অভিমত

রুপি-ইয়েনের নতুন সমীকরণ: ডলারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়, জাতীয় স্বার্থের নতুন অঙ্ক

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ ০৭:৫২

রুপি-ইয়েনের নতুন সমীকরণ: ডলারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়, জাতীয় স্বার্থের নতুন অঙ্ক

বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্রে নীরব পরিবর্তন অনেক সময় বড় রাজনৈতিক ঘোষণার থেকেও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়। ভারত ও জাপানের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তির সম্ভাব্য উদ্যোগ ঠিক তেমনই একটি ঘটনা। প্রথম দর্শনে বিষয়টি ডলারের বিকল্প খোঁজার চেষ্টা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরে তাকালেই বোঝা যায়, এটি মূলত অর্থনৈতিক বাস্তবতা, ভূরাজনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থের এক জটিল সমীকরণ।

ভারত ও জাপান যদি ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট লেনদেনে সরাসরি রুপি ও ইয়েন ব্যবহার করে, তার অর্থ এই নয় যে ডলারের আধিপত্য রাতারাতি শেষ হয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের অবস্থান এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী। বিশ্বের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আন্তর্জাতিক ঋণ, পণ্যবাজার এবং আর্থিক লেনদেনের বড় অংশ এখনও ডলারনির্ভর। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

তবু প্রশ্ন উঠছে—তাহলে এই উদ্যোগ কেন?

উত্তরটি অর্থনীতির বাস্তব হিসাবেই লুকিয়ে। ভারত থেকে জাপানে বা জাপান থেকে ভারতে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বহু সময় দুই দেশকেই প্রথমে ডলার কিনতে হয়, তারপর সেই ডলারে লেনদেন সম্পন্ন হয়। এই প্রক্রিয়ায় বাড়ে লেনদেন ব্যয়, বাড়ে বিনিময় হারের ঝুঁকি। যদি সরাসরি রুপি ও ইয়েনে অর্থ পরিশোধ সম্ভব হয়, তাহলে সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি অংশ এড়ানো যায়। ব্যবসার ভাষায় এটিই দক্ষতা বৃদ্ধি; রাজনীতির ভাষায় নয়।

জাপানের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক বছরে ইয়েন উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে। সেই চাপ সামাল দিতে জাপানকে একাধিকবার আর্থিক বাজারে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। ফলে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো তাদের কাছেও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক।

অন্যদিকে ভারতের লক্ষ্য দীর্ঘদিন ধরেই রুপির আন্তর্জাতিক ব্যবহার ধীরে ধীরে বাড়ানো। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপসহ একাধিক দেশের সঙ্গে ভারত ইতিমধ্যেই স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের কাঠামো গড়ে তুলেছে। জাপানের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা সেই ধারাবাহিকতারই পরবর্তী ধাপ।

তবে এই গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রয়েছে—ভূরাজনীতি।

ভারত ও জাপান আজ শুধু অর্থনৈতিক অংশীদার নয়; ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে তারা গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সহযোগী। অবকাঠামো উন্নয়ন, সাপ্লাই চেইন, উচ্চপ্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা শিল্প—সব ক্ষেত্রেই সহযোগিতা বাড়ছে। মোগামি শ্রেণির স্টেলথ ফ্রিগেট যৌথভাবে নির্মাণের প্রস্তাব সেই বৃহত্তর সম্পর্কেরই প্রতীক। একই ধরনের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ব্যবহার করলে ভবিষ্যতে যৌথ মহড়া, রক্ষণাবেক্ষণ ও সামরিক সমন্বয় আরও সহজ হবে।

অর্থাৎ অর্থনীতি ও নিরাপত্তা আজ আর আলাদা দুটি ক্ষেত্র নয়; একটির সঙ্গে অন্যটির গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

তবে এখানেই সবচেয়ে বড় বাস্তব প্রশ্নটি সামনে আসে। সরকার চুক্তি করতে পারে, কিন্তু বাজারের সিদ্ধান্ত নেয় ব্যবসায়ীরা। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলি কি সত্যিই ডলারের বদলে রুপি বা ইয়েনে লেনদেন করতে চাইবে? উত্তর এখনও অনিশ্চিত।

কারণ একটি মুদ্রার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা রাজনৈতিক ঘোষণায় তৈরি হয় না। তার জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল অর্থনীতি, গভীর আর্থিক বাজার, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং এমন উৎপাদনক্ষমতা, যার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সেই মুদ্রা গ্রহণ করতে আগ্রহী হয়।

ভারতের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যদি ভারত উন্নত প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, উচ্চমূল্যের যন্ত্রপাতি এবং উদ্ভাবনী শিল্পপণ্য বিশ্ববাজারে আরও বড় পরিসরে রপ্তানি করতে পারে, তবেই রুপির আন্তর্জাতিক চাহিদা স্বাভাবিকভাবে বাড়বে। শুধুমাত্র কূটনৈতিক চুক্তি দিয়ে কোনো মুদ্রাকে বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত করা যায় না।

ভারত-জাপানের এই সম্ভাব্য উদ্যোগ তাই ডলারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নয়; বরং বহুমাত্রিক বিশ্ব অর্থনীতির দিকে এক বাস্তববাদী পদক্ষেপ। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি সহযোগিতাও রয়েছে, আবার কৌশলগত হিসাবও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেও দুই দেশ নিজেদের অর্থনৈতিক বিকল্প বাড়াতে চাইছে।

আজকের বিশ্বে এটাই নতুন বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আর সাদা-কালো নয়। মিত্রতার মধ্যেও প্রতিযোগিতা আছে, প্রতিযোগিতার মধ্যেও সহযোগিতা আছে। শেষ পর্যন্ত প্রতিটি রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে একটি বিষয়ই—জাতীয় স্বার্থ।

ভারত ও জাপানের নতুন অর্থনৈতিক সমীকরণ সেই বাস্তবতারই আরেকটি স্পষ্ট উদাহরণ।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন