https://www.prothomalony.com/

10308

opinion

অভিমত

মোহাম্মদ ফজলুর রহমান আরজু: এক কিংবদন্তি ফুটবলার

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৪ ১০:৪৭

বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তি ফুটবল খেলোয়াড় রয়েছেন, যাদের মধ্যে মোহাম্মদ ফজলুর রহমান আরজু বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ছিলেন পাকিস্তান জাতীয় দলের পক্ষে পূর্ব পাকিস্তান থেকে একজন দুঃসাহসী বাঙালী ফুটবল খেলোয়াড় (মিডফিল্ডার)। তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় একটি গল্প যা আমাদের দেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য গর্বের বিষয়। চলুন, তার জীবনের নানা দিক নিয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করি।

মোহাম্মদ ফজলুর রহমান আরজু ১৯২৮ সালের ৩১ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার থানার দুফতারা গ্রামে। ছোটবেলা থেকেই তার ফুটবলের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ ছিল। উচ্চতা ৫ ফুট ২ ইঞ্চি এবং ওজন ১৩২ পাউন্ড হলেও, তার দক্ষতা এবং মনোবল ছিল অসামান্য। 

তাঁর শিক্ষা জীবনের শুরুতে স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয়ের ফুটবল দলের অধিনায়ক ছিলেন। ১৯৪৭-১৯৪৮ সালে তিনি মুন্সিগঞ্জের হারগঙ্গা কলেজে পড়াশোনা করেন এবং বিভিন্ন স্থানীয় নকআউট ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশ নেন। তার খেলায় দক্ষতা এবং কৌশল তাকে শীঘ্রই একটি পরিচিত নাম করে তোলে।

১৯৪৯-১৯৫৩ সালে তিনি ঢাকা সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ফুটবল দলের প্রতিনিধিত্ব করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল দলের হয়ে পাকিস্তান স্বাধীনতা দিবস ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশ নেন এবং চ্যাম্পিয়নশিপের সম্মান পান।

১৯৫১-১৯৫২ সালে তিনি ঢাকা ওয়ারী ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগ টুর্নামেন্টে অংশ নেন। এরপর তিনি চট্টগ্রাম মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব এবং চট্টগ্রাম জেলা ফুটবল দলের হয়ে বিভিন্ন টুর্নামেন্টে অংশ নেন এবং চ্যাম্পিয়নশিপের সম্মান অর্জন করেন।

১৯৫৩-১৯৫৪ সালে তিনি ঢাকা ওয়ান্ডার্স ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগ টুর্নামেন্টে টানা তিন বছর চ্যাম্পিয়নশিপের সম্মান পান। ১৯৫৬-১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং ১৯৫৬ সালে রানার্স আপ এবং ১৯৫৭-১৯৫৮ সালে চ্যাম্পিয়নশিপের সম্মান অর্জন করেন।

আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারও সমৃদ্ধ। তিনি ১৯৫২ এবং ১৯৫৫ সালে আই.এফ.এ ফুটবল শিল্ড টুর্নামেন্টে কলকাতায় অংশ নেন। ১৯৫৫ সালে তিনি পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের হয়ে ৮ম এশিয়ান কোয়াড্রাঙ্গুলার ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশ নেন এবং রানার্স আপের সম্মান অর্জন করেন।

১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকা আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে আগাখান গোল্ড কাপ আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশ নেন। এছাড়া তিনি ঢাকা এক্স১ ফুটবল দলের হয়ে কলকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, ইস্ট বেঙ্গল ক্লাব এবং আই.এফ.এ এক্স১ দলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে খেলেছেন।

মোহাম্মদ ফজলুর রহমান আরজু শুধু একজন খেলোয়াড়ই ছিলেন না, তিনি একজন সফল কোচ এবং ক্রীড়া সংগঠকও ছিলেন। তিনি বি.কে.এস.পি, ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ, চট্টগ্রাম নেভাল বেস, এবং চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট ফুটবল দলের স্বেচ্ছাসেবী ফুটবল কোচ হিসেবে কাজ করেছেন।

তিনি বাংলাদেশের ফুটবল ফেডারেশনের নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া পরিষদের নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি চট্টগ্রাম কাস্টমস স্পোর্টস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এবং কোচ হিসেবে কাজ করেছেন।

ফজলুল রহমান আরজু দেশের ফুটবলের উন্নয়ন নিয়ে বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় নিবন্ধ লিখেছেন। তিনি প্রথম ব্যক্তি যিনি একটি ক্রীড়া ক্যাডেট কলেজের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন এবং তার এই ধারণা ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত হয়। তার এই স্বপ্ন আজ বি.কে.এস.পি (বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) হিসেবে বাস্তবায়িত হয়েছে।

তাঁর অসামান্য কৃতিত্বের জন্য তিনি ১৯৭৯ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পান। এছাড়া তিনি নারায়ণগঞ্জ ক্রীড়া সমিতি থেকে একটি রূপার শিল্ড এবং চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া পরিষদ থেকে সম্মাননা ও ব্লেজার পান।

তিনি  শুধুমাত্র একজন খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে নয়, ব্যক্তিজীবনে একজন মানবিক মানুষ হিসেবেও ছিলেন অত্যন্ত শ্রদ্ধেয়। তিনি অনেক মানুষকে মানবিক কারণে চাকরির সুযোগ করে দিয়েছেন। তার অসাধারণ ব্যক্তিত্ব এবং সহানুভূতিশীল মনোভাব তাকে আরও শ্রদ্ধেয় করে তুলেছে।

আমরা আমাদের গুণী জনকে সম্মান দিতে চাই না, উনার ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটেছে। এত বড় ফুটবলার, কোচ এবং মানবিক ব্যক্তি হিসেবে উনার মূল্যায়ন সরকারিভাবে করা উচিত ছিল। এবং উনাকে মরনোত্তর সম্মাননা দেয়া উচিত, যাতে তার অবদানকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা যায়। আমরা যদি গুণী মানুষকে সম্মান না দেখাই, তাহলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের থেকে কি শিখবে? তাদের জন্য আমরা কেমন উদাহরণ স্থাপন করছি?

মোহাম্মদ ফজলুর রহমান আরজু একজন কিংবদন্তি ফুটবল খেলোয়াড়, কোচ, এবং ক্রীড়া সংগঠক ছিলেন। তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় একটি শিক্ষণীয় গল্প বলে, যা আমাদের দেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য গর্বের বিষয়। তার জীবন এবং ক্রীড়াজীবনের কাহিনী আমাদের সকলের জন্য প্রেরণা হিসেবে কাজ করে এবং তার উত্তরাধিকার আজও ফুটবলের জগতে বিদ্যমান। তার অবদান বাংলাদেশের ক্রীড়া সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে এবং তার স্মৃতি চিরকাল আমাদের মনে থাকবে। আমরা যদি গুণীজনকে সঠিকভাবে সম্মান দেখাই, তাহলে তা আমাদের সমাজের জন্য একটি উদাহরণ হিসেবে থাকবে এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন