https://www.prothomalony.com/

10141

north-america

উত্তর আমেরিকা

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৪ ১৪:৫৯

দুর্যোগব্যবস্থাপনা : আমাদের সক্ষমতা কতটুকু! 


ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। প্রতি বছর কোনো না কোনো দুর্যোগে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকে। বিশ্বব্যাপী দুর্যোগের ব্যাপকতা প্রমাণ করে দুর্যোগের পূর্ব সতর্কীকরণ ও ঝুঁকিহ্রাসই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রধান কৌশল হওয়া উচিত। এই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারের নীতি-পরিকল্পনায় জনগণের জন্য দুর্যোগপূর্ব পূর্বাভাস ও দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাস কৌশল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাসে আগাম সতর্কবার্তা উপকূলীয় সম্ভাব্য উপদ্রুত এলাকার জনগণের মাঝে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ‘ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি)’ প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে উপকূলে ৭৬,১৪০ জন প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক রয়েছে। বন্যাপ্রবণ এলাকায় অনুরূপ স্বেচ্ছাসেবক তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের দুর্যোগ মোকাবিলার ইতিহাসে ২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে করোনা মহামারি ছাড়াও দুটি ভয়াবহ বন্যা ও বেশ কয়েকটি ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগ মোকাবিলা করেছে বাংলাদেশ। সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড়  রেমালের মোকাবিলায় পূর্বাভাস সঠিক সময়ে দেওয়ায় প্রানহানী কমিয়ে আনা সম্ভব হয়। 

এর মধ্যে ২০২০ সালে করোনা মহামারির মধ্যেই ঘূর্ণিঝড় আম্পান বাংলাদেশে আঘাত হানে। আবহাওয়া অধিদপ্তর ঝড় আসার পাঁচ দিন আগে থেকে সতর্কসংকেত দিতে থাকে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ও স্থানীয় সরকার বিভাগ উপকূলের মানুষকে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসে। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা পায়। 

বিশ্বের ৫২ শতাংশ মানুষ দুর্যোগের আগাম সতর্কসংকেত পান। দুর্যোগ আসার আগাম খবর না পাওয়ার কারণে আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়। অনেক দেশে সতর্কসংকেত জানার পরও তা প্রচারের ব্যবস্থাপনা নেই, উদ্ধার তৎপরতা চালানোর জন্য দক্ষ ও প্রয়োজনীয় জনবল নেই। যে কারণে দুর্যোগে এসব দেশের ক্ষয়ক্ষতি কমেনি। এখানেই সাফল্য দেখাতে পেরেছে বাংলাদেশ। 

বাংলাদেশ বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সফলতা দেখাচ্ছে। কিন্তু অতি উষ্ণতা এবং ভূমিকম্পের বিষয়েও প্রস্তুতি নিতে হবে। বিশেষ করে ভূমিকম্পের মতো বিপজ্জনক দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের পূর্বাভাসব্যবস্থা কাজ করে না। তাই প্রস্তুতি হিসেবে ভবন ও অবকাঠামোগুলোকে ভূমিকম্প–সহনশীল করা এবং উদ্ধার তৎপরতায় সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

আমাদের দেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর দুর্যোগ সংক্রান্ত কার্যক্রমের সমন্বয় সাধন, তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা, গবেষণা কর্ম পরিচালনা, গণসচেতনতা বৃদ্ধি, স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে দুর্যোগ পূর্ব প্রস্তুতি এবং মোকাবিলায় কাজ করে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে যেকোনো প্রলয়ংকরী দুর্যোগ মোকাবিলায় একটি জরুরি সাড়া প্রদান পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম সুচারুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে নীতিনির্ধারণ ও সমন্বয়ের লক্ষ্যে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিল, আন্তঃমন্ত্রণালয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সমন্বয় কমিটি এবং জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা কমিটি রয়েছে। স্থানীয়ভাবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটি রয়েছে। এসব কমিটির মধ্যে রয়েছে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি প্রভৃতি। এসব কমিটি দুর্যোগ-পূর্ববর্তী এবং দুর্যোগ-পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। সরকার দুর্যোগ মোকাবিলায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের প্রশিক্ষণ প্রদান করে থাকে। যেমন :পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন এনজিওর সহযোগিতায় জেলায় জেলায় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের ওপর প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। এছাড়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করে থাকে। দুর্যোগ-পূর্ববর্তী সতর্কীকরণের জন্য মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দুর্যোগ বার্তা প্রচার, এসএমএস, ইন্টারঅ্যাকটিভ ভয়েস রেসপন্স, কমিউনিটি রেডিও, উপকূলীয় অঞ্চলে পকেট রেডিও প্রভৃতি কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। 

আমাদের দেশে প্রতি বছর বজ্রপাতে অনেক মানুষ মারা যায়। অথচ একটু সতর্ক হলেই এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। এ জন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে। এপ্রিল-জুন মাসে বজ্রবৃষ্টি বেশি হয়; বজ্রপাতের সময়সীমা সাধারণত ৩০-৪৫ মিনিট স্থায়ী হয়। এ সময়টুকু ঘরে অবস্থান করতে হবে। ঘন কালো মেঘ দেখা দিলে ঘরের বাইরে বের হওয়া যাবে না। অতি জরুরি প্রয়োজনে রাবারের জুতা পরে বাইরে যাওয়া যেতে পারে, তবে না যাওয়াই উত্তম। বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গা, খোলা মাঠ অথবা উঁচু স্থানে থাকা যাবে না।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানেই মানবিক বিপর্যয়। দুর্যোগকালে নারী-শিশু-প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ ব্যক্তিই বেশি সংকটে পড়েন। এ অবস্থায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য আগাম সতর্কতার ব্যবস্থা আরও উন্নত করাসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও মানুষের সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। 

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী দুর্যোগের মাত্রা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।৷ বন্যা, খরা, নদীভাঙন, ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোনসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে আবিষ্ট বাংলাদেশ। পাশাপাশি রয়েছে অগ্নিকাণ্ড, ভবনধসসহ মানবসৃষ্ট দুর্যোগ। এসব দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারি পদক্ষেপের সঙ্গে প্রয়োজন স্থানীয় নেতৃত্বের সমন্বয়।
প্রয়োজন স্বেচ্ছাসেবকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। প্রতি বছর ৫ ডিসেম্বর বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবক দিবস পালিত হয়। 

স্বেচ্ছাসেবা কথাটির সঙ্গে মানুষের, সমাজের এবং দেশের এক গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আর সেই স্বেচ্ছাসেবাকেই তরুণ প্রজন্ম উদ্দীপনার সঙ্গে গ্রহণ করেছে। তারা তাদের স্বেচ্ছাসেবার ব্রত নিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের দোরগোড়ায়৷ আগে দেশী-বিদেশী অল্প কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের হয়ে সীমিতসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবকের দেখা মিললেও বর্তমানে দেশের তরুণরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের পাশাপাশি নিজ উদ্যোগে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তৈরি করছেন। এর মাধ্যমে তারা সমাজের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে একসঙ্গে হয়ে কাজ করছেন। জাতিসংঘ গৃহীত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলে স্বেচ্ছাসেবীদের কাজের পরিধি আরো বিস্তৃত হয়। এসডিজি বাস্তবায়নে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগগুলো বেশ বড় ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর তৎপরতা আগের চেয়ে অনেক বেশি। 

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তিনটি বিষয় সরাসরি জড়িত। প্রথমটি হলো দুর্যোগ-পূর্ববর্তী প্রস্তুতি, দ্বিতীয়টি হলো দুর্যোগ চলাকালীন কর্মকাণ্ড এবং তৃতীয়টি হলো দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম। এ তিন পর্যায়েই সরকারের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় নেতৃত্বের ভূমিকা বিস্তর। যেকোনো এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান ও সামগ্রিক বিষয় সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অবগত স্থানীয় পর্যায়ের অংশীদাররা। ওইসব এলাকায় যখন দুর্যোগ আঘাত হানে তখন তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ থাকে। যেহেতু স্থানীয় নেতৃত্ব দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সব পরিস্থিতি সম্পর্কে নেতৃত্ব দেয়, সুতরাং তাদের মতামত ও পরামর্শকে প্রাধান্য দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন। 

দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি ব্যবহার উপযোগী মডেল তৈরি করেছে। দুটি প্রধান উপাদানের ওপর ভিত্তি করে মডেলটি নির্মিত। প্রথমত, ঝুঁকি হ্রাস, যার মধ্যে রয়েছে ঝুঁকি পরিবেশ নির্ধারণ করা ও এর ভিত্তিতে ঝুঁকি পরিবেশ ব্যবস্থাপনা। স্বচ্ছাসেবক ও স্থানীয় নেতৃত্বের অংশীদাররা এ দুই বিষয় সামনে রেখে দুর্যোগকালে সহায়তা দিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে তারা দুর্যোগ সম্পর্কে সম্যক ধারণা গ্রহণ করে তা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে থাকেন। দ্বিতীয়ত হলো জরুরি অবস্থায় সাড়া দেয়া, যেখানে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে স্বেচ্ছাসেবীসহ স্থানীয় নেতাদের। সতর্কসংকেত, পূর্ব সতর্কতা, স্থানান্তর, অনুসন্ধান, উদ্ধার, চাহিদা ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, জরুরি ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবা সরবরাহ এবং জরুরি পুনর্বাসনসহ নানা কর্মকাণ্ডে তাদের রয়েছে বিশেষ অবদান। স্বেচ্ছাসেবীরা মাইকিং, লিফলেট বিতরণসহ নানাভাবে সবাইকে এ বিষয়ে অবহিত করে থাকেন। 
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে চলেছে। দুর্যোগের সময় অনেকেই জীবন বাঁচাতে নিকটস্থ আশ্রয় কেন্দ্রে ছুটে যান ঠিকই, কিন্তু দুর্যোগ মোকাবেলা ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে কী করতে হবে সে সম্পর্কে অনেকের জানা নেই। প্রান্তিক মানুষকে সহজভাবে তাদের মতো করে জলবায়ু পরিবর্তন ও করণীয় কাজ সম্পর্কে ধারণা দিতেই গ্রাম ও হাওরের বিভিন্ন অঞ্চলেও কাজ করে চলেছেন অনেক স্বেচ্ছাসেবী তরুণ-তরুণী। প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত অঞ্চলে অন্যান্য জায়গার তুলনায় খাদ্য ঘাটতি থাকে বেশি, নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা বেশি পরিমাণে ব্যাহত হয়। এসব সমস্যার সমাধানেও স্বেচ্ছাসেবীরা কাজ করে থাকেন। বন্যায় যখন এলাকার পর এলাকা প্লাবিত, মানবতার ফেরিওয়ালা হয়ে স্বেচ্ছাসেবীরা তখন ত্রাণ হাতে পৌঁছে যান মানুষের দুয়ারে। 

স্থানীয় যেকোনো উন্নয়নে সাধারণ জনগণের সম্পৃক্ততা, সক্ষমতা বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে দুর্যোগ প্রস্তুতিতে গতিশীলতা আসবে। জাতীয় ও স্থানীয় সংগঠনগুলো আরো জোরালোভাবে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কার্যক্রম বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারবে। 

বাংলাদেশে নতুন ধারার বিপর্যয়কর বন্যাগুলোর কারণ ও ধরন মোটাদাগে কয়েকটা। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে অধিক তাপমাত্রায় বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্প ধারণক্ষমতা বৃদ্ধিজনিত অতিবৃষ্টি অবশ্যই একটা বড় কারণ। গঙ্গা ও তিস্তা অববাহিকায় বন্যার প্রধানতম কারণ অবশ্যই উজানে বাঁধ নির্মাণ ও একতরফা পানি প্রত্যাহারে স্রোত হারিয়ে নদীতে বালু জমে নদীর গভীরতা কমে আসা। অতিবৃষ্টির পর বন্ধ বাঁধগুলো হঠাৎ যখন একসঙ্গে খোলা হয়, তখন ভরাট হয়ে পড়া পদ্মা ও তিস্তা পানি ধারণ করতে না পেরে অভাবনীয় ক্ষতির বন্যা ও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে। বাঁধের বন্ধ গেটগুলো শেষ মুহূর্তে খোলা হয়। বিপরীতে আধুনিক আবহাওয়া স্যাটেলাইটের কল্যাণে ব্যাপক বৃষ্টি হবে জেনেও কয়েকটা দিন আগে থেকেই উজানের বাঁধের পানি রিলিজ বা ড্রেনেজের ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ভারতের বাঁধে ভাটির বাংলাদেশ খরায় শুকায়, হঠাৎ বানে ভাসে! 

অন্যদিকে, ব্রহ্মপুত্র ও বরাক অববাহিকার উজানে প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে চলছে নির্বিচার বাণিজ্যিক বনায়ন, পাহাড় কাটা, পাথর উত্তোলনসহ খনিজ আহরণের বিশাল সব আয়োজন। বাংলাদেশেও পার্বত্য চট্টগ্রামে বাণিজ্যিক বনায়ন, পাহাড় কাটা ও পাথর সংগ্রহে কর্ণফুলীর পানিতেও পলিপতনের মাত্রা বেড়েছে। অর্থাৎ বন ও পাহাড়ে উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে বৃষ্টির পানি নদীতে পলিপতন তীব্র করছে। এতে নদীর পানি ধারণক্ষমতা ক্রমাগত কমছেই।

পলিথিন-প্লাস্টিক, মানববর্জ্য, নগর ও শিল্পবর্জ্য নির্বিচারে নদীতেই ফেলা (ডাম্পিং) হয়। শহর ও শিল্পাঞ্চল–সংলগ্ন অঞ্চলে নদীর তলদেশে স্থানভেদে কয়েক ফুটের পলিথিন স্তরে জমেছে। বিপরীতে নেই পরিবেশবান্ধব নগর ও শিল্পবর্জ্য শোধনের বোধ। নেই সমন্বিত ও টেকসই ড্রেজিংয়ের আয়োজনও। বাংলাদেশে বনাঞ্চল ধ্বংস, নির্বিচার গাছ কাটা, হাওর ও নদীভরাটকেন্দ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির মহোৎসব চলছে। আছে সমন্বয়হীন বালু উত্তোলন ও ড্রেজিংয়ের তাণ্ডব। ওদিকে ভারতে চলছে ব্রহ্মপুত্রের ওপর জলবিদ্যুৎ ও পানি প্রত্যাহারের নতুন-পুরোনো প্রকল্প, পাহাড় ও বনায়ন বাণিজ্যিকীকরণের মহাপ্রকল্প। সব মিলে অতিবৃষ্টির প্রাকৃতিক কারণের চেয়েও ভারত ও বাংলাদেশের উন্নয়ন-সন্ত্রাসই বিপর্যয়কর বন্যার জন্য দায়ী। অতিবৃষ্টি অতীতেও হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। কিন্তু নদীর পানি ধারণক্ষমতা কেন দ্রুত কমছে, সে প্রশ্নের গভীরে গিয়ে প্রতিকার ও প্রতিরোধের পথে হাঁটা চাই!

উজানের পানি ভাটিতেই গড়াবে—এটাই তার স্বাভাবিক প্রকৃতি। কিন্তু অদূরদর্শী উন্নয়নে কিংবা আন্তদেশীয় হিংসা ও প্রতিযোগিতায় সেই স্বাভাবিকতাকে চ্যালেঞ্জ বা বাধাগ্রস্ত করলে তার ফলাফল কতটা ভয়ংকর হতে পারে, ভারত ও বাংলাদেশের জানা হয়েছে বিস্তর। প্রাকৃতিক বিন্যাসকে চ্যালেঞ্জ করা, আমূল পরিবর্তন করে দেওয়া কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রের কিংবা সংস্থার পক্ষে সম্ভব নয়। নদীকে একদিকে বাধাগ্রস্ত করলে অন্যদিকে সে যে গতিপথ খুঁজে নেয়, তা হয় অনেক বেশি বিধ্বংসী। আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতিকে পাশ কাটিয়ে ভাটির পানি আটকে দেওয়া, ভাটির পানির প্রাকৃতিক উৎসপ্রবাহকে তছনছ করা উদ্যোগ ও মেগা প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রতিদান ঋণাত্মক। উজান ও ভাটিতে পানির প্রাকৃতিক প্রবাহের পথে যত বাঁধ-ব্যারেজসহ অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে, স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়ে পানির তোড় তত বিধ্বংসী হয়ে উঠবে; ভেসে যাবে লোকালয়সহ নানা অবকাঠামো ও প্রাণ-প্রকৃতি। সেই বিধ্বংসী রূপই আজ দেখছে উজানের আসাম, বিহার, পশ্চিম বাংলা আর ভাটির বাংলাদেশ।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বীকৃত ৫৩টি অভিন্ন আন্তর্জাতিক নদী প্রবাহিত। দেশ দুটি যদি নদীগুলাকে বাঁচিয়ে রাখতে না পারে, নদীর পানির গতিপ্রবাহ ঠিক রাখতে না পারে, নদীর নাব্যতা ধরে রাখতে না পারে, জলবিদ্যুতের নামে নদীর ওপর অত্যাচারের আয়োজন বন্ধ করতে না পারে, জল ধারণক্ষমতা বাড়াতে টেকসই ও সমন্বিত ড্রেজিং করতে না পারে, আধুনিক আবহাওয়াজ্ঞানের আলোকে অতিবৃষ্টির আগেই বাঁধ ও জলাধারের পানি বঙ্গোপসাগরে ‘ড্রেন আউট’ করতে না পারে, তবে এমন বন্যা দুই দেশে চলতেই থাকবে। বাংলাদেশ সীমান্ত অঞ্চল দরিদ্রতম অঞ্চল বলে সেখানে ভারত সরকারের মনোযোগ কম থাকতে পারে, কিন্তু বিহার ও আসামের মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নেহাতই কম নয়। একেকটা বন্যায় বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, সড়ক ও রেল অবকাঠামোর ক্ষতি, ফসল ও গবাদিপশুর সম্মিলিত ক্ষয়ক্ষতি বিপর্যয়কর!

গঙ্গা ও তিস্তা বেসিনের বাঁধের গেটগুলো খোলার সঙ্গে আবহাওয়া পূর্বাভাসের আধুনিকতম জ্ঞানকে সমন্বিত করতে হবে। বর্তমানে জাপান, মার্কিন ও ইউরোপীয় আবহাওয়ার পূর্বাভাস মডেলগুলোর মাধ্যমে এক থেকে দুই সপ্তাহ আগেই ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা ও পরিমাণ জানা যায়। এ কারণে বাঁধের জলাধারের পানি সরিয়ে নতুন পানির সক্ষমতা তৈরি, আগাম সতর্কসংকেত জারি, ত্রাণ ও উদ্ধার পরিকল্পনা সাজানোকে গতানুগতিক রেখে নতুন উচ্চতায় নিতে হবে। অন্যদিকে, ব্রহ্মপুত্র ও বরাকের উজানে বৃষ্টির সম্ভাব্য গড়ের ভিত্তিতে ভারত-বাংলাদেশ মিলেই করতে হবে সমন্বিত ড্রেজিং ও নাব্যতা রক্ষার মহাপরিকল্পনা। এর জন্য যথাযথ আন্তরাষ্ট্রীয় কূটনীতি দরকার।

জীবন ও সম্পদ বাঁচাতে, অর্থনীতি সুরক্ষায় বন্যা ব্যবস্থাপনাকে পরবর্তী পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। ভারত ও বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে আবহাওয়া স্যাটেলাইট ডেটা এবং স্যাটেলাইট ইমেজ প্রক্রিয়াকরণভিত্তিক বন্যা ব্যবস্থাপনা সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রসারিত করতে পারে। সময়ের আগেই বঙ্গোপসাগরে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য নদীর বাঁধ ব্যবস্থাপনার নকশা করা যায়। জলবিদ্যুৎ বাঁধ পরিচালনার জন্য দক্ষ কৌশল নির্ধারণ করতে সফটওয়্যার ও ডেটা সায়েন্সভিত্তিক হাইড্রোলজিক্যাল সিমুলেশন মডেল তৈরি করা সম্ভব। আঞ্চলিক বন্যা সতর্কতা কেন্দ্রেও দরকার। মানুষ, পশুসম্পদ ও অবকাঠামোকে ব্যাপক ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে একটি ‘উইন উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করা জরুরি। প্রতিযোগিতাকে সহযোগিতা দিয়ে প্রতিস্থাপন করা না গেলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি মোকাবিলা দুই দেশের জন্যই অসম্ভব।

জলবায়ু পরিবর্তনগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, পরিবেশ-বাস্তুতন্ত্র, জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা, সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং স্থলভাগে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ, পানীয় জল সুরক্ষা-সম্পর্কিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কিছু অভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যদিও ভারত ও বাংলাদেশ মানচিত্রের একটি ভৌত সীমানা দ্বারা পৃথক, তবু আমাদের বায়ু, পানি, নদী, বন এবং অন্য অনেক প্রাকৃতিক সম্পদ অভিন্ন। এসবে মানচিত্রের সীমানা অকেজো। জলবায়ু পরিবর্তনগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রশ্নে এ উপলব্ধির গভীরে পৌঁছাতে হবে। মানচিত্রের সীমানা অতিক্রম করলেই নদী আরেকটি ভিন্ন সত্তা হয়ে যায় না। একটি মহান নদী-সভ্যতা একটি সামগ্রিক নদী ব্যবস্থাপনার সমন্বিত ফসল! পরিবেশ বাঁচানো মানে প্রকৃতি ও পরিবেশের জীবনচক্র ও গতিপথকে স্বাভাবিক রেখে মানুষ ও প্রাণ-প্রকৃতির অনুকূলে কাজে লাগানো। এ জন্য হাজার বছরের অর্জিত জ্ঞানের সঙ্গে আধুনিকতম জ্ঞানের টেকসই সমন্বয় দরকার।

২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী মূল্যের পানীয় জল নিশ্চিত করার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য রয়েছে ভূপৃষ্ঠের পানির প্রাকৃতিক উৎসগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অত্যধিক নির্ভরতা কমানো, নদীর পানিকে দূষণমুক্ত রাখা এবং ভূ-উপরিভাগের পানির সমন্বিত ও টেকসই আধার নির্মাণে ভবিষ্যৎমুখী পরিকাঠামোয় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন। পয়োনিষ্কাশন এবং পলিথিন, শিল্পবর্জ্য ও মাইক্রোপ্লাস্টিকের দূষণ থামাতেও সমন্বিত কৌশল দরকার। পানি, বন, বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশ রক্ষার জন্য সর্বোত্তম অনুশীলনগুলো বের করে আনতে এ অঞ্চলে পারস্পরিক সহযোগিতা খুব জরুরি। প্রাকৃতিক আবাসস্থল এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি কমাতে জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ কী, তার আঞ্চলিক গবেষণা জরুরি। নদীকেন্দ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষা করলেই পরে এ অঞ্চলের অধিকতর জলবায়ু-সহিষ্ণুতা অর্জন সম্ভব। অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতার জন্য নদীকে বাঁচিয়ে তাকে পরিবেশগত প্রবাহ, বাস্তুশাস্ত্র, জীববৈচিত্র্য ও পানিবিজ্ঞানের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের উন্নয়নই টেকসই উন্নয়ন; নদী হত্যার উন্নয়ন হচ্ছে উন্নয়ন সন্ত্রাস।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও খরা ভারত-বাংলাদেশের ক্ষতি তীব্র করে তুলছে। আগাম ও মধ্যমৌসুমের বন্যা ভারতীয় বাঁধের উজান ও ভাটির উভয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক, অবকাঠামোগত ও কৃষির বিপর্যয় ঘটাচ্ছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মানে প্রকৃতি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগকে চ্যালেঞ্জ করা নয়; বরং কারিগরি ও কৌশলগত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দুর্যোগঝুঁকি প্রশমন করা; জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার আগাম, তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি সব আয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মানে বানে ভাসিয়ে নেওয়ার পর কিছু অপর্যাপ্ত ত্রাণ ভিক্ষা দেওয়া, পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে লোকদেখানো কিছু উদ্ধার তৎপরতা দেখানো এবং মিথ্যা আশ্বাসে লিপ্ত হওয়া। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার এ হীনম্মন্য দর্শনকে পরিবর্তন করা সময়ের দাবি। আমাদের ‘পোস্ট’ থেকে ‘প্রি’ ব্যবস্থাপনায়, অর্থাৎ কৌশলগত ও আগাম বন্যা ব্যবস্থাপনায় যেতে হবে।

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন