https://www.prothomalony.com/

10757

north-america

উত্তর আমেরিকা

ফোবানার ভবিষ্যৎ: ঐক্যের পথে নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৪ ০৩:৩৫

উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে বৃহত্তম বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন 'ফেডারেশন অফ বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশন ইন নর্থ আমেরিকা' (ফোবানা)। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় অবস্থিত বিভিন্ন বাংলাদেশি সংগঠন ফোবানার সাথে যুক্ত আছে। ফোবানার প্রধান লক্ষ্য হলো উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংস্কৃতি, কৃষ্টি, এবং ভাষার চর্চা উজ্জীবিত করা, ঐক্য স্থাপন করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও ইতিহাস পৌঁছে দেওয়া। সম্প্রতি, ফোবানার প্রাক্তন চেয়ারপারসন ও আউটস্ট্যান্ডিং মেম্বার বেদারুল ইসলাম বাবলার সাথে সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে আমরা সংগঠনটির বর্তমান কার্যক্রম, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, এবং নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনেছি। এই সাক্ষাৎকারে তিনি ফোবানার মূল লক্ষ্য, কার্যক্রমের অগ্রগতি, এবং সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন।ফোবানার প্রতিষ্ঠা ১৯৮৭ সালে। ড. নুরুননবী, ইকবাল বাহার চৌধুরী, ওয়াহেদ হোসেন সহ কমিউনিটির আরো কিছু বিশেষ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে শুরু হয়েছিল ফোবানা, ওয়াশিংটন ডিসিতে। ফোবানার লক্ষ্য ছিল- শিল্পসাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা বৃদ্ধি করা, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলামের চিন্তা চেতনা সহ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়া। ফোবানা শুরু হয় সেই থেকেই, আজ ফোবানা তার ৩৮তম ফোবানায় পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ফোবানার কার্যক্রমগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ কোনগুলো সম্পর্কে বেদারুল ইসলাম বাবলা বলেন, 'একসময় মিলনমেলা হতো, সাহিত্য চর্চাটাই অগ্রাধিকার ছিল। তবে দীর্ঘ সময় ধরে আমরা বিশ্বজুড়ে বিজনেস নেটওয়ার্কিং করছি। ওম্যান এমপাওয়ারমেন্ট লেমিনার, ডমেস্টিক ভায়োলেন্স সেমিনার করছি। মেইনস্ট্রিম পলিটিক্সে আমাদের প্রজন্ম কীভাবে সংযুক্ত হতে পারে তা নিয়ে সেমিনার হয়।

বিভিন্ন স্টেট থেকে কাউন্সিলম্যান, এডমিনিস্ট্রেটিভ পারস্যোনাল, সিটি মেযর, গভর্নমেন্ট, স্টেট গভর্নমেন্ট, কনগ্রেসম্যান প্রমুখরা আসেন। তারা তথ্য প্রদান সহ কমিউনিটিকে উৎসাহিত করতে মোটিভেশনাল স্পিচ দেন। নেটওয়ার্কিং এর মাধ্যমে আমরা একটা ব্রিজ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি যেখানে পলিটিশিয়্যান, পলিসিমেকারদের কাছে আমরা  কমিউনিটির মানুষদের নিয়ে বিভিন্ন দাবী উপস্থাপন করি। ২০০০ সালে দুইবাংলার শিল্পী বুদ্ধিজীবিরাও আসেন সেমিনারে।"এছাড়াও তিনি জানান, মেধার উপর ভিত্তি করে বছরে তিনটা স্কলারশিপ দেয়া হয় ফোবানা থেকে। দেশে দুটো আমেরিকাতে একটি-সেটা শিক্ষা, মিউজিক, স্পোর্টস কিংবা কর্মদক্ষতার উপর নির্ভর করে দেয়া হয়। মানবিক কাজগুলোতে এগিয়ে যায় ফোবানা। এবারের বন্যাকবলিত পরিস্থিতিতে বন্যার্তদের জন্য ৫০০০ ডলার পাঠানো হয়েছে ফোবানা থেকে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের টিকিট বিক্রির টাকায় দেশে দুস্থদের বড় পরিমাণে সাহায্য করে থাকে ফোবানা। যেমন-রমজানে সময় রংপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে রমজানের খাদ্য সামগ্রী, ঈদের খাদ্য সামগ্রী 'বাংলাদেশ স্কাউটস্' এর মাধমে দিয়ে থাকে ফোবানা। যারা কোরবানি দিতে পারেনা কিংবা নিম্মবিত্ত পর্যায়ের, তাদের জন্য ঈদে কোরবানির ব্যবস্থা করা হয়। সিলেট অঞ্চলের একটি এনজিওয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় মানুষদের ক্যাটারাক অপারেশনে সাহায্য করা সহ চশমার ব্যবস্থা করা হয় এবং জীবিকা উপার্জনে চিটাগং-এ দুস্থ মহিলাদের জন্য সেলাই মেশিনও সর্বরাহ করা হয়। ফোবানার সাম্প্রতিক কার্যক্রমের মধ্যে বন্যার্তদের সাহায্য করতে পারা-সফল একটি কার্যক্রম বলে মনে করেন বেদারুল ইসলাম বাবলা। ফোবানার মূল লক্ষ্য এবং প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের সাথে বর্তমান কার্যক্রমের মধ্যে পরিবর্তন সম্পর্কে তিনি বলেন, "আমাদের ২০টা স্ট্যান্ডিং  কমিটি আছে, একেকটা কমিটি একেকটা ফিল্ডে কো-অরর্ডিনেট করছে। বিশেষ করে আমরা মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা ডেপলপ করছি যেন আমাদের কমিউনিটি এ সম্পর্কে আরো সচেতন হয়। মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এটি আমাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব এবং এর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি না করলে মানুষ অনেক সময় তাদের সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব দেয় না বা বুঝতে পারে না, যার ফলে তারা যথাসময়ে সহায়তা নিতে ব্যর্থ হয়। আমাদের বাচ্চাদেরকে লালন পালনেও এটির দরকার আছে। এই যে বাচ্চাদের মধ্যে হতাশা উদ্বেগ বাড়ছে, আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে, কেন বাড়ছে, সমস্যাটা আসলে কোথায়, সেগুলি বুঝতে হবে। তাদেরকে কথা বলতে দিতে হবে, তাদের কথা শুনতে হবে।"এছাড়াও তিনি জানান, তিনদিন ব্যাপি ফোবানা সম্মেলন হতে যাচ্ছে মিশিগানে। আগস্ট ৩০ তারিখে অপেনিং হবে আগস্ট ৩১-সেম্টেম্বর ১ তারিখ পর্যন্ত চলবে। সেমিনার, বিভিন্ন ওয়ার্শপ, যেমন-প্রবাসে সাহিত্য চর্চার সীমাবদ্ধতা-বিশ্বায়নে নজরুল, এমন আরো অনেক বিষয়ের উপর আলোকপাত করা হবে। ফোবানার মথ্যে পৃথক সংগঠন বা বিভক্তির পেছনের কারণ সম্পর্কে বেদারুল ইসলাম বাবলা বলেন, "আমি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সমতাকে বিশ্বাস করি। ঐক্যবদ্ধ অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করি। মানবতা ও পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধে বিশ্বাস রাখি। এই বিভক্তির পেছনে নেতৃত্বে ইগো সমস্যা, আদর্শগত সমস্যা ছিল।" পৃথক সংগঠনগুলোর সাথে ফোবানার সম্পর্ক সম্পর্কে তিনি বলেন, "ব্যক্তিগতভাবে বলব দ্বিমত হয়েছিল, নেতৃত্বে অসততা ছিল। অসততা আমার আদর্শ হতে পারে না।" তিনি বলেন, "ফোবানার মূল উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্যের সঙ্গে তারা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।"বেদারুল ইসলাম বাবলা আরো বলেন, "কখনো কখনো প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হয়-আপনি কোন ফোবানার লোক? আপনাদের মধ্যে বিভাজন কেন? এগুলি বিভ্রতকর অবস্থা তৈরি করে। একটা ফোবানা হলে এমন বিভ্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হত না। নেতৃত্ব ধরে রাখার প্রবণতা থেকেই এই বিভাজন। আমার বিনিত অনুরোধ, আসুন আমরা ফোবানাকে একটা প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসি এবং সম্মিলিতভাবে দেশ ও দশের উন্নয়নে কাজ করি।" পৃথক সংগঠনগুলোর সঙ্গে পুনর্মিলনের কোনো প্রচেষ্টা বা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কিনা-এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "চেষ্টা করেছি, হয়নি। তবে আমি আশাবাদী। এবারের সম্মেলনে ইগোতে জলাঞ্জলি দিয়ে, ছাড় দিয়ে আমরা আবারো আহ্বান জানাবো, ডায়লগ অপেন করবো একত্রিত হওয়ার। বিভাজন অনেক তো হলো, আর কত!" নতুন প্রজন্মের কাছে ফোবানা-এর মূল্যবোধ এবং সংস্কৃতি পৌঁছে দিতে এখানে একটি ইয়ুথ ফোরাম আছে বলে জানান তিনি। এই ইয়ুথ ফোরাম দেশের প্রজন্মের মধ্যেও প্রভাব ফেলছে। দেশের যুবক তরুণরা নিজেদের ভেতরে এই ইয়ুথের শক্তিকে ধারণ করে, বিভিন্ন কাজে কানেক্ট হচ্ছে। দেশে শিল্পসংস্কৃতি চর্চা করা সহ মানবিক কাজগুলোতেও তারা অংশ নিচ্ছে, সহায়তা করেছে। ইয়ুথ ফোরামের দ্বারা উৎসাহিত হয়ে দেশের তরুণরা ক্যারিয়ার গঠনেও সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। ফোবানা ভবিষ্যতে বিভাজন দুর করার জন্য নতুন উদ্দ্যোগ নিবে বলে জানান বেদারুল ইসলাম বাবলা। তিনি বলেন, ঐক্যের কেনো বিকল্প নেই। এর পাশাপাশি পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ কিভাবে ফিরিয়ে আনা যায় এবং সম্মিলিত ভাবে ফোবানাকে নিয়ে কাজ করা যায়, তার প্রচেষ্টা থাকবে। আমাদের এই প্রচেষ্টা যদি সফল হয় তবে ফোবানা তার কার্যক্রম নিয়ে আরো বেশি কিছু করতে পারবে। তিনি আরো বলেন, ফোবানার আন্ডারে বিভিন্ন ‌অঙ্গরাজ্যে ৫৫টা সংগঠন আছে। তারা তাদের শহরে নিজস্ব প্ল্যাটফর্মে  কাজ করছে। যেমন-কবরের ব্যবস্থা করা, কেউ যদি দেশে লাশ পাঠাতে না পারে তবে তাদের সাহায্য করা, চাকরির সমস্যা, ইমিগ্রেশন সমস্যা-এমন সব কাজগুলো তারা করে থাকে। প্রতিটা অঙ্গরাজ্যের এই কাজগুলো যখন সফল হয় তখন সেটাই ফোবানার সার্থকতা। ফোবানা উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য শুধু একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সংস্কৃতি, কৃষ্টি, এবং ভাষাকে প্রবাসে ছড়িয়ে দেওয়ার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। প্রাক্তন চেয়ারপারসন বেদারুল ইসলাম বাবলার সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে ফোবানার বর্তমান কার্যক্রম, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, এবং বিভাজন সত্ত্বেও ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রচেষ্টা সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টি পাওয়া গেছে। ফোবানা তার প্রতিষ্ঠাকাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যে ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, এবং মানবিক কাজের মাইলফলক তৈরি করেছে, তা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। তবে বিভাজন এবং নেতৃত্বের সংকট ফোবানার অগ্রযাত্রাকে কিছুটা ধীর করেছে। তবুও, বেদারুল ইসলাম বাবলার মত ব্যক্তিদের প্রচেষ্টা এবং ফোবানার সদস্যদের মধ্যে ঐক্য ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার ফোবানাকে আবারও একত্রিত এবং শক্তিশালী করে তুলতে পারে। ফোবানার সামনের দিনগুলোতে এ ধরনের উদ্যোগের সফলতা নিশ্চিত হলে, প্রবাসে থাকা বাংলাদেশিদের মধ্যে জাতীয় চেতনা এবং সামাজিক ঐক্য আরও মজবুত হবে। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধ পৌঁছে দেওয়ার জন্য ফোবানা যে ভূমিকা পালন করছে, তা আরও বিস্তৃত হোক, বাংলাদেশের মর্যাদা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও উচ্চস্থানে পৌঁছাক-এই প্রত্যাশা। 

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন