ওয়েসলি অট্রে, যিনি ছিলেন নিউ ইয়র্ক সিটির সাবওয়ে স্টেশনের নির্মানকর্মী। ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে, তিনি তার দুই কন্যার সঙ্গে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সেই সময়ে, ক্যামেরন হলোপিটার নামের ২০ বছর বয়সী একজন ছাত্র মৃগীরোগের কারণে ট্র্যাকের ওপর পড়ে যান। অট্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্র্যাকের ওপর ঝাঁপ দেন এবং হলোপিটারকে একটি খাদের মধ্যে ঠেলে দেন। ট্রেনটি তাদের উপর দিয়ে চলে যায়, কিন্তু তারা দুজনেই অক্ষত থাকেন। এই কাজের জন‍্য আজও তিনি প্রশংসীত।

কাজুকি তাকাহাশি এবং ওয়েসলি অট্রে থেকেও আমরা শিখি, কখনো কখনো নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে হলেও অন্যদের রক্ষা করা সত্যিকারের বীরত্ব। এবং সংকটের মুহূর্তে দ্রুত এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

জুলাই আন্দোলনে যেসব লেখকরা ছাত্র জনতাকে নির্মমভাবে হত‍্যা করতে দেখেও চুপ ছিলেন, তাদের কেউ কেউ যুক্তি দিয়েছেন, প্রতিবাদ করা বা না করা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অংশ। তারা বলছেন, নীরবতা তাদের ব্যক্তিগত পছন্দ, এবং তারা মনে করেন যে প্রতিটি লেখকের দায়িত্ব সমান নয়। কেউ কেউ মনে করেন, রাজনৈতিক ইস্যুতে প্রকাশ্যে মত দেওয়া তাদের কাজ নয়, বরং তারা সাহিত্য, সংস্কৃতি, বা অন্য কোনো বিষয়ে মনোযোগী থাকতে চান। তারা যুক্তি দেন, তাদের লেখার মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব, কিন্তু সরাসরি কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়ানো তাদের দায়িত্ব নয়।

কিন্তু প্রশ্ন হল, নীরবতা কি সত্যিই নিরপেক্ষ অবস্থান? যখন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চলতে থাকে, যখন নিরপরাধ ছাত্রদের হত্যা করা হয়, যখন একটি প্রজন্মকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়—তখন কি একজন লেখক শুধু নিরপেক্ষ দর্শক হয়ে থাকতে পারেন? ইতিহাস দেখিয়েছে, নীরবতা অনেক সময় নিপীড়কের পক্ষ নেওয়ার সমান। যখন আমরা কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলি না, তখন তা অন্যায়কে পরোক্ষভাবে সমর্থন করার শামিল হয়ে যায়। এ কারণেই আমরা দেখি, ফিওদর দস্তয়েভস্কি, আন্তোনিও গ্রামশি, আলেক্সান্ডার সলঝেনিৎসিন, বা ভাকলাভ হ্যাভেলের মতো লেখকরা তাঁদের লেখনীর মাধ্যমে সত্য প্রকাশ করেছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, এবং অনেক ক্ষেত্রে তার জন্য চরম মূল্যও দিতে হয়েছে।

তাছাড়া, প্রতিবাদ করা মানে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর অনুসারী হওয়া—এই ধারণাটাও সম্পূর্ণ ভুল। ন্যায়বিচার, অধিকার, ও সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের নির্দিষ্ট কোনো পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত প্রতিবাদ আসে বিবেকের তাড়না থেকে, যা অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে মানুষের ন্যায়সঙ্গত অবস্থানকে প্রতিফলিত করে।

একটি সুস্থ সমাজের জন্য লেখক, শিল্পী, ও বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা শুধুমাত্র বিনোদন বা নান্দনিক সৃষ্টির জন্য কলম ধরেন না, বরং সমাজকে দিকনির্দেশনা দেওয়ার কাজটিও করেন। বিশেষ করে, যখন মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়, গণহত্যা ঘটে, দমন-পীড়নের কালো ছায়া সমাজের উপর নেমে আসে—তখন তাঁদের কণ্ঠস্বর আরও বেশি প্রয়োজন হয়।

এজন্যই ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন শুধু একটি ছাত্র আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল একটি জাতীয় গণজাগরণ, যেখানে জনগণের অধিকারের প্রশ্ন জড়িত ছিল। এই সময়ে যারা নীরব ছিলেন, তারা কেবল নিজেরাই ইতিহাসের সামনে প্রশ্নবিদ্ধ হননি, বরং তারা ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছেও ব্যাখ্যার ঋণী হয়ে থাকবেন—কেন তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেননি? কেন তারা কলম তুললেন না?

যারা যুক্তি দেন, প্রতিবাদ করা বা না করা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অংশ, তাদের মনে রাখা উচিত—এই যুক্তি সেই সীমা পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য, যেখানে তা অন্যের জীবন ও অধিকার হরণ করার সাথে জড়িয়ে যায় না। ন্যায়বিচারের জন্য দাঁড়ানো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া—এটি শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়, এটি নৈতিক ও মানবিক দায়িত্বও বটে। তাই ভবিষ্যতে, যখন কোনো জাতীয় সংকট আসবে, যখন কোনো স্বৈরাচারী শক্তি জনগণের অধিকার দমনে সচেষ্ট হবে, তখন সত্যিকারের লেখকরা কোন পক্ষ নেবেন? তারা কি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন, নাকি নীরব থেকে অপরাধের অংশীদার হয়ে যাবেন? ইতিহাস সেই জবাব জানতে চাইবে।
 

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন