https://www.prothomalony.com/
10284
north-america
বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাস, ঋণমান অবনতী, চীনা ঋণ ও প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর
প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৪ ১২:৪৫
বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, কর ব্যবস্থায় ভোগান্তি আর নীতির ধারাবাহিকতা না থাকায় এক বছরের ব্যবধানে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ কমছে ১৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ। পরিকল্পনা করে বিদেশি বিনিয়োগের পরিস্থিতি উন্নয়ন না করলে আগামীতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। দেশের ব্যবসার পরিবেশ কেমন, সেটা মূল্যায়ন করে এমন মতামত দিয়েছে উদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদরা। দেশে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের চলমান ব্যবসার মুনাফা পুনরায় বিনিয়োগ অথবা নতুন করে বিনিয়োগ করাকে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের হিসাবে নেওয়া হয়। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা আঙ্কার্ডের হিসাবে ২০২৩ সালে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। গত বছর বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৩০০ কোটি ৪০ লাখ ডলার। যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ১৪ শতাংশ কম। ২০২২ সালে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৩৪৮ কোটি ডলার। হিসাব বলছে, ২০১৮ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ১ হাজার ৭০২ কোটি ডলার। দেশে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে ২০৪১ সাল নাগাদ ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ৯৭টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ৬৮টি অর্থনৈতিক অঞ্চল সরকারি এবং বাকি ১৯টি অর্থনৈতিক অঞ্চল বেসরকারি উদ্যোগ গড়ে তোলা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সরকারি বেসরকারি ৩৯টি অঞ্চলের ভূমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে। চট্টগ্রামের মীরেরসরাই, ফেনীসহ মোট ১১টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বিনিয়োগের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। এসব অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য নানারকম সুবিধা দিয়ে আসছে সরকার।
ব্যাবসায়িক বিনিয়োগে বাধা, দেশের ঋণমানের অবনতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সুদহার বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে বিদেশি ঋণে। পর্যায়ক্রমে ১১.০৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে বেসরকারি খাতের স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ। কিন্তু দেড় বছর আগেও এই ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় সাড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার।
দেশের ঋণমান অবনতির প্রভাব পড়েছে বিদেশি ঋণে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের ঋণমান কমিয়ে দেওয়ার কারণে বিদেশি উৎস থেকে আগের তুলনায় কম ঋণ পাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সুদহার বাড়ানোর প্রভাবও আছে বিদেশি ঋণের ওপর। ২৭ মে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ঋণমান দ্বিতীয়বারের মতো কমিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বৈশ্বিক ঋণমাণ নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান ফিচ রেটিংস ইনকরপোরেশন। বাংলাদেশের ফরেন কারেন্সি ইস্যুয়ার ডিফল্ট রেটিং (আইডিআর) ‘বিবি মাইনাস’ থেকে ‘বি প্লাস’ করেছে সংস্থাটি। আট মাস আগেও বাংলাদেশের ঋণমান কমিয়েছিল তারা।
এর আগে ২০২৩ সালের মার্চে আরেক আন্তর্জাতিক ঋণমান যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান মুডিস ইনভেস্টর সার্ভিস দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের ঋণমান কমিয়ে দেয়। প্রতিষ্ঠানটির মতে, বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে এখন উঁচু মাত্রার দুর্বলতা ও তারল্যের ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে চলমান সংকটের মধ্যে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাও প্রকাশ পেয়েছে। এ কারণে মুডিস বাংলাদেশের ঋণমান এক ধাপ কমিয়ে বিএ৩ থেকে বি১-এ নামিয়ে দেয়।
দেশে ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় এবং ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিশাল প্রভাব পড়েছে নতুন বিনিয়োগে। ব্যবসায়ীরা এখন নতুন বিনিয়োগে ভয় পাচ্ছেন। পাশাপাশি রেটিং এজেন্সির নেতিবাচক রেটিংয়ের কারণে ঋণদাতাদের আস্থা কমেছে।
ব্যবসায়ীদের এখন আর ঋণের প্রয়োজন হচ্ছে না। কারণ নীতি সহায়তার অভাবে তাঁরা নতুন বিনিয়োগ করছেন না এবং ব্যবসাও বাড়াচ্ছেন না। ক্রমেই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য একটি অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নেতিবাচক মার্কিং। পদে পদে দুর্নীতি, পদে পদে ঘুষ, পাশাপাশি ব্যবসা করতে গেলে এখন নানা সংকট। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড রীতিমতো হয়রানি করছে ব্যবসায়ীদের, যার ফলে দেশে ব্যবসার পরিবেশ নেই। এসব কারণে বিদেশি সংস্থাগুলো ঋণমাণ কমাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের মে মাস শেষে বেসরকারি খাতের স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ ১১.০৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, ডিসেম্বর শেষে যা ছিল ১১.৭৯ বিলিয়ন ডলার। ২০২২ সাল শেষে বেসরকারি খাতের স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ১৬.৪১ বিলিয়ন। অর্থাৎ দেড় বছরের ব্যবধানে ৫.৩৭ বিলিয়ন ডলার স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের মার্চ পর্যন্ত দেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতে মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৯.৩০ বিলিয়ন ডলার। এর আগে, গত বছরের ডিসেম্বরে প্রথমবারের মতো বৈদেশিক ঋণ ১০০.৬৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ প্রকাশিত ‘মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি’র বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হবে ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। গেল অর্থবছরের চেয়ে তা চার হাজার ৭০০ কোটি টাকা বেশি। গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট অনুসারে, বিদেশি ঋণের সুদ বাবদ সরকারের মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ১৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ বাবদ ৯ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়। অর্থাৎ চার বছরের মধ্যে বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে।
চীন বাংলাদেশের জন্য একক বৃহত্তম ঋণদাতা দেশ। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ প্রতি বছর গড়ে ২৩০ কোটি ডলার ঋণ কিংবা সহায়তা নিয়েছে চীনের কাছ থেকে। একটি হিসাবে দেখা যাচ্ছে, গত চার বছরে বাংলাদেশে তিন বিলিয়ন ডলার সহায়তা এসেছে চীন থেকে। এদিকে, চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে চার দিনের সফরে বেইজিং গেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছেন, বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে প্রায় পাঁচশ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার বিষয়ে বেইজিংয়ের দিক থেকে ঘোষণা আসতে পারে এবং এই ঋণ চীনা মুদ্রায় দেওয়ার ওপরই জোর দেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে।
প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন জেগেছে বাংলাদেশ ঋণের জন্য বারবার চীনের দ্বারস্থ হয় কেন? চীন কি ঋণের একমাত্র ভরসা নাকি বারবার চীনা ঋণের ফাঁদে পড়ছে বাংলাদেশ? এর উত্তরও পাওয়া গেছে নানা সমীকরণ মিলিয়ে।
সাধারণত বড় বড় প্রকল্প কিংবা অর্থনৈতিক সংকটের সময় চীনের কাছ থেকেই গত দেড় দশক ধরে সহায়তা পেয়ে আসছে বাংলাদেশ এবং অধিকাংশ বড় প্রকল্পের অর্থ যোগানের ক্ষেত্রে এখন চীনকেই বিবেচনা করা হয়। চীনের অর্থায়নে চট্টগ্রাম টানেল নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্পন্ন করেছে চীনা কোম্পানি। প্রায় শেষ হয়েছে পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্প।
ওয়াশিংটন-ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইন্সটিটিউট' বা এইআই গত বছর যে ধারণা দিয়েছিল তাতে বাংলাদেশে মোট চীনা বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল সাত বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এছাড়া চীনের কয়েকটি কোম্পানি বিভিন্ন খাতে প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলারের নির্মাণ কার্যাদেশ পেয়ে কাজ সম্পন্ন করেছে কিংবা এখনও করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত রাজনৈতিক যোগাযোগ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার কারণেই বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোতে চীনা সহায়তা চেয়ে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান এইড ডাটার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান বাংলাদেশকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়েছিল। কিন্তু ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। এখন চীনই বাংলাদেশের জন্য একক বৃহত্তম ঋণদাতা দেশ।
গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ প্রতি বছর গড়ে ২৩০ কোটি ডলার ঋণ কিংবা সহায়তা নিয়েছে চীনের কাছ থেকে। একটি হিসাবে দেখা যাচ্ছে, গত চার বছরে বাংলাদেশে তিন বিলিয়ন ডলার সহায়তা এসেছে চীন থেকে।
প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরেও একটি মেট্রোরেল রুট-সহ আরও কয়েকটি রেলওয়ে প্রকল্প এবং কয়েকটি সেতু নির্মাণ বা সংস্কারের বিষয়ে সমঝোতা হবে বলে বাংলাদেশ আশা করছে। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, চীন চাইলে আলোচনা হবে বহুল আলোচিত তিস্তা প্রকল্প নিয়েও।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন